‘মার্চ টু ঢাকা’ একদিন এগিয়ে আনা হয় যে কারণে
ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত সাফল্যের মাত্র দুদিন আগে ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক বিশাল সমাবেশে তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগে এক দফা দাবি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। সেদিন বিকেল ৫টার দিকে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী নাহিদ ইসলাম হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে এই ঘোষণা দেন এবং শেখ হাসিনার সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।
নাহিদ ইসলাম শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণাও করেন। মাঝখানে দুইদিনের (৪ ও ৫ আগস্ট) আল্টিমেটাম দেওয়া হয় সরকারকে। এর মধ্যে দাবি মানা না হলে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালন করা হবে।
তবে ৪ আগস্ট ঢাকাসহ সারাদেশে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়, বেপেরোয়া হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদিন শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে সারাদেশে কমপক্ষে ৯৩ জন নিহত হন।
পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পেরে ৪ আগস্ট রাত ৮টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ ঘোষণা করেন— পরশু (৬ আগস্ট) নয়, আগামীকালই (৫ আগস্ট) ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি।
আসিফ মাহমুদ এক ভিডিও বার্তায় বলেন, জরুরি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। সারা দেশ থেকে মুক্তিকামী জনগণকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানাচ্ছি। আপনারা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ঢাকার পথে রওনা হয়ে যান। চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। আপনারা সবাই চলে আসুন। কৃষক, শ্রমিক, দিন মজুর, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী সবাই চলে আসুন। আমরা শাহবাগে জড়ো হওয়ার পর গণভবনের দিকে যাত্রা করব। চূড়ান্ত বিজয় খুবই কাছে চলে আসছে। জানি না, আজকের পর আমাদের অবস্থা কী হবে। জানি না আমরা বেঁচে থাকতে পারব কিনা? আমরা না থাকলেও আপনারা রাজপথে থেকে চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনবেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে বিদায় করেই ঘরে ফিরবেন।
আসিফ মাহমুদের এই ঘোষণার পর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিরোধিতাকারীরা গুজব ছড়ায় যে সমন্বয়কদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। আসিফ মাহমুদের এই ভিডিও সঠিক নয়। বলা হয়, এক গ্রুপ সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, আরেক গ্রুপ আন্দোলন চালিয়ে নিতে চাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলমও ফেসবুক পোস্টে ঘোষণা দেন— পরশু (৬ আগস্ট) নয়, কালকেই (৫ আগস্ট) ‘লং মার্চ টু ঢাকা।’ এর কিছুক্ষণ পর রাত ১০টার দিকে সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেন, আগামীকালই ‘মার্চ টু ঢাকা’। ইতিহাসের সাক্ষী ও চূড়ান্ত লড়াইয়ে শামিল হতে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করুন এখনই।
এ বিষয়ে সম্প্রতি আসিফ মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, সময় যত গড়াচ্ছিল, বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর আসছিল যে, আওয়ামী লীগ ঢাকায় বড় ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে আবার ইন্টারনেট বন্ধ করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল।
আসিফ জানান, প্রথমে ‘মার্চ টু ঢাকা’ ৬ আগস্ট করার সিদ্ধান্ত ছিল। তবে ৪ আগস্ট পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তাদের মনে হয়, আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, তখন নাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করে আমি ৫ আগস্ট কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিই।
তিনি আরও বলেন, সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। ব্যর্থ হলে পুরো দায় আমার ওপর আসতে পারত। তারপরও তখন মনে হয়েছিল, আন্দোলনের গতি ধরে রাখতে এবং সম্ভাব্য দমনপীড়নের আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
আসিফ মাহমুদের সে সিদ্ধান্তই বাংলাদেশের জন্য টার্নিং পয়েন্ট। ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দেশ ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়। তবে এদিনও ঝরে যায় অসংখ্য প্রাণ। আহত হয় বহু মানুষ।
হাজারো প্রাণের বিনিময়ে দীর্ঘ ৩৬ দিনের আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে অবশেষে ধরা দেয় নতুন এক বাংলাদেশ।

সোহরাব হোসেন