১৩ বছরেও শেষ হয়নি সড়ক সংস্কার, ব্যয় বেড়ে ২৮০ কোটি টাকা
খুলনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ রূপসা ব্রিজ থেকে খুলনা শিপইয়ার্ড পর্যন্ত মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়ক সংস্কার ও সম্প্রসারণ প্রকল্প যেন এখন জনদুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ২০১৩ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প ২০১৫ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। বরং প্রকল্প ব্যয় ৯৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮০ কোটিতে। এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। একই সঙ্গে প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বর্তমানে সড়কটির অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। কাদা ও খানাখন্দে ভরা সড়কে ছোট যানবাহন চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটছে, যানবাহন বিকল হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে খুলনা শিপইয়ার্ড, নৌবাহিনীর স্থাপনা, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থাকলেও বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগের কোনো শেষ নেই।
স্থানীয় গ্যারেজ মালিক জলিল হাওলাদার বলেন, এই সড়কে গর্ভবতী নারী চলাচল করলে পথেই ডেলিভারি হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয়। শিক্ষার্থীরা প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ে। এমনকি মরদেহবাহী গাড়ি গেলেও মরদেহের কবর আজাবের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সড়কের বেহাল অবস্থার প্রতিবাদে বিভিন্ন সময় নাগরিক কমিটি মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন এবং কাদার মধ্যে ধানের চারা রোপণ করে ব্যতিক্রমী কর্মসূচি পালন করেছে। নাগরিক কমিটির নেতা অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) সূত্র জানায়, শুরুতে এই প্রকল্পের দায়িত্ব পায় বহুল আলোচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব ব্রাদার্স লিমিটেড। পরে কাজের ধীরগতির কারণে তাদের কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ নেয় কেডিএ। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আদালতে মামলা করায় কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেডিএ প্রতিষ্ঠানটির জামানত বাজেয়াপ্ত করে আর্থিক জরিমানা আরোপ করে।
কেডিএর সদস্য (উন্নয়ন) রুহুল আমিন কুতুবুদ্দিন বলেন, এই প্রকল্পটি এত দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে যে এটি গিনেস বুকে স্থান পাওয়ার মতো ঘটনা। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক সুপারিশে নিম্ন দরদাতা না হয়েও মাহবুব ব্রাদার্সকে কাজ দেওয়া হয়েছিল।
খুলনা শিপইয়ার্ড সড়কের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব ব্রাদার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এর আগেও কয়েকবার বক্তব্য দিয়েছি। নতুন করে আর কিছু বলতে চাই না।
প্রকল্প পরিচালক ও কেডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরমান হোসেন জানান, আগের ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ১৫ মে টেন্ডার জমা দেওয়ার শেষ দিন এবং চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের ঠিকাদার ইতোমধ্যে ৭১ কোটি টাকার কাজ করেছে এবং সেই অর্থ পরিশোধও করা হয়েছে।
সম্প্রতি খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু সড়কটি পরিদর্শন করে এটিকে ‘খুলনাবাসীর কান্না’ বলে আখ্যা দেন। তিনি দ্রুত কাজ শেষ করতে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জানান। তার উদ্যোগের পর সড়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সড়কটি পরিদর্শন করেছেন।

মুহাম্মদ আবু তৈয়ব, খুলনা