নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে নেমে হতাশ জেলেরা
জাটকা সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞা শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) মধ্য রাত থেকে ইলিশ আহরণের জন্য জাল-নৌকা নিয়ে নদীতে নেমেছেন জেলেরা। দীর্ঘ ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পেয়ে হতাশ পটুয়াখালীর বাউফলের জেলেরা।
ইলিশ সম্পদ বৃদ্ধি লক্ষে জাটকা সংরক্ষণে দুই মাস (মার্চ- এপ্রিল) দেশের ছয়টি অভয়াশ্রমে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। তেঁতুলিয়া নদীর ভোলার চর ভেদুরিয়া থেকে পটুয়াখালীর চর রুস্তম পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার এলাকা ইলিশের অভয়াশ্রয়ম হওয়ায় এ নদীতেও নিষেধাজ্ঞা ছিল।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে তেঁতুলিয়া নদীতে ১৮০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে এক লাখ ৯২ হাজার ৫০০ মিটার জাল জব্দ করা হয়। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে নামায় ৩১টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ সময় উপজেলার ছয় হাজার কর্মহীন জেলে পরিবারকে (মাসিক ৪০ কেজি করে দুই মাসে ৮০ কেজি) ৪৮০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়।
নদীতে মাছ ধরে আসা জেলে মো. জয়নাল মাঝি (৪২) বলেন, ‘দুইডা মাস নদীতে জাল বাইনি। ধারদেনা করে বহুকষ্টে সংসার চালাইছি। নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে যাইয়া দেহি মাছ নাই। রাইত হইতে ব্যান (সকাল) পর্যন্ত জাল বাইছি। মাছ পাইছি ৭০০ টাকার। এতে খরচই আছে ৪০০ টাকা। কেমনে চলমু আমরা জাইল্লারা?’
আরেক জেলে সোহরাব হোসেন (৩৮) বলেন, ‘দুই মাস বেকার ছিলাম। ব্যাংকের লোনের টাকা দিয়ে সংসার চালাইছি। এখন বড় বড় মাছের আশা নিয়ে নদীতে নেমে দেখি মাছ নাই। এই সিজনে জাল ভরে মাছ উঠার কথা, কিন্তু জাল উঠে খালি।’
তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ ধরার জেলেরা বলছেন, নৌপুলিশ ও মৎস্যবিভাগের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে ম্যানেজ করে নিষেধাজ্ঞার সময়ও নদীতে অবৈধ কারেন্ট জাল, চায়না জাল, বেড়জাল, বাধাজাল, বেহুন্দি জাল ফেলে মৌসুমি জেলেরা। এসব নিষিদ্ধজালে নদীর ছোট মাছ, জাটকা, চাপিলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের ডিম ও রেনু পোনা ধ্বংস হয়ে যায়। যে কারণে দিন দিন তেঁতুলিয়া নদীর মাছ কমে যাচ্ছে। মাছ কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন প্রকৃত জেলেরা।
বাউফল উপজেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মো. বাবুল ব্যাপারী বলেন, ‘যারা মৎস্য সম্পদ রক্ষা করবেন, তারাই (নৌপলিশ ও মৎস্য বিভাগ) অবৈধভাবে মৎস্য সম্পদ ধ্বংস করতে সাহায্য করছেন। অব্যাহতভাবে নদীর বিভিন্ন পোনা, রেনু ডিম ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ কমে গেছে। জেলেদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে নিষেধাজ্ঞাকালীন সময় প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এম এম পারভেজ বলেন, ‘জাটকা সংরক্ষণে অভয়াশ্রমে আমরা সফলভাবে অভিযান শেষ করেছি। এখন জেলেরা নদীতে মাছ শিকারে নামছেন। তবে এখন নদীতে মাছ তুলনামূলক কম। কিছুদিন পর নদীতে মাছ বাড়বে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, মা ইলিশ রক্ষা অভিযান, জাটকা সংরক্ষণ ও অভয়াশ্রম সংরক্ষণ অভিযান কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করে থাকি। লোকবল কম থাকার পরেও অভিযান সফল করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। তার পরও কিছু অসাধু জেলে আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নদীতে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন করে। এ বিষয়ে আগামীতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিষেধাজ্ঞা শেষে আড়তের মাছের আমদানি কম থাকায় ইলিশের বাজার দর একটু বেশি। এক কেজি সাইজের প্রতিটি ইলিশ দুই হাজার ৮০০ টাকা, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম সাইজের প্রতিকেজি ইলিশ দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকা, ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রামের প্রতিকেজি ইলিশ এক হাজার ৮০০ টাকা এবং ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রামের প্রতিকেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৪০০ টাকা। আর ছোট সাইজের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে এক হাজার টাকা কেজি দরে।
কালাইয়া মৎস্য বন্দরের মৎস্য ব্যবসায়ী মিঠুন দাস বলেন, আড়তে মাছের সরবরাহ কম। যেকারণে মোকামে দাম বেশি। কিছুদিন পর মাছের সরবরাহ বাড়লে দাম অনেকটা কমে যাবে।

এম.এ হান্নান, পটুয়াখালী (বাউফল-দুমকি)