জামালপুর-১ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস
ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা পাহাড়ি ও সমতলভূমি, যমুনা-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত জামালপুর জেলা ৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ জেলায় সংসদীয় আসনের সংখ্যা ৫টি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর জামালপুরে বইছে ভোটের হাওয়া। প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে।
দীর্ঘ দেড় দশক পর পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ভোটাররা। ১৯৭৮ সালে জেলায় উন্নীত হওয়ার পর থেকে এখানে আধিপত্য ছিল বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির। বিগত ১৫ বছর বাদ দিলে জেলার পাঁচটি আসনে স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই সমহারে আসন পেয়েছে। এবার নিজেদের হারানো আসনগুলো পুনরুদ্ধার করতে চায় বিএনপি। অপরদিকে, নতুন করে স্বপ্ন বুনছে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ, আমার বাংলাদেশ পার্টিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল।
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন ১৩৮, জামালপুর-১ আসন। এখানে বিএনপি ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীর রয়েছে বেশ জনপ্রিয়তা। জোটগত কারণে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন একক প্রার্থী দিলে বিএনপির সাথে লড়াই হবে মুখোমুখি। জোট না হলে এই আসনে সম্ভাবনা রয়েছে ত্রিমুখী লড়াইয়ের।
জামালপুরের উত্তরে ভারত সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়, নদ-নদী এবং চরাঞ্চল বেষ্টিত দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত জামালপুর-১ আসন। ১৯৯১ সালের পর থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত ৪টি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তিন বার ও বিএনপি এক বার জয়লাভ করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির কোষাধ্যক্ষ এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। এই আসনটিকে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি মনে করা হলেও ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের আবুল কালাম আজাদকে হারিয়ে বিএনপির এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত প্রথম বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে সংসদ সদস্য এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেন। ওই সময়ে বাস্তবায়িত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মামলা জটিলতার কারণে তিনি প্রার্থী হতে পারেননি। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে আবারো দলীয় মনোনয়ন দেয় বিএনপি। কিন্তু মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় তখনও তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়। এবারও দল তাকে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন দিয়েছে। বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন ঘোষণার আগ পর্যন্ত এই আসনে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সাবেক আইজিপি আবদুল কাইয়ুম মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তিনি নির্বাচনি এলাকায় বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে গণসংযোগও করেছেন। তবে দলের প্রাথমিক মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর আবদুল কাইয়ুমকে আর মাঠে দেখা যায়নি। তবে তিনি দলীয় প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করবেন বলে জানা গেছে। এদিকে, তফসিল ঘোষণার পর দলীয় নেতাকর্মীরা বেশ উজ্জীবিত। এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের দাখিল করা মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার পর নেতাকর্মীরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। দলীয় প্রার্থীকে নির্বাচনে বিজয়ী করতে ইতোমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু করেছে নেতাকর্মীরা।
এদিকে, নিজেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোষণা করে সবচেয়ে চমক সৃষ্টি করেন বকশীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের টানা ৪ বারের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ তালুকদার। পরিচ্ছন্ন নেতা হিসেবে বকশীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুর রউফ তালুকদারের বকশীগঞ্জ উপজেলায় দলমত নির্বিশেষে ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। তবে ২০১৬ সালে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হলেও প্রতিটি নির্বাচনে তিনি ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ান। সজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবে এই উপজেলায় তার একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে যোগদান করেন। দলে যোগদানের পরই তাকে জামালপুর-১ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। তাঁর প্রার্থিতা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক বৈধ ঘোষণার পর নেতাকর্মীরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোটযুদ্ধে নামার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। এখানে দলটির সাংগঠনিক অবস্থা ভালো হওয়ায় আসনটি দখলে করতে মরিয়া নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। বিগত ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান পদে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন। তাই নির্বাচনের মাঠে দলটি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। শেষ পর্যন্ত আব্দুর রউফ তালুকদার নির্বাচনের মাঠে থাকলে এই আসনে চাপে পড়তে পারেন ধানের শীষের প্রার্থী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী আব্দুর রউফ তালুকদারের পক্ষে কাজ করবেন বলে জানা গেছে।
এই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অ্যাডভোকেট নাজমুল হক সাঈদী। তিনি তার কর্মী-সমর্থক ও দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে প্রতিনিয়ত বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জে, মাঠে-ঘাটে চষে বেড়াচ্ছেন। দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট টানতে ভোটারদের ঘরে-ঘরে পৌছে যাচ্ছেন দলের কর্মীরা। কর্মীসভা, পথসভা ও সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত যোগ দিচ্ছেন অ্যাডভোকেট নাজমুল হক সাঈদী। জামালপুর-১ আসনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তিন জন প্রার্থীরই মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী জোটের কারণে আব্দুর রউফ তালুকদারকে সমর্থন দিলে পাল্টে যাবে ভোটের হিসাব এবং চাপে পড়বেন বিএনপি প্রার্থী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তাছাড়াও বিএনপির অনেক নেতাকর্মীরাও আব্দুর রউফ তালুকদারের পক্ষে কাজ করবেন। কিন্তু জোট না হলেও বিএনপি ও ইসলামী আন্দোলনের মুখোমুখি অবস্থানের সুযোগটিকে ব্যবহার করে আসনটি নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া জামায়াতে ইসলামী। এখানে ধানের শীষের সাথে দাঁড়িপাল্লা এবং হাতাপাখার মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই আসনে ৪ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও হলফনামায় অসম্পূর্ণ তথ্যের জন্য জাতীয় পার্টির প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়পত্র বাতিল করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা।
দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত জামালপুর-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৩১ হাজার ৭০৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৬ হাজার ৭০৭ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৯৮ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের রয়েছে ২ জন ভোটার। ভোটার ও প্রার্থীদের প্রত্যাশা তফসিল অনুযায়ী যথাসময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া সকল দলের প্রার্থী ও সমর্থকরা নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে চলবেন। নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা নিয়ে যেন কোন সংঘাত বা সহিংসতা না হয় যেজন্য প্রশাসনসহ সবাইকে সজাগ থাকবে হবে। ভোটের দিন যেন ভোটকেন্দ্রগুলোতে নির্বিঘ্নে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট প্রদানের সুষ্ঠু পরিবেশ থাকে এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ ভোটারদের।

আসমাউল আসিফ, জামালপুর