নির্দোষ কৃষক মুক্তি পেলেন ২২ বছর পর
মামলায় খালাসের চিঠি ১৩ বছরেও জেলগেটে পৌঁছায়নি। এর আগে জামিন না পাওয়ায় আটক ছিলেন নয় বছর। ২২ বছর পর আজ বুধবার কারাগার থেকে মুক্ত হলেন সাতক্ষীরার কৃষক জোবেদ আলী।
সাতক্ষীরা আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৯৪ সালে নিজ মেয়ে লিলিকে (৮) হত্যার অভিযোগে আটক হন জোবেদ আলী। তালা থানায় দায়ের করা ওই মামলায় (মামলা নম্বর ৫, জিআর ১৬৩/৯৪) তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) লিয়াকত আলী ১৯৯৬ সালের ৯ জুন জোবেদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত (দ্বিতীয়) ২০০১ সালের ১ মার্চ জোবেদ আলীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেন।
কারাগারে থাকা অবস্থায় জোবেদ আলী এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন। যশোর জেলা কারাগারে থাকাবস্থায় একই ওয়ার্ডে থাকা অন্য বন্দি উলশি গ্রামের আবদুর রশীদের মাধ্যমে তিনি বাড়িতে যোগাযোগ করে ১৩ হাজার টাকা নিয়ে আপিলের (ক্রিমিনাল জেল আপিল নম্বর ১২৭৩/২০০১) কাজে লাগান। উচ্চ আদালতের এই আপিলে ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ তিনি বেকসুর খালাস পান।
আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো জানায়, খালাস পাওয়ার পর ওই বছরের ২৬ মার্চ ২৫৮৪২ স্মারকে সংশ্লিষ্ট আদেশ সাতক্ষীরার নিম্ন আদালতে পাঠানো হয়। হাইকোর্টের ১০৭২৫ নম্বর স্মারকে এ ব্যাপারে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দেওয়া হয়। এ অনুযায়ী সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (দ্বিতীয় আদালত) উচ্চ আদালতের রায় ও আদেশের কপি রেকর্ডরুমে পাঠানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু আদেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় জেলেই আটক থাকেন জোবেদ আলী। এমনকি তাঁর খালাস সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র জেলগেটেও পৌঁছায়নি।
এদিকে একই জেলে থাকা অবস্থায় তাঁর নিকটাত্মীয় আবদুর রশিদের মাধ্যমে জোবেদ আলী তাঁর ভাই জিয়াদ আলী ও ইয়ার আলীর কাছে টাকা চেয়ে জেল আপিলের জন্য একটি চিঠি লেখেন। সে অনুযায়ী একজন আইনজীবীও নিয়োগ করা হয়। আপিলের রায় সম্পর্কে জোবেদ মৌখিকভাবে জানতে পারলেও কাগজপত্রের মাধ্যমে তাঁকে কেউ তা অবহিত করেননি। এ জন্য কারাভোগ থেকে মুক্তিও পাননি তিনি।
জোবেদ আলী জানান, এ ব্যাপারে তাঁর তিন ভাইও ছিলেন খানিকটা নির্লিপ্ত। তাঁরা তাঁর মুক্তি সম্পর্কে খোঁজও রাখেননি। কারাগার কর্তৃপক্ষও কোনোদিন বিষয়টি আদালতকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। তাঁর আইনজীবীও এ ব্যাপারে কোনো খোঁজ নেননি।
সম্প্রতি বিষয়টি জানাজানি হলে গত বুধবার সাতক্ষীরার আইনজীবী জিল্লুর রহমান (২) বিষয়টি সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজের ( দ্বিতীয় আদালত) আদালতে একটি প্রার্থনা দিয়ে তাঁর মুক্তি দাবি করেন। আদালত দ্রুত সময়ের মধ্যে জোবেদকে যশোর জেলা কারাগার থেকে সাতক্ষীরার আদালতে এনে এবং ঢাকায় অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন বলে আদেশ দেন। আদালত এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সহায়তাও চান।
এদিকে আজ বুধবার একই আদালতে শুনানিতে অংশ নেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফাহিমুল হক কিসলু এবং আসামিপক্ষের আইনজীবী জিল্লুর রহমান। দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচারক মো. আশরাফুল ইসলাম জোবেদ আলীকে খালাসের নির্দেশ দেন। এ সময় জোবেদ বলেন, ‘যাদের ভুলে অথবা অবহেলায় আমাকে দীর্ঘদিন কারাভোগ করতে হলো আল্লাহ যেন তাদের বিচার করেন।’
আজ বিকেলে জোবেদ আলী সাতক্ষীরা কারাগার থেকে মুক্ত বাতাসে বেরিয়ে আসেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমার প্রতি যারা অবিচার করেছে তাদের যেন শাস্তি হয়।’ মুক্তির সময় জেল গেটে তাঁর দুই ভাই ইয়ার আলী ও জিয়াদ আলীসহ আত্মীয়স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।
যে অভিযোগে আটক
প্রথম স্ত্রী ফরিদার মৃত্যুর পর দুই কন্যা সন্তান লিলি ও রেকসোনাকে নিয়ে ১৯৯৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর শ্বশুরবাড়ি তালার মানিকহার গ্রামে বেড়াতে আসেন কয়লা গ্রামের বাসিন্দা জোবেদ আলী। এদিন তিনি মেয়ে লিলিকে (৮) সেনেরগাঁতি বাজারে বেড়াতে নিয়ে যান। বাড়ি ফিরতেই লিলি কিছুক্ষণ পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। স্বজনরা অভিযোগ করেন, জোবেদ লিলিকে বিস্কুটের সঙ্গে বিষ খাইয়ে হত্যা করেছেন। গ্রামবাসী জোবেদকে আটকে রেখে পুলিশে খবর দেন। সেদিনই আটক হন তিনি। মামলার বাদী জোবেদের শ্যালক আবুল কাসেম দাবি করেন, জোবেদ তাঁর মেয়েকে বিস্কুটের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাওয়ানোর কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। এমনকি তাঁর স্ত্রী ফরিদা খাতুনকেও শ্বাসরোধ করে হত্যার কথা স্বীকার করেন তিনি।

সুভাষ চৌধুরী, সাতক্ষীরা