ঘোড়দৌড় আর জামাই মেলা, বড়রিয়া মাঠে ঐতিহ্যের ১৩১ বছর
পৌষের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে ধুলো উড়িয়ে যখন ঘোড়াগুলো ছুটছে, তখন চারপাশ যেন ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়াল। খুরের শব্দ আর হাজারো মানুষের গগনবিদারী উল্লাসে মাগুরার মহম্মদপুরের বড়রিয়া মাঠ ফিরে পেল তার ১৩১ বছরের পুরোনো যৌবন। শতবর্ষী ঐতিহ্যের টানে এই জনপদে এখন উৎসবের আমেজ—একপাশে ঘোড়দৌড়ের রোমাঞ্চ, আর অন্যপাশে জামাই মেলা থেকে বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়ি ফেরার চিরায়ত রীতি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই মেলবন্ধন যেন মাগুরার মাটির চিরন্তন এক উৎসবের গল্প বলছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) ১৩১তম বর্ষেও অনুষ্ঠিত হলো মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বহুল প্রতীক্ষিত বড়রিয়ার ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা ও মেলা।
স্থানীয়রা জানান, খুলনা অঞ্চলের মধ্যে সর্ববৃহৎ এই মেলা উপলক্ষে অন্তত ৫০টি গ্রামের মানুষ উৎসবে মেতে ওঠেন। পার্শ্ববর্তী বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, মধুখালী, নড়াইল, ফরিদপুর ও যশোরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে ভিড় জমান।
মেলাটি স্থানীয়দের কাছে ‘জামাই মেলা’ নামেও পরিচিত। মেলা থেকে বড় বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যাওয়াই এখানকার জামাইদের এক পুরনো রীতি। ৬৫ বছর বয়সী এক প্রবীণ জামাই গোলাম রসুল বলেন, ‘আমি বহু বছর ধরেই এই মেলার সময় শ্বশুরবাড়ি আসি। এখানকার জামাইদের আসল আদর এই মেলাই হয়। জামাইরা মেলা থেকে বড় বড় মাছ হাতে করে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যায়।’
জানা গেছে, প্রায় ১৩০ বছর আগে শানু সরদার, ধনাউল্লাহ সরদার ও সোনাউল্লাহ সরদারের উদ্যোগে এই মেলায় ঘোড়দৌড়ের সূচনা হয়। সময়ের সঙ্গে রাস্তা পাকা হওয়ায় এখন মাঠেই এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
৮৩ বছর বয়সী রবিউল মুন্সী বলেন, ‘আগে ঘোড় দাবড়, সার্কাস, গান-বাজনা অনেক কিছু হতো। এখন মানুষ অনেক বেশি হয়। আমরা নাতি-পুতি নিয়ে ঘোড় দাবড় দেখতে এসেছি।’
মেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘লাঠি খেলা, নৌকাবাইচ, হাডুডু ছিল এখানকার মানুষের জীবনের বৈচিত্র্য। গত ১৮ বছরে গ্রামীণ সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা হয়েছে। আমরা আশা করি আমাদের দল ক্ষমতায় যাবে। গেলে আমরা নতুন বৈচিত্র্য ও মানুষের মাঝে সংস্কৃতির জাগরণ নিয়ে আসব।’
মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম খাঁন বাচ্চু ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজন সফল করায় সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ঘোড়দৌড়ের পাশাপাশি মেলায় বসেছে নানা পণ্যের পসরা এবং শিশুদের জন্য নাগরদোলাসহ বিভিন্ন রাইডস।

জালাল উদ্দিন, মাগুড়া (মোহাম্মদপুর-শালিখা)