দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা জামায়াতে ইসলামীর
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে। যেকোনো স্তরে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে দলটি।
আজ বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ছাড়া সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে জামায়াতে ইসলামী ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেবে।
জামায়াতের ইশতেহারে বলা হয়, প্রশাসনের সব স্তরে সেবাগুলো ডিজিটালাইজ করে সরাসরি যোগাযোগ ও তদবির বন্ধ করা হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা সংবলিত পাঠ্যক্রম যুক্ত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সৎ ও মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সরকারি দপ্তরের সর্বত্র সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে, যাতে সব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়। দুর্নীতির জন্য শাস্তি নিশ্চিতে দ্রুত বিচারের মাধ্যমে শাস্তি কার্যকর করা হবে। দুর্নীতিবাজদের অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও সিভিল সোসাইটিগুলোর ভূমিকা আরও সক্রিয় করতে আইনি ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করা হবে। মন্ত্রী ও এমপিসহ সব পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী জনসাধারণের সামনে পেশ করতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
দুর্নীতিরোধে সব পর্যায়ের কাঠামোগত পর্যালোচনা করে দুর্নীতি সুযোগগুলোকে প্রতিরোধ করা হবে। বড় বড় দুর্নীতির উৎসগুলো পর্যালোচনা করে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে ‘আমার টাকা আমার হিসেব’ অ্যাপ চালুর মাধ্যমে সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসেব প্রদান করা হবে। এ ছাড়া যেসব বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী অগ্রাধিকার দেবে—
১. ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’—এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন (National Interest)।
২. বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন (Social Justice)।
৩. যুবকদের ক্ষমতায়ণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া (Youth First)।
৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন (Women Participation) I
৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ (Public Safety and Security)।
৬. সব পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন (Zero Corruption) |
৭. প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক স্মার্ট সমাজ গঠন (Tech-based Society)।
৮. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ (widespread Employment)।
৯. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ (Robust and Sustainable Economy)।
১০. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা (Strong and Functional Democracy)।
১১. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা (Justice and Human Rights)।
১২. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে (July Spirit)।
১৩. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা (Agro-Revolution)।
১৪. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং তিন শূন্য ভিশন (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা), বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়া (Food Security and Environmental Sustainability)।
১৫. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ণ ও কর্মসংস্থান তৈরি (Industrialisation)।
১৬. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ; বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ, সৃষ্টি করা (Reasonable Salary and Hassle-free Job Environment)|
১৭. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সব অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা (Pro-Expatriate Approach)।
১৮. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়; বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা (Inclusive Nation)।
১৯. আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান (Universal Healthcare System) এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
২০. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা (Educational Reform)।
২১. দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার সংস্থানের নিশ্চয়তা (Provision of Necessities)।
২২. যাতায়াত ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা (Transport Revolution)।
২৩. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা (Affordable Housing ) I
২৪. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা (Reform Pro-fascist System)।
২৫. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সব নাগরিকের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা (Social Security)।
২৬. সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা (Welfare State)।

নিজস্ব প্রতিবেদক