ফেনীর তিন আসনের ভোটে সীমান্ত নিয়ে উৎকণ্ঠা
আগের ১২টি জাতীয় নির্বাচনের সব হিসেব-নিকেশ যেন উলটপালট হয়ে পড়েছে ফেনীর তিনটি আসনে। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো বিশেষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় এমনিতেই উদ্বেগ রয়েছে। তার ওপর ভারত সীমান্তঘেঁষা জেলা হওয়ায় বাড়তি উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে সীমান্ত নিয়ে এতটা শঙ্কা না থাকলেও ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে বড় সমীকরণে দাঁড়িয়ে গেছে জেলা প্রশাসন।
কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফেনী জেলার বেশিরভাগ এলাকা ভারতের সীমান্তঘেঁষা। বিশেষ করে ফেনী-১ ও ফেনী-২ আসন পুরোপুরি সীমান্তজুড়ে অবস্থিত। এ কারণে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ভারতে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা সীমান্তের সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন। এতে সহিংসতা ও নাশকতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সীমান্তে ভারতীয় মোবাইলফোন সিমকার্ডের অবাধ ব্যবহার
ফেনীর সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে ভারতের বিভিন্ন মোবাইলফোন কোম্পানির সিমকার্ড। শুধু সীমান্তেই নয়, এমন সিম ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে খোদ ফেনী শহরেও। ভারতীয় মোবাইল নেটওয়ার্কের তরঙ্গ কম্পাংকের আওতায় রয়েছে ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তবর্তী পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলা এবং ফেনী সদর উপজেলার বড় একটি অংশ। ফেনী সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সিমকার্ড ব্যবহার করে চোরাকারবারিদের সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব সিমের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও বৃদ্ধি পেয়েছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন। তারা স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের পাশাপাশি নিজেদের ব্যবসা ও দলীয় গুপ্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। সুযোগ বুঝে সীমান্তে এসে বৈঠকও করছেন ভারতীয় সিম ব্যবহার করে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতীয় সিমকার্ড ব্যবহারের অবাধ সুযোগ নিয়ে নাশকতার আশঙ্কা আরও বেড়েছে। এতে একদিকে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে অপরাধী শনাক্ত করতে প্রশাসনকে বেগ পেতে হচ্ছে।
বিজিবির অবস্থান
নির্বাচন ঘিরে সীমান্তজুড়ে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ফেনীস্থ ৪ বিজিবির সিইও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোশারফ হোসেন জানান, সীমান্তে অবৈধ অস্ত্র, চোরাচালান ও সন্ত্রাসী তৎপরতা রোধে নিয়মিত অভিযান চলছে।
মোশারফ হোসেন আরও বলেন, কুমিল্লা সেক্টরের অধীনস্থ ব্যাটালিয়নসমূহের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ছয়টি জেলার (ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী) ৫৩টি উপজেলায় ৩৪টি সংসদীয় আসনের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ফেনী জেলার সীমান্তবর্তী তিনটি উপজেলায় সেনাবাহিনী ব্যতীত এককভাবে দায়িত্ব পালন করবে বিজিবি।
এছাড়া কুমিল্লা সেক্টরের ৩২৭ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে অস্ত্র-গোলাবারুদ, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উদ্বেগজনক অস্ত্র পরিস্থিতি
ফেনীতে ৫ আগস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া অনেক প্রাণঘাতী অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি। অভ্যুত্থানের সময় ব্যবহৃত বেশিরভাগ অবৈধ অস্ত্রও এখনো জব্দ করা সম্ভব হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, এসব বিপজ্জনক অস্ত্র এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। ফলে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে শঙ্কা বাড়ছে।
সাম্প্রতিক উদ্ধার ও অভিযান
ফেনী সীমান্ত এলাকায় বিশেষ অভিযানে একটি বিদেশি পিস্তল, গুলি ও ম্যাগাজিন উদ্ধার করেছে বিজিবি। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বুধবার রাত ৮টার দিকে ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি)-এর একটি বিশেষ দল ছাগলনাইয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী পূর্ব ছাগলনাইয়া বাগানবাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১টি বিদেশি পিস্তল, ২ রাউন্ড গুলি ও ২টি খালি ম্যাগাজিন উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও গুলি বিধি অনুযায়ী পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের জন্য ছাগলনাইয়া থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
এছাড়া ফেনী শহরের শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কে অবস্থিত একটি কুরিয়ার সার্ভিসের শাখায় যৌথবাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় চোরাচালান পণ্য জব্দ করা হয়েছে। বুধবার সকালে সেনাবাহিনী ও বিজিবির সমন্বিত অভিযানে ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস ও বিপুল পরিমাণ আতশবাজি উদ্ধার করা হয়।
এ সময় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কুরিয়ার সার্ভিসের শাখা ম্যানেজার আতিকুর রহমানকে বিজিবি ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছে।
ফেনীস্থ ৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মোশারফ হোসেন বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সীমান্তজুড়ে কঠোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তজুড়ে অবৈধ অস্ত্র, চোরাচালান রোধসহ সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে বিজিবি।
মোশারফ হোসেন আরও বলেন, বিজিবি কুমিল্লা সেক্টরের অধীনস্থ ব্যাটালিয়ন সমূহের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ৬টি জেলার (ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষীপুর ও ফেনী) ৫৩টি উপজেলায় ৩৪টি সংসদীয় আসনের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে ফেনী জেলার সীমান্তবর্তী তিনটি উপজেলায় সেনাবাহিনী ব্যতীত এককভাবে দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া সীমান্তবর্তী ৯টি উপজেলাসহ আরও ৪১ উপজেলায় সেনাবাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সমন্বিতভাবে ‘মোবাইলফোন স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবে বিজিবি।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মনিরা হক জানান, ফেনীর তিনটি সংসদীয় আসনের নির্বাচনের সব প্রস্তুতি রয়েছে। প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। সংসদীয় আসনগুলোতে কোথাও যেন বিশৃঙ্খলা না হয় সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সজাগ রয়েছে।

তোফায়েল আহাম্মদ নিলয়, ফেনী