১২ মামলায় আসামি ৮ হাজার, গ্রেপ্তার নেই
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মাসুদুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় মামলাটি করেন মাদ্রাসার শিক্ষা সচিব মুফতী শামসুল হক।
মামলায় সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। সাক্ষী করা হয়েছে ঘটনার সময় আহত ১৩ জন মাদ্রাসাছাত্রসহ ২২ জনকে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, নাসিরনগরে মাদ্রাসা ও মসজিদ স্থানীয় মন্ত্রী সাঈদুল হক (নাম হবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর নাম মোহাম্মদ ছায়েদুল হক) কর্তৃক বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে ১১ ও ১২ জানুয়ারি কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে জেলাজুড়ে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ হয়। এই মিছিল সমাবেশের নিউজ করার জন্য কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের সেক্রেটারি খালেদ মো. মোশাররফ কাউতলীর উদ্দেশে অটোরিকশা দিয়ে রওনা হন। ফ্লাইওভারের কাজ চলার কারণে মোশাররফ জেলা পরিষদ মার্কেটের সামনে নেমে যান। তখনই অতর্কিতে বিজয় টেলিকমের মালিক রনিসহ অজ্ঞাত দুজন সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে মোশাররফকে মারধর করেন। মোশাররফ মাদ্রাসায় এসে ঘটনাটি জানালে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতারা বিচারের দাবিতে মার্কেটে যান। এ সময় তাদের সঙ্গে কথাকাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। এরপর অজ্ঞাতনামা আসামিরা দা, লাঠি, রড, পিস্তল, ককটেল, হাতবোমা, ইটপাটকেলসহ ঘটনাস্থলে এসে দেশের প্রাচীনতম দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাদ্রাসা-মসজিদের কাচ ভাঙচুর করে এবং তাণ্ডব চালিয়ে ককটেল ও ইটপাটকেল ছুড়তে ছুড়তে মাদ্রাসার পূর্ব-দক্ষিণ পাশে হেফজ বিল্ডিংয়ে ঢুকে সাক্ষীদের (মাদ্রাসাছাত্র) মারপিট করে জখম করে। ঘটনার একপর্যায়ে অজ্ঞাত আসামিরা হেফজখানার বিল্ডিং থেকে বের হয়ে মাঠের পূর্বদিকে নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করে ককটেল, হাতবোমা, ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে মাদ্রাসার ছাত্রদের ওপর আক্রমণ করে। এতে মাদ্রাসার ছাত্ররা জখম হয়। তারা দায়ের উল্টো পিঠ দিয়ে খুন করার উদ্দেশ্যে ছাত্র মাসুদুর রহমানকে কপালের ডান পাশসহ সমস্ত শরীরে বাড়ি মেরে ফুলা জখম করে। একপর্যায়ে তাকে খুন করার উদ্দেশ্যে চারতলা থেকে ফেলে দেয়। এরপর অজ্ঞাতনামা আসামিরা তাণ্ডব চালিয়ে মসজিদের কাচ, টেবিল-চেয়ার ও হেফজখানার মালামাল লুটপাট করে প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করে। এরপর আসামিরা বিল্ডিং থেকে বের হয়ে গেলে আহত মাসুদকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে ১২ জানুয়ারি মঙ্গলবার সকালে জামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসার এক ছাত্র এনটিভি অনলাইনকে বলেছিলেন, রাতে মাদ্রাসার ছাত্ররা ঘুমিয়েছিল। তখন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তালা ভেঙে সেখানে ঢুকে পড়ে। তাদের নির্যাতনে মাসুদুর রহমান মারা যান।
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘পুলিশ মাদ্রাসায় আসার পর কিছু ছাত্র জীবন বাঁচাতে ওপরে উঠে পড়ে। তখন পুলিশ তাকে পিটিয়ে গুলি করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমর্থকরাও ছিলেন।’
আরেকজন জানান, পুলিশ ও কিছু সাধারণ মানুষ যখন সেখানে আসে, তখন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল।

নিহত হাফেজ মাসুদের ভাই হাফেজ মোহাম্মদ মামুন ও সহপাঠী মুফতি নিয়ামুল ইসলাম দাবি করেছেন, মাসুদের গায়ে গুলির চিহ্ন রয়েছে। পুলিশের গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
এরপর গত শুক্রবার সকালে এক সম্মেলনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মোবারক উল্লাহ অভিযোগ করেন, পরিকল্পিতভাবে তাঁর ছাত্রদের ওপর হামলা হয়েছে। আর পুলিশ নির্যাতন করে হাফেজ মাসুদুর রহমানকে হত্যা করেছে।
মাসুদুর হত্যার পর পুলিশ ও আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার পরও মামলায় কারো নাম না থাকার কারণ জানতে চাইলে জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আবদুর রহিম কাশেমী এনটিভি অনলাইনকে বলেন, শহরের পরিস্থিতি উত্তপ্ত। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে যাতে আর কোনো ঘটনা না ঘটে সে জন্যে তাঁরা মামলাটি এভাবে দিয়েছেন। তদন্তেই আসামিদের নাম বের হয়ে আসবে।
এদিকে ১১ ও ১২ জানুয়ারি হত্যার ঘটনাসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডব চালিয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় আট সহস্রাধিক লোককে আসামি করা হয়েছে। তবে এসব মামলায় কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি। আর মাদ্রাসার শিক্ষকদের মামলার বিষয়ে পুলিশ মুখ খুলছে না।
আলেম সমাজের সংবাদ সম্মেলন : এদিকে সহিংস ঘটনার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে জেলা সচেতন আলেম সমাজ। আজ শনিবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িযা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন জাতীয় ওলামা সমন্বয় পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুফতি মাসুম বিল্লাহ, জেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মাওলানা জাকির হোসেন, মুফতি নুরুল ইসলাম প্রমুখ।
এ সময় বক্তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটে যাওয়া তাণ্ডবের নিন্দা জানান এবং প্রকৃত দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনকে অনুদান : এদিকে সহিংস ঘটনায় আগুনে পুড়ে যাওয়া সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন আজ সকালে পরিদর্শন করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর আসনের সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। এ সময় তিনি প্রতিষ্ঠানের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান সরকারের কাছে তাঁর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে নগদ এক লাখ টাকা অনুদান দেন।

শিহাব উদ্দিন বিপু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া