লোনাপানির গ্রাসে বাউফলের নিরাপদ পানি প্রকল্প
পটুয়াখালীর বাউফলে ঘরে ঘরে নিরাপদ পানি পৌঁছে দিতে প্রায় ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও একদিনের জন্যও সুপেয় পানি ব্যবহার করার সুযোগ হয়নি এলাকাবাসীর। এ যেন লোনাপানিতে ভেসে গেছে নিরাপদ পানির প্রকল্প।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশল কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী ও নির্মাণকাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি। নির্মাণকাজ শেষে বিশুদ্ধ পানির বদলে লোনাপানি ওঠায় এলাকাবাসী ওই পানি একদিনও ব্যবহার করতে পারেনি।
প্রকল্পের বিষয়ে জানতে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। দায়িত্বরত কর্মকর্তা জানান, এই প্রকল্পের কোনো ফাইল অফিসে নেই। যে কারণে তিনি কোনো তথ্য দিতে পারছেন না।
স্থানীয়রা জানায়, নিরাপদ পানির সংকট দূর করতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে কালাইয়া আদর্শ গ্রামে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর নলকূপ, সাবমারসিবল পাম্প, পানি সংরক্ষণে রাখার জন্য চারটি ওভারহেড ট্যাংক ও পানির পাইপ লাইন স্থাপন করা হয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় ৮০ লাখ টাকা। গভীর নলকূপ ও সাবমারসিবল পাম্প বসানোর পর পরীক্ষা মূলক পানি উত্তোলন করলে দেখা যায় বিশুদ্ধ পানির পরিবর্তে লবণাক্ত পানি উঠে। এ অবস্থায় রেখেই উধাও হয়ে যায় ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুরু থেকেই নির্মাণকাজে নিম্ন মানের সামগ্রীসহ ব্যাপক অনিয়ম করে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও ঠিকাদার। এলাকাবাসী একাধিক বার এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেও বিষয়টি আমলে নেয়নি উপজেলা জনস্বাস্থ্যের তৎকালীন উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলী আশরাফ।
এদিকে, এ প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য স্থানীয়দের নিয়ে পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে উপজেলা জনস্বাস্থ্য বিভাগ। ওই কমিটিতের প্রধান করা হয় আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা মো. কবির হোসেনকে। তার নামেই বিদ্যুতের মিটার স্থাপন করা হয়। পানির লাইন পরীক্ষা করার জন্য যে বিদ্যুৎ বিল আসে তা নিয়ে পরিশোধ নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান কবিরের নামে মামলা করে বিদ্যৎ বিভাগ। পরে স্থানীয় উপজেলা জনস্বাস্থ্য সহকারী প্রকৌশলীকে চাপ দিয়ে ঠিকাদার ও তৎকালীন উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আশরাফ বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে দেন।
স্থানীয়রা বলছে, এ প্রকল্পে সীমাহীন দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে রাষ্ট্রের টাকা অপচয় হয়েছে। এ প্রকল্পের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত প্রকল্প পরিচালক, উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার।
কালাইয়া আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, ‘এ প্রকল্প আমাদের কোনো কাজে আসেনি। বিশুদ্ধ পানির বদলে লোনাপানি উঠে। যে কারণে আমরা কেউ পানি ব্যবহার করিনি। পরে ঠিকাদার বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কেউ নিরাপদ পানি উত্তোলনের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী মো. মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। খোঁজ না নিয়ে কিছু বলতে পারছি না। খোঁজ নিয়ে জানাব।’
তৎকাকালীন দায়িত্বরত উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আশরাফ হোসেন বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় তার কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জেলা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘এ প্রকল্পের অর্থায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর। আমরা শুধু নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছি। তার পরও যদি নির্মাণকাজে অনিয়ম হয়ে থাকে সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রকল্প সচল করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হবে।’

এম.এ হান্নান, পটুয়াখালী (বাউফল-দুমকি)