ফিরেছে ভাগ্য, ফিরছে দেশি মাছ
আশির দশকের শুরুতেও দুই টাকা মজুরিতে পুকুরে পুকুরে জাল টেনেছেন যশোরের চাঁচড়া বর্মণপাড়ার রামপ্রসাধ বর্মণ। কঠোর পরিশ্রম, একাগ্রতা, আর সততার মাধ্যমে আজ তিনি কোটিপতি মৎস্যচাষি। নিজের ভাগ্যোন্নয়নের পাশাপাশি তিনি হারিয়ে যেতে বসা দেশি জাতের মাছ সহজলভ্য করার দিকেও মন দিয়েছেন। দেশি জাতের শিং ও মাগুর মাছ মাছ চাষ করে পেয়েছেন অনন্য সফলতা।
চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়েই স্কুল ছাড়তে হয়েছিল রামপ্রসাধের। দুই বেলা দুমুঠো খাবার নিশ্চিত করতে বাবার মতোই দুই টাকা মজুরিতে শুরু করেন জাল টানার কাজ। কিছুদিন পর মাছ চাষ সম্পর্কে একটু বুঝতে শুরু করলে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে যশোর শহরের মুড়লি এলাকার এক বাসিন্দার কাছ থেকে পরিত্যক্ত একটি পুকুর চেয়ে নেন তিনি। সেখানে জাপানি মাছের রেনু উৎপাদনের চেষ্টা করে সফল হন রামপ্রসাধ। তা থেকে পোনামাছ উৎপাদন করে প্রথম দফায় চার হাজার টাকায় বিক্রি করেন। এটিই তাঁর মূলধনে পরিণত হয়। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক বাড়তে থাকে রামপ্রসাধের পুকুরের সংখ্যা আর মাছ চাষের পরিধি।
বর্তমানে রামপ্রসাধের মৎস্য খামারের আয়তন ৩৫ বিঘা, যেখানে রয়েছে ছয়টি বড় পুকুর। এ খামারে তিনি বিভিন্ন জাতের মাছ চাষ করলেও দেশি জাতের শিং মাছ চাষ করেন ২১ বিঘা আয়তনের তিনটি পুকুরে। এর আগে দুই দফায় ৮৮ মেট্রিক টন শিং মাছ বিক্রি করেছেন। যার বাজার মূল্য চার কোটি টাকারও বেশি। শুধু শিং মাছ থেকেই বছরে তাঁর লাভের অঙ্ক কোটি ছাড়িয়ে যায়। পাশাপাশি তাঁর খামারে পুকুরের পাড়ে সারা বছরই চাষ করেন লাউ, পেঁপে, কলাসহ বিভিন্ন শাকসবজি। এসব থেকেও তিনি বছরে বেশ ভালো টাকা আয় করেন।
বাজারে বিদেশি জাতের চেয়ে দেশি জাতের শিং মাছের চাহিদা বেশি, দামও বেশি। সেকারণেই এ মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ হন রামপ্রসাধ। তিনি আরো জানান, সফল হওয়ায় আগামী বছর থেকে টেঙরা, বাইন, গুলসাসহ আরো কিছু দেশি জাতের মাছের চাষ শুরু করবেন।
রামপ্রসাধের শিং মাছ চাষে সফলতা দেখে এলাকার আরো অনেকেই এ মাছ চাষে উৎসাহী হয়েছেন। তাঁদের সব ধরনের সহযোগিতা করেন রামপ্রসাধ। শহরের চাঁচড়া এলাকার নাভিদ ফিস ফার্মের স্বত্বাধিকারী এসকে রাব্বুন বলেন, ‘রামপ্রসাধ দাদার শিং মাছ চাষ দেখে আমার মতো অনেকেই এখন এ মাছ চাষ শুরু করেছে। অন্য মাছের তুলনায় এ মাছে লাভ কয়েক গুণ বেশি।’
রামপ্রসাধের এ কীর্তিতে মুগ্ধ যশোরের মৎস্য কর্মকর্তারাও। যশোরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রমজান আলী বলেন, ‘দেশি মাছ চাষে রামপ্রসাধ অনন্য সফলতা দেখিয়েছেন। যশোরের অনেক মৎস্যচাষিই এখন এ মাছ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বাজারে এর চাহিদা ও দাম বেশি হওয়ায় একদিকে মৎস্যচাষিরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকেও রক্ষা পাচ্ছে এসব দেশি মাছ। মৎস্য কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘অন্য দেশি জাতের মাছ চাষে আগ্রহ দেখালেও মৎস্য চাষিদের সবরকম সহযোগিতা করা হবে।’
রামপ্রসাধ বলেন, ‘যশোরের মৎস্যচাষিরা দেশি ও বিদেশি জাতের প্রচুর মাছ উৎপাদন করলেও অপরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাজার ব্যবস্থা উন্নত এবং মাছ রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে এখানকার মৎস্যচাষিরা আরো বেশি উপকৃত হতেন।’

সাইফুল ইসলাম সজল, যশোর