সড়ক নির্মাণে অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে ‘আমার দেশ’ পত্রিকার কোটালীপাড়া উপজেলা প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েলের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন এক ঠিকাদার। এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা মামলাটিকে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক দাবি করে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে গোপালগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে ঠিকাদার মো. ইয়াসিন হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। আদালতের বিচারক রাইফা সরকার মামলাটি আমলে নিয়ে সমন জারি করেছেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, সড়কে পিচ ঢালাইয়ের সময় সাংবাদিক মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েলসহ অজ্ঞাত ৪-৫ জন ঠিকাদার ইয়াসিন হোসেনের কাছে দেড় লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে শ্বাসরোধের চেষ্টা করা হয় এবং অজ্ঞাত ব্যক্তিদের দিয়ে সড়কের কার্পেটিং উঠিয়ে ফেলা হয়।
তবে মামলার বিবরণীর সঙ্গে ঠিকাদারের দেওয়া মৌখিক বক্তব্যের অমিল পাওয়া গেছে। চাঁদা দাবির কোনো প্রমাণ আছে কি না জানতে চাইলে ঠিকাদার বারবার বিষয়টি এড়িয়ে যান।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, উপজেলার শিকিরবাজার স্কাউট ভবন থেকে পূর্ব চিত্রাপাড়া পর্যন্ত সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ কাজে শুরু থেকেই নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার ও বিভিন্ন কারিগরি অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। প্রজেক্টের নকশা অনুযায়ী রাস্তার দুই পাশে প্রায় তিন ফুট করে মাটির শোল্ডার নির্মাণের কথা থাকলেও অধিকাংশ স্থানে তা করা হয়নি। এজিংয়ের কাজে পুরোনো ও নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে এবং বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ে মান বজায় না রাখায় কাজ শেষ হওয়ার দুই-তিন দিনের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে যেতে শুরু করে। হাত দিয়ে টান দিলেই কার্পেটিং উঠে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে গত ৩০ জুন এলাকাবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ জুলাই ‘আমার দেশ’ পত্রিকাসহ একাধিক গণমাধ্যমে সড়ক নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
সাংবাদিক মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েলের দাবি, সংবাদ প্রকাশের আগেই ঠিকাদার তাকে মোবাইল ফোনে হুমকি দিয়েছিলেন এবং অনিয়মের বিষয় থেকে জনমত ভিন্নদিকে ঘোরাতেই এই মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গোপালগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি জুবায়ের হোসেন, সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত শিরালী এবং টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাবেরুল ইসলাম বাধন এই মামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলা দেওয়ার যে ট্রেন্ড চালু হয়েছে, তা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি স্বরূপ। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর শাস্তির দাবি জানান তারা।
কোটালীপাড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি সুধান্য ঘরামী এবং স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়ার সহ-সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, ওই ঠিকাদারের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। এলাকাবাসী অনিয়মের প্রতিবাদ করলেই তিনি মামলা-হামলার ভয় দেখান।
এ বিষয়ে ওই প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী জাকাউল্লাহর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি দেশের বিভিন্ন জেলায় সড়ক নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে। গোপালগঞ্জে তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি রয়েছেন, প্রয়োজন হলে তিনি তার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। ইয়াসিন হোসেনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি আমার কাজের পার্টনার।
সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কি বলেন! মামলা করবে কেন? ইয়াসিন তো আমাকে এ বিষয়ে কিছুই জানায়নি। মামলার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।
কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাগুফতা হক বলেন, সড়ক নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ ও ভিডিও দেখেছি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কারিগরি টিমকে খতিয়ে দেখার জন্য জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, এলজিইডির গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) আওতায় প্রায় ৭৪ লাখ ৬৭ হাজার ৩০১ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ২৬৫ মিটার দীর্ঘ এই সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কার্যাদেশ পায় চুয়াডাঙ্গার ‘জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড’। প্রতিষ্ঠানটির পার্টনার বা স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজটি বাস্তবায়ন করছেন ঠিকাদার ইয়াসিন হোসেন।
এ বিষয়ে এলজিইডির গোপালগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী এহসানুল হক জানিয়েছিলেন যে তদন্তে ত্রুটি পাওয়া গেলে ঠিকাদারকে পুনরায় কাজ করতে হবে। তবে এলজিইডির কারিগরি টিমের তদন্ত প্রতিবেদনের সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তার মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

মাসুদ পারভেজ, গোপালগঞ্জ