‘প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন’
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার সময় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’—এই মূলনীতির ভিত্তিতে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ছয় দিন আগে আজ শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সাড়ে তিনটায় রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এক অনুষ্ঠানে এ ইশতেহার ঘোষণা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে পরিচালনা করেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।
নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণায় তারেক রহমান বলেন, কাউকে কোনো নাগরিকের ধর্মবিশ্বাসকে আঘাত করতে দেওয়া হবে না। দেশের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ এবং প্রতিটি গোষ্ঠী-গোত্র-সম্প্রদায় নির্বিঘ্নে ও নিশ্চিন্তে যার যার ধর্ম ও ধর্মীয় উৎসব পালন করবে।
তারেক রহমান আরও বলেন, ধর্ম-বর্ণ, কিংবা ভৌগোলিক আদর্শিক অবস্থান নির্বিশেষে, প্রত্যেক নাগরিক যেন তার ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অধিকার বিনা বাধায় উপভোগ করতে পারে, এই লক্ষ্যেই মুক্তিযোদ্ধারা লাখো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিষ্টান—এমন প্রশ্ন ছিল না। বিএনপি মনে করে, স্বাধীন বাংলাদেশেও তথাকথিত সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু নিয়ে আলোচনার কোনো অবকাশ নেই। দেশের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করবে। আমরা বিশ্বাস করি; দল-মত-ধর্ম যার যার, কিন্তু রাষ্ট্র সবার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার। প্রত্যেক নাগরিকের একমাত্র পরিচয়—আমরা বাংলাদেশি। এই বাংলাদেশ আমাদের সবার।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি নিশ্চিতকরণ
‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’—এই মূলনীতির ভিত্তিতে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন। কাউকে কোনো নাগরিকের ধর্মবিশ্বাসকে আঘাত করতে দেওয়া হবে না। দেশের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ এবং প্রতিটি গোষ্ঠী-গোত্র-সম্প্রদায় নির্বিঘ্নে ও নিশ্চিন্তে যার যার ধর্ম ও ধর্মীয় উৎসব পালন করবে।
সব ধর্মীয় প্রধানের সামাজিক মর্যাদা ও জীবনমান উন্নয়ন
খতিব, ইমাম-মুয়াজ্জিন সাহেবদেরকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাসিক সম্মানি প্রদান করা হবে। তাদেরকে ধর্মীয় উৎসবে বিশেষ ভাতা প্রদান করা হবে। অন্যান্য ধর্মের (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য) উপাসনালয়ের প্রধানদেরকে মাসিক সম্মানি, উৎসব ভাতা প্রদান করা হবে। দক্ষতা-উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পার্ট-টাইম বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদের অধিকতর আয়ের পথ সুগম করা হবে। খতিব, ইমাম-মুয়াজ্জিন সাহেব এবং অন্যান্য সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বৃত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
সব ধর্মাবলম্বীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগোষ্ঠীর ঘর-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয় ভাঙচুর এবং তাদের সম্পত্তি দখলের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একইসঙ্গে এ ব্যাপারে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। একজন ‘মায়ের চোখে বাংলাদেশ’ যেমন, তেমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে যেখানে বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, সংশয়বাদী প্রতিটি সন্তান, প্রতিটি মানুষ নিরাপদে বসবাস করবে।
ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাষ্ট্রের উন্নয়ন
ধর্মীয়, শিক্ষা ও কল্যাণমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করার লক্ষ্যে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট, বৌদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্ট ও খ্রিস্টান কল্যাণ বোর্ডে বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে গতিশীল করা হবে। ফাউন্ডেশনের বাজেট বরাদ্দ ও কর্মপরিধি বৃদ্ধি করা হবে।
ইসলামী গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণ
ইসলামী গবেষণাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ইসলামী গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারিত করা হবে। ধর্মীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য গ্রহণযোগ্য ওলামায়ে কেরামের অংশগ্রহণে নিশ্চিত করা হবে। ধর্মীয় অঙ্গনে আলেমদের নির্বিঘ্নে, সসম্মানে ও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা প্রদান করা হবে।
সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও প্রবাসীবান্ধব হজ ব্যবস্থাপনা গঠন
ধর্মপ্রাণ নাগরিকদের জন্য একটি সাশ্রয়ী, সহজলভা, মানবিক ও প্রবাসী-বান্ধব হজ ব্যবস্থাপনার গড়ে তোলা হবে। হজ পালনের ব্যয় কমাতে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
গণশিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ
১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকার প্রবর্তিত মসজিদ-ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম সারা দেশে বিস্তৃত করা হবে। পাহাড় ও সমতলের নৃগোষ্ঠী সবার নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ দল-মত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ি ও সমতলের ক্ষুদ্র-বৃহৎ সব জাতিগোষ্ঠীর সংবিধান প্রদত্ত সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্ম-কর্মের অধিকার, নাগরিক অধিকার এবং জীবন, সম্ভ্রম ও সম্পদের পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করা হবে।
‘নৃ-গোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত নৃ জাতি-গোষ্ঠীর ভাষ্য সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় এবং সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘নৃজাতি-গোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
টেকসই শান্তি স্থাপন
সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণে ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের সন্ত্রাস ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসনের জন্য আস্থা বিনির্মাণ প্রক্রিয়া (কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজার্স) ও সামাজিক পুনর্গঠন কর্মসূচি (সোস্যাল রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম) গ্রহণ করা হবে।
পার্বত্য জেলা হাসপাতালের আধুনিকায়ন
স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকল্পে তিন পার্বত্য জেলার জেলা হাসপাতালগুলোকে আধুনিকায়ন করা হবে।
কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
পাহাড়ি পণ্য, হস্তশিল্প ও ইকো-ট্যুরিজমে বিনিয়োগ এবং স্থানীয় যুবদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা। উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশেষ কর্মসূচি এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা হবে।
এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন প্রতিষ্ঠা
পার্বত্য এলাকার নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে ‘এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন’ গড়ে তোলা হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হবে।
শতভাগ সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ
পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থেকে যোগ্যদের পর্যায়ক্রমে শতভাগ সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর আওতায় নিয়ে আসার প্রয়াস নেওয়া হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক