‘রাষ্ট্র, তুমি এবার সংযত হও’
বাংলাদেশে মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে মন্তব্য করে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, যথেষ্ট হয়েছে। আর নয়। রাষ্ট্র তুমি এবার সংযত হও।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘যৌনকর্মীর জীবন ও জীবিকার অধিকারবিষয়ক গণশুনানি’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান বিচারকের বক্তব্যে মিজানুর রহমান এসব কথা বলেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সেক্স ওয়ার্কার্স নেটওয়ার্ক, সংহতি ও সোয়াসা নামে কয়েকটি সংগঠন এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
মিজানুর রহমান বলেন, যৌনকর্মীদের শিশু কখনোই অবৈধ শিশু নয়। একটা শিশু কখনোই অবৈধ হতে পারে না। পেশা হিসেবে যৌনকর্মকে বেছে নেওয়ার পেছনে দুঃখ, কষ্ট ও বেদনার ঘটনা আছে। এই পেশা বেছে নেওয়ার পেছনে যদি কোনো ব্যর্থতা থেকে থাকে তাহলে সেটা যৌনকর্মীদের নয়, সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকারের।
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘সংবিধানের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, পতিতাবৃত্তি নিরসনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু ৪৪ বছর ধরে রাষ্ট্র তাদের জন্য কী করেছে? যদি তুমি পতিতাবৃত্তি সমর্থন না করো তাহলে তাদের কর্মের ব্যবস্থা কর।’ তিনি আরো বলেন, ‘সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। ৩১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের সমান অধিকার রয়েছে। অথচ আমরা কী দেখছি, যৌনকর্মীদের মামলা নেওয়া হয় না। দিনের পর দিন তারা মামলার জন্য যাচ্ছেন। উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলা করে আটকে রাখা হচ্ছে।’
‘সংবিধানের ৪২ নম্বর অনুচ্ছেদে সম্পত্তির অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এখানে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তির অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অথচ আমরা কী দেখছি, যৌনকর্মীদের সম্পত্তি হুমকি দিয়ে, জোর করে লুট করা হচ্ছে। আর রাষ্ট্র তাকিয়ে তাকিয়ে সেই তামাশা দেখছে’, যোগ করেন মিজানুর। এ সময় তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও মৌলিক অধিকারগুলো যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। যৌনকর্মীদের ওপর কেন পুলিশি নির্যাতনের কথা আমাদের শুনতে হবে?’
সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট শিপ্রা গোস্বামী, বেসরকারি সংগঠন ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশি কবির, নারীপক্ষের সদস্য ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফেরদৌস আজিম, অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন খান প্রমুখ।
১২ দফা প্রস্তাব ও দাবি
সেমিনারে যৌনকর্মীদের অধিকারসংশ্লিষ্ট ১২টি বিষয় উত্থাপন করেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান। এর কয়েকটিকে দাবি আকারে উপস্থাপন করেন তিনি। সেগুলো হলো :
১. যৌনকর্মীদের সামাজিক দায়ভার নিতে ব্যর্থতা হওয়ায় রাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করা হলো।
২. পুনর্বাসন না করা পর্যন্ত যৌনকর্মীদের স্বীকৃতি দিতে হবে।
৩. পুলিশি হয়রানি বন্ধ ও দোষী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. যৌনকর্মীদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. আদালত ও বিচারকদের আরো সংবেদনশীল হতে হবে, শুধুমাত্র রি-অ্যাকটিভ (নেতিবাচক মানসিকতার) না হয়ে আপনারা প্রো-অ্যাকটিভ (ইতিবাচক মানসিকতা) হবেন।
৬. রাষ্ট্রীয়ভাবে যৌনকর্মীদের আইনগত সহায়তা দিতে হবে।
৭. সংবিধানে যৌনকর্মীদের সব অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৮. পতিতাবৃত্তিকেন্দ্রিক সব শাস্তিমূলক আইন বাতিল করতে হবে।
৯. যৌনকর্মীদের আইনি সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে।
১০. যৌনকর্মীরা অনুগ্রহ করে নির্যাতনের দলিল-দস্তাবেজ নিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কর্তৃক অভিযোগ দায়ের কর। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রয়োজনে যৌনকর্মীদের হয়ে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি প্রশাসনিক সব ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য থাকবে।
১১. যারা সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত হবে, তাদের যৌনকর্মীদের পাশে তাদের দাঁড়াতে হবে। শুধুমাত্র ধর্মের বাণী দিলে চলবে না।
১২. যৌনকর্মী অধিকার রক্ষা কমিটি গঠন করতে হবে। আর এর নেতৃত্বে থাকবে যৌনকর্মীরাই।

বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা