বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতন বাড়ছে
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্যাতনের মাত্রা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে বলে জানিয়েছে আর্টিকেল নাইনটিন নামের একটি সংস্থা। গত ১ মে নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা জানিয়েছে গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবহারকারী ও সাংবাদিকদের ওপর মোট ২১৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছেন ২০৫ জন সাংবাদিক ও আট ব্লগার।
প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো : চারজন সাংবাদিককে হত্যা, ৪০ জনের ওপর গুরুতর শারীরিক আক্রমণ ও ৬২ জনের ওপর ছোটোখাটো হামলা, হয়রানির মাত্রা ২০১৩ সালের চাইতে ১০৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৩ সালে ৩৩ জন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন সেখানে ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮ জনে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, অনলাইন ব্যবহারকারী ও ব্লগারসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া গণমাধ্যমের সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিক সমিতির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ ১৩ ব্যক্তিকে মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে গ্রেপ্তার হওয়া এদের মধ্যে আটজন এখনো কারাগারে রয়েছেন। নারী সাংবাদিকরা এখনো কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হন।
লন্ডনভিত্তিক সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মাত্রা ভয়াবহ মাত্রায় বেড়ে গেছে। ২০১৩ সালে এটা ছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০১৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর মধ্যে ২৩ শতাংশই হয়েছে পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং গোয়েন্দা পুলিশের মাধ্যমে।
৬৬ দশমিক ৩১ শতাংশ হামলা চালায় রাষ্ট্রের বাইরের মানুষরা আর ৩৩.৬৯ শতাংশ সহিংসতা ও হামলার দায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও এর নেতাদের ওপর।
এই প্রতিবেদনে এত সব আক্রমণের মধ্যে মাত্র পাঁচটির তদন্ত প্রতিবেদন যুক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় হওয়া মামলার মধ্যে মাত্র ২৭ শতাংশ মামলার তদন্তকাজ ঝুলে রয়েছে। এ ছাড়া হামলার ঘটনার একটা বড় অংশ বা ৭০ শতাংশ ঘটনা তো আইনের আওতার বাইরেই থেকে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার কথাও জানিয়েছে আর্টিকেল নাইনটিন। সেখানে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত ব্যক্তি পুলিশের সহায়তা নেন না, তাই পুলিশও কোনো ব্যবস্থা নেয় না। বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে আইনানুগ ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের অনীহা আছে, তাই তারা এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নিতে ভয় পায়।
আইনে অসঙ্গতি ও অস্পষ্টতা থাকায় আইনটি হয়রানি করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি আইন) আইনটি যথেচ্ছ ব্যবহার করতে পারবে, এমন সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, আক্রমণের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া, তদন্তে বিলম্ব হওয়া, দণ্ডাদেশ কার্যকর না হওয়াসহ দায়মুক্তির যে সংস্কৃতি বাংলাদেশে চলছে তা সাংবাদিকদের জন্য কঠিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। আইনের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশে ভয়ের সংস্কৃতি বিরাজ করছে এবং এর ফলে অনলাইনে মত প্রকাশের হার কমে যাচ্ছে। অনলাইন কর্মকাণ্ড, এর ব্যবহারকারী ও ব্লগাররা নিজেদের মত প্রকাশের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করছেন। এটা বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জন্যও প্রযোজ্য।
২৮ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্যায় করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগের কারণে রাজনৈতিক নেতা বা রাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও আইন অমান্য করার সাহস দেখান। জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র হওয়ায় ২০১২ সালে জাতিসংঘ প্রণীত সাংবাদিকদের সুরক্ষায় নেওয়া পরিকল্পনা কার্যকর করতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া আন্তর্জাতির আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আইন প্রণয়নের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করে এমন বেআইনি পদক্ষেপগুলোকে রোধ করতে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার বলেও মনে করে সংস্থাটি।

অনলাইন ডেস্ক