পাচার হওয়া সম্পদ ফেরত আনতে দেশে-বিদেশে আইনি তৎপরতা জোরদার
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় জোর দিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশে সম্পদ শনাক্ত ও জব্দের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে সেগুলো উদ্ধারের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, অর্থ পাচার করে বিদেশে নেওয়া সম্পদ উদ্ধারের কার্যক্রম এখন শুধু দেশের ভেতরের তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিএফআইইউ প্রধান আরও বলেন, দেশের আদালতের আদেশ দিয়ে বিদেশে থাকা সম্পদ সরাসরি জব্দ করা যায় না। যে দেশে সম্পদ রয়েছে, সেই দেশের আইন ও আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হয়। এ কারণে পারস্পরিক আইনি সহায়তা (এমএলএ) ব্যবস্থার আওতায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং সহযোগিতা বাড়ানো হয়েছে।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিদেশি সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগকে এ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি উল্লেখ করে বিএফআইইউ প্রধান জানান, যুক্তরাজ্যে থাকা তার সম্পদ উদ্ধারে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। এরই অংশ হিসেবে লন্ডনের একটি আদালতে তাকে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করা হয়েছে।
মোহাম্মদ মামুন বলেন, বিএফআইইউ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দীর্ঘ প্রচেষ্টায় সাবেক মন্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদ শনাক্ত, জব্দ এবং মালিকানা যাচাইয়ের পর যুক্তরাজ্যে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি ব্যাংকগুলো একটি আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে নিয়োগ দিয়েছে। ওই আইন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের আদালতে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করা হয়েছে।
বিএফআইইউ প্রধান বলেন, আদালত দেউলিয়া ঘোষণার আদেশ দিলে যুক্তরাজ্যে শনাক্ত সম্পদ জব্দ ও বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে। একই প্রক্রিয়ায় অন্য দেশে থাকা সম্পদও উদ্ধারের পথ খুলতে পারে। উদ্ধার করা অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির বকেয়া ঋণ বা মর্টগেজ পরিশোধে ব্যবহৃত হবে এবং অবশিষ্ট অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোকে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ১০টি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ আদালতের আদেশে জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশে প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।
বিএফআইইউ প্রধান বলেন, সংস্থাটি ১১টি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ পাচারের মামলা নিয়ে কাজ করছে। এসব মামলায় অর্থের উৎস অনুসন্ধান, সম্পদের অবস্থান শনাক্ত, জব্দ এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আরও অনেক সন্দেহভাজন ব্যক্তির বিষয়ে বিভিন্ন তদন্ত সংস্থাকে আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া হয়েছে।
ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে পারস্পরিক আইনি সহায়তা (এমএলএ) ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে থাকা সন্দেহজনক সম্পদ উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর পক্ষে বিদেশে আইনি কার্যক্রম পরিচালনায় আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠানও নিয়োগ করা হয়েছে।
সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। চলতি মাসেই ঢাকার একটি আদালত তার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের সিঙ্গাপুরে থাকা স্থাবর সম্পদ জব্দ এবং ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করতে দেশটির কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি ও এনবিআরের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ টাস্কফোর্স তদন্ত করছে।
এছাড়া নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জার্সিভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫৩ লাখ পাউন্ডের সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব সম্পদ উদ্ধারে জার্সির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তার আওতায় যোগাযোগ করা হচ্ছে।
মোহাম্মদ মামুন বলেন, শুধু পাচার করা সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগই নয়, দেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ করতেও বিএফআইইউ নজরদারি বাড়িয়েছে। হুন্ডি, হাওলা, অনলাইন জুয়া ও বেটিং প্ল্যাটফর্ম এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি প্রবণতা দেখা যায়—অবৈধভাবে মূলধন দেশের বাইরে পাঠানো এবং বিদেশে অর্জিত অর্থ দেশে না এনে বিদেশেই রেখে দেওয়া। প্রবাসী কর্মীদের কাছ থেকে বিদেশি মুদ্রা সংগ্রহ করে দেশে তাদের পরিবারের কাছে সমপরিমাণ অর্থ অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও এর সঙ্গে যুক্ত।
বিএফআইইউ প্রধানের মতে, এসব অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের বিরুদ্ধে নজরদারি ও ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ আরও জোরদার হয়েছে এবং বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় পাঠানোর প্রবণতাও বাড়ছে। অর্থ পাচার প্রতিরোধে দেশে প্রয়োজনীয় নীতিমালা রয়েছে। এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে এসব নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ ও কঠোর বাস্তবায়ন। আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সন্দেহজনক সম্পদ শনাক্ত ও জব্দ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পদ উদ্ধারের ওপর বিএফআইইউ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
বিএফআইইউর এই কার্যক্রমের পাশাপাশি অর্থ পাচার ঠেকাতে আন্তঃসংস্থার সমন্বয়ও বাড়ানো হচ্ছে। বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার প্রতিরোধে বিএফআইইউ ইতোমধ্যে সরকারি সংস্থা ও ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি আন্তঃসংস্থা স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে ঝুঁকি চিহ্নিত করা, তথ্য বিনিময় বাড়ানো এবং সন্দেহজনক লেনদেনের তদন্ত আরও কার্যকর করা।
ফলে অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ-সম্পদ পুনরুদ্ধারে সরকারের উদ্যোগ এখন একই সঙ্গে দুই পথে এগোচ্ছে—একদিকে দেশের ভেতরে সম্পদ শনাক্ত ও জব্দের ব্যবস্থা, অন্যদিকে বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা ব্যবস্থার ব্যবহার।
বিএফআইইউ বলছে, এ সমন্বিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাচার করা সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম আরও গতিশীল করার চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)