ভোট-বাণিজ্যের অভিযোগ
২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের টানতে দেদার টাকা বিলাচ্ছেন বিভিন্ন প্রার্থীর প্রচারকারীরা। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে বার্তা সংস্থা ইউএনবির অনুসন্ধানী এক প্রতিবেদনে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই সিটিতেই ভোট কেনাবেচা শুরু হয়েছে বলে কয়েকজন প্রার্থী অভিযোগ করেছেন। কেউ কেউ নির্বাচন কমিশনে (ইসি) লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন।
উত্তরের মেয়র পদপ্রার্থী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, টাকা দেওয়া শুরু হয়েছে। হেভিওয়েট প্রার্থীরা ভোটারদের টাকা দিচ্ছেন।’
ঢাকা উত্তর সিটির ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি-সমর্থিত কাউন্সিলর পদপার্থী সাজেদা আলী হেলেন ইউএনবিকে বলেন, ভোটারদের টাকা বিতরণের বিষয়ে তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মৌখিক অভিযোগ জানিয়েছেন।
ঢাকা দক্ষিণে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে সিপিবি-বাসদ সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী শম্পা বসু বলেন, নির্বাচনের দুই-তিন দিন আগে বস্তি এলাকাগুলোতে ভোট কেনার সম্ভাবনা খুবই বেশি।
ভোট-বাণিজ্য নিয়ে ইতিমধ্যে যেসব প্রার্থী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন, তাঁদের দাবি, পোশাকশ্রমিক ও বস্তির বাসিন্দারাই ভোটশিকারীদের প্রধান টার্গেট।
এ বিষয়ে ঢাকা উত্তরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মো. মাসুদ খান অভিযোগ করেন, মিরপুর-১ এলাকায় ভোটারদের টানতে কিছু প্রভাবশালী প্রার্থী টাকা বিলাচ্ছেন। এ জন্য তাঁরা ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করছেন।
নির্বাচনে অর্থের ছড়াছড়ি বন্ধে এবং প্রার্থীরা যাতে পোশাকশ্রমিক ও বস্তির বাসিন্দাদের প্রভাবিত করতে না পারেন, সে জন্য ঢাকা উত্তরের মেয়র পদপ্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ এবং ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী তুষার আহমেদ ইসিতে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাঁরা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।
ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদপ্রার্থী বাহরাইন সুলতান বাহরান তাঁর দায়ের করা অভিযোগে বলেন, তিনি চান নির্বাচনের আগের তিন দিনে যেন মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধ রাখা হয় যাতে প্রার্থীরা অর্থ বিতরণ করতে না পারেন।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণের রিটার্নিং অফিসার মিহির সারওয়ার মোর্শেদ বলেন, ‘ভোট কেনার কোনো সুযোগ নেই। এরপরও এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কাজ করছেন ম্যাজিস্ট্রেটরা।’
ঢাকা উত্তরের রিটার্নিং অফিসার শাহ আলম বলেন, প্রতিটি অভিযোগ দেখে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ ইউএনবিকে বলেন, যেহেতু প্রার্থীরা গোপনে ভোট কেনেন, তাই এ বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া কঠিন। তিনি বলেন, ‘এটা বাজে সংস্কৃতি। ... সামাজিকভাবে বিষয়টিকে বয়কট করা উচিত। নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে এটা বন্ধ করা সম্ভব নয়।’
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, ভোটের ঠিক আগে রাতের আঁধারে ভোট কেনার হিড়িক পড়ে। তিনি বলেন, স্মার্ট উপায়ে ভোট কেনা হয়। এগুলোর মধ্যে আছে ফ্লেক্সিলোডে টাকা পাঠানো, বিকাশের মতো কিছু মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে টাকা পাঠানো এবং নগদ অর্থ দেওয়া।
কলিমুল্লাহর মতে, ২০১৩ সালের জুলাইয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে ফ্লেক্সিলোডের মাধ্যমে টাকা পাঠানো নতুন মাত্রা পায়। তিনি বলেন, এ সমস্যাটা এতই প্রবল যে, তা রোধে অসহায় নির্বাচন কমিশন।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদের কথাই উদ্ধৃত করে নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজ বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়া এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড শনাক্ত করা ইসির পক্ষে কষ্টকর। তিনি ইউএনবিকে বলেছিলেন, ‘২৬ এপ্রিল থেকে চারদিনের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে কয়েকজন করে ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়োগ দেওয়া হবে। তাঁরা দোষীদের তাৎক্ষণিক সাজা দেবেন।’ তাঁর মতে, ভোট কেনা বন্ধে গণসচেতনতা দরকার।

অনলাইন ডেস্ক