বাঁচার লড়াইয়ে ইমরান, পাশে দাঁড়ালেন জেলা প্রশাসক
চট্টগ্রামের হালিশহরের বড় পুকুরপাড়ের ছোট্ট একটি ভাড়া ঘর। ঘরের এক কোণে কাশির শব্দে ভেঙে আসে নীরবতা। শীর্ণদেহী ইমরান হোসেন দুলাল শুয়ে আছেন। চোখে ক্লান্তি, মুখে অসহায়ত্ব। পাশে বসে স্ত্রী চম্পা বেগম। দুই শিশুসন্তানের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বারবার চোখ মুছছেন তিনি।
ইমরান কুমিল্লার লাকসাম থানার বাসিন্দা। জীবনের তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের হাটবাজার ও ফুটপাতে কবিরাজি গাছগাছন্ত বিক্রি করেই চলছিল তার জীবনযাপন। আয় ছিল সামান্য, কিন্তু সেই সামান্য আয়ের মধ্যেই ছিল সুখের সংসার। দশ বছর বয়সী ছেলে রাব্বি আর সাত বছরের মেয়ে তাইবার আক্তার ইশাকে ঘিরে ছিল তার সব স্বপ্ন।
হঠাৎ করেই সেই স্বপ্নে নেমে আসে অন্ধকার। ধরা পড়ে মরণব্যাধি ক্যানসার। দেড় বছর ধরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চলছে চিকিৎসা। একদিকে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই, অন্যদিকে দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ—দুই লড়াইয়ে ক্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন ইমরান।
হালিশহরের ভাড়া বাসায় বসবাস করে যেখানে নিত্যদিনের খাবারের সংস্থান করাই কঠিন, সেখানে ক্যানসারের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা যেন পাহাড়সম বোঝা। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের কাছ থেকে ধারদেনা করে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন চম্পা বেগম। কিন্তু একসময় সেই পথও বন্ধ হয়ে আসে। তখন একমাত্র সম্বল ছিল মানুষের মানবিকতার ওপর ভরসা।
চম্পা বেগম জানান, বিভিন্ন মানুষের মুখে তিনি শুনেছেন চট্টগ্রামের নবাগত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার মানবিক উদ্যোগের কথা। সেই আশার আলো বুকে নিয়ে বুধবার (২১ জানুয়ারি) তিনি স্বামীকে সঙ্গে করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান।
সেদিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের শেষ দিন। কার্যালয়জুড়ে ব্যস্ততা। তবু সেই ব্যস্ততার মাঝেই জেলা প্রশাসক সময় করে শোনেন ইমরান ও তার পরিবারের করুণ গল্প। অসহায় এই পরিবারের কথা শুনে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ইমরানের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
কার্যালয় থেকে বেরিয়ে এসে চম্পা বেগম এই প্রতিবেদককে বলেন, “এই চিকিৎসার খরচের তুলনায় এই সহায়তা খুবই সামান্য। কিন্তু উনি যে আমাদের সময় দিয়েছেন—সেটাই আমার কাছে অনেক বড়।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, “টাকার অভাবে এখনো ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাতে পারিনি। অনেক দিন আছে, ঠিকমতো ভাত জোটে না।”
চম্পা জানান, দুটি নাবালক সন্তান নিয়ে স্বামীর চিকিৎসা খরচ, বাসাভাড়া ও সন্তানদের ভরণপোষণের দায় কাঁধে নিয়ে কখনো আহারে, কখনো অনাহারে দিন কাটছে তাদের।
ইমরান হোসেন কষ্ট চেপে বলেন, “আমার অসুখে আমার বাচ্চাগুলোর জীবন থেমে গেছে। টাকার অভাবে ওরা অনেক সময় অর্ধাহারে থাকে।”
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞার কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তার। বলেন, “উনাকে খুব ভালো মানুষ মনে হয়েছে। অন্তত একজন আমাদের কথা মন দিয়ে শুনেছেন।”
মানবিক এই সহায়তা হয়তো ইমরানের দীর্ঘ চিকিৎসা পথের সব বোঝা লাঘব করতে পারবে না। তবু অসহায় এই পরিবারের কাছে এটি নতুন করে বাঁচার আশার আলো। এখনো তারা তাকিয়ে আছে সমাজের মানবিক মানুষগুলোর দিকে—যেন কেউ একজন এগিয়ে এসে ইমরানের চিকিৎসা ও দুই শিশুর ভবিষ্যৎ বাঁচাতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক