অনন্যা
নারীদের ক্যারিয়ারের বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত : ফারনাজ আলম
রূপ বিশেষজ্ঞ ফারনাজ আলম কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো থেকে অ্যাসথেটিক (ত্বক) বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। কানাডায় থাকার সময় ম্যাক কসমেটিকসের সঙ্গে বেশ কিছুদিন কাজও করেছেন তিনি। সেখানে ডার্মাটোলজিতেও কোর্স করা আছে তাঁর। এরপর লন্ডনের নর্থ আম্বরিয়া ও মালয়েশিয়ার টেইলর্স থেকে আর্কিটেকচারের ওপর দুটি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। বর্তমানে ওমেন্স ওয়ার্ল্ডের পরিচালকের আসনে রয়েছেন। বিশ্বের ১০ হাজার প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে ল’রেল কন্টেস্টে ফাইনালিস্ট হয়েছেন ফারনাজ আলম। বর্তমানে ল’রেল প্যারিসের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে রয়েছেন তিনি। এতকিছুর মাঝেও নিজের যত্ন নিতে ভোলেন না তিনি। এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে নিজের ফ্যাশন ও ভালো লাগার কথা জানালেন এই সফল নারী।
প্রশ্ন : এই পেশা কেন বেছে নিলেন?
ফারনাজ আলম : ছোটবেলা থেকেই আম্মুকে দেখতাম এই ফিল্ডে কাজ করছেন। তখন থেকেই একটা আগ্রহ কাজ করত। আর আর্ট বা আঁকাআঁকি করা এগুলো খুবই পছন্দ ছিল আমার। যে কারণে আমি অ্যাসথেটিক (ত্বক) ও আর্কিটেকচার দুটো বিষয়েই পড়াশোনা করেছি। এরপর দেশে ফিরে ইচ্ছা হলো আম্মুর সঙ্গে কাজ করব, ক্রিয়েটিভ ফিল্ডে কাজ করব। এ কারণেই এই পেশায় আসা। আর হ্যাঁ, এর সঙ্গে ল’রেল অনেক বড় একটা সাপোর্ট ছিল আমার জন্য।
প্রশ্ন : এই পেশার সঙ্গে ফ্যাশনের কী সম্পর্ক আছে।
ফারনাজ আলম : ট্রেন্ড বলতে আমরা যা দেখছি সেটা এই ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি থেকেই তৈরি হচ্ছে, যেখানে আমরা কাজ করছি। সামার কালেকশন হোক, উইন্টার কালেকশন হোক সবই এখান থেকে তৈরি হচ্ছে। এখন দেখা যাচ্ছে হঠাৎ করেই ফ্লোরাল ডিজাইনটা বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। হয়তো কোনো ডিজাইনার অথবা কোনো আর্টিস্ট অথবা কোনো মেকআপ আর্টিস্টের ক্রিয়েশন এই থিমগুলো। তাই আমি বলব বিউটি সেক্টরের সঙ্গে ফ্যাশনের সম্পর্কটা বেশ গভীর।
প্রশ্ন : স্টাইল বা ফ্যাশন বলতে আপনি কী বোঝেন।
ফারনাজ আলম : যেটাতে আমি বেশ স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করব সেটাই আমার কাছে স্টাইল বা ফ্যাশন। যে পোশাকে আমাকে নিজেকে ভালো লাগবে সেটাই ফ্যাশন। এখন ভালো লাগা মানে অন্য কারো কাছে ভালো লাগতে হবে সেটা কিন্তু না। যেটাতে নিজের কাছে ভালো লাগবে, নিজেকে দেখে যেখন মনে হবে আমি নিজেকে কনফিডেন্টলি প্রেজেন্ট করতে পারব সেটাই স্টাইল।
প্রশ্ন : প্রতিটি মানুষের ফ্যাশন বিষয়ে গ্রুমিং থাকা কি প্রয়োজন?
ফারনাজ আলম : অবশ্যই জরুরি। কারণ করপোরেট জীবন হোক কিংবা ব্যক্তিগত জীবন হোক প্রতিনিয়তই আমার বাইরে যাচ্ছি। এ কারণে নিজেরকে ভালোভাবে উপস্থাপন করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি একটু গ্রুমিং না থাকে তাহলে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারব না। সেটা আমাদের আত্মবিশ্বাসকে নষ্ট করবে। মনে মনে চিন্তা করি, এটা আমাকে এটাতে মানাবে না, এটাতে ভালো লাগছে না। এ ধরনের নেতিবাচক চিন্তার কারণে আমরা অনেক কিছু করতে চেয়েও পারি না। তাই ইতিবাচক চিন্তার জন্য নিজের যত্ন নেওয়া ও নিজেকে ভালোবাসাটা খুবই জরুরি।
প্রশ্ন : পেশার ক্ষেত্রে আপনি কেমন পোশাক বেছে নেন?
ফারনাজ আলম : যখন কাজে থাকি তখন পশ্চিমা কিছু পরলে সব সময় ফরমাল পরার চেষ্টা করি। আর যখন দেশীয় কিছু পরতে চাই তখন সালোয়ার কামিজটাই পরি, কারণ শাড়ি ততটা সামলাতে পারি না। এ ছাড়া আমার ক্যাজুয়াল পোশাকও ভালো লাগে।
প্রশ্ন : ব্যক্তিগত জীবনে কোন ধরনের সাজ পোশাক আপনার ভালো লাগে?
ফারনাজ আলম : ক্যাজুয়াল পোশাক পরতে ভালো লাগে। টি-শার্ট, জিন্স, টপস পরতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এ ছাড়া সুতির লম্বা কামিজ পরতে ভালো লাগে। আসলে যে পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করি এবং যাতে আমাকে স্টাইলিশ লাগবে সেই পোশাকগুলোই পছন্দ করি।
প্রশ্ন : সেরা ফ্যাশন ডিজাইনার ও বিউটি এক্সপার্ট কে?
ফারনাজ আলম : শেনেলের ডিজাইনার কার্ল লেগারফেল্ডের ডিজাইন করা পোশাক আমার ভালো লাগে। একটা মেয়ের ভেতরে এলিগেন্ট ভাব থাকাটা জরুরি। কার্ল তার পোশাকের মাধ্যমে সেই এলিগেন্স ভাব ফুটিয়ে তুলতে পারে। তার পোশাক পরে স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়া যায় আবার সুপার স্টাইলিশও হওয়া যায়। আর বিউটি এক্সপার্ট বলতে আমার মা-ই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। তার কারণেই আমি এ পর্যন্ত এসেছি। ছোটবেলা থেকেই আম্মুর মেকআপ দেখেই আমি মেকআপ করা শিখেছি। এরপরে আমার ভালো লাগে ল'রিয়েলের হেড মেকআপ আর্টিস্ট করিম রহমানকে। ল'রিয়েল মেকআপ ইন্ডাস্ট্রির একটা লিডিং ব্র্যান্ড যেখানে আমরা প্রত্যেক বছরই দেখি নতুন নতুন প্রোডাক্ট আসছে। এই প্রডাক্টের ডিজাইনিং করিম রহমান নিজে করে। আমি তার কাজ অনেক পছন্দ করি। তার সঙ্গে কাজ করে আমি আমি অনেক মজা পাই। সে রং নিয়ে খেলতে ভালোবাসে। রঙের প্রতি আমার যে ভালোলাগা সেটা তার কারণেই।
প্রশ্ন : আপনজনের কারো কোনো ফ্যাশন ট্রেন্ড এখনো কি ফলো করেন?
ফারনাজ আলম : আমার মায়ের সিমপ্লিসিটিটা আমার অনেক ভালো লাগে। তিনি অনেক সাধারণভাবে সাজে। কিন্তু তিনি যখন হেঁটে চলে যান তখন তার ঘ্রাণ থেকে যায়। বোঝা যায় তিনি এখানে থেকে গেছেন। সেটা তার পারফিউম হোক, চলাফেরা হোক কিংবা পোশাক হোক। মায়ের এই বিষয়টা আমি খুবই অনুসরণ করি।
প্রশ্ন : কোন অনুষঙ্গটি আপনার বেশি ভালো লাগে?
ফারনাজ আলম : আমার অ্যাংক্লেট অনেক ভালো লাগে। পায়ে একসঙ্গে অনেকগুলো অ্যাংক্লেট পরি। এ ছাড়া দুই কানের ওপরের দিকে পিয়ার্সিং করা। সেখানে আলাদা আলাদা দুল পরতে ভালো লাগে।
প্রশ্ন : পোশাক না অনুষঙ্গ কোনটিকে বেশি প্রাধান্য দেন?
ফারনাজ আলম : প্রথমে আমি পোশাক বাছাই করি। এরপর পোশাক অনুযায়ী অনুষঙ্গ বেছে নেই।
প্রশ্ন : কোন রঙের পোশাক পরতে বেশি ভালো লাগে?
ফারনাজ আলম : কালো। যেকোনো জায়গায় আমি কালো রঙের পোশাক পরতে পছন্দ করি।
প্রশ্ন : পার্লারে গিয়ে না বাসায় পরিচর্যা- কোনটিকে প্রাধান্য দেন?
ফারনাজ আলম : অবশ্যই পার্লারে। কারণ পার্লারের যত্নটা আমাদের জন্য জরুরি। আর প্রতি মুহূর্তেই নতুন নতুন টেকনোলোজি আসছে। সেগুলো বাসায় তো নিয়ে আসা সম্ভব না। এ ক্ষেত্রে পার্লারে যেতেই হবে।
প্রশ্ন : প্রতিটি নারীর কোন বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত?
ফারনাজ আলম : নারীদের ক্যারিয়ারের বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত। বিয়ের পর, বাচ্চা হওয়ার পর নারীরা ভুলে যায় ছোটবেলাও তারা কিছু হতে চেয়েছিল। কোনো স্বপ্ন দেখেছিল। আমাদের একটা পরিবার থাকবেই। আমরা তাদের যত্নও নেব। এর মানে এই নয় যে আমরা নিজেদের ভুলে যাব। যেন ১০ বছর পর মনে না হয় আমি তো জীবনে কিছুই করিনি।
প্রশ্ন : চাকরিজীবী নারী বা কোনো পেশায় জড়িত থাকা নারীদের কি বাড়তি যত্ন নেওয়া জরুরি?
ফারনাজ আলম : বাড়তি যত্ন সবার জন্যই জরুরি। তবে যাঁরা বাইরে কাজ করেন, তাঁদের রোদের কারণে ত্বকের ক্ষতি হয়, ধুলাবালি বেশি লাগে, ব্লাকহেড ও হোয়াইটহেড হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। এ জন্য স্ক্রাবিং করা খুবই জরুরি। যাঁরা বাইরে কাজ করেন, তাঁদের সপ্তাহে অন্তত দুদিন স্ক্রাবিং করা জরুরি। আবার যাঁদের ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক তাঁরা এর সঙ্গে সামান্য মধু মিশিয়ে নিতে পারে। আর যাঁদের ত্বক অতিরিক্ত তৈলাক্ত তাঁরা স্ক্রাবিংয়ের পর অ্যাসট্রেনজেন ব্যবহার করতে পারেন। নিজের ত্বক ভালো রাখতে চাইলে নিজেরই যত্ন নিতে হবে। যেহেতু আমরা সব জায়গায় যাচ্ছি, মানুষের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি তাই চাকরিজীবী নারীদের একটু বাড়তি যত্ন নিতেই হবে।
প্রশ্ন : নিজেকে ফিট রাখতে কী করেন?
ফারনাজ আলম : আমি ব্যায়াম কম করি। তবে খাওয়া খুবই মেনে চলি। অনেক ফল খাওয়ার চেষ্টা করি। তিনবেলা খাওয়ার চেষ্টা করি। আর রাতে আমি কখনোই ভাত খাই না। আমি মাসে চারদিন দুপুরে ভাত খাই। ভাতের পরিবর্তে প্রচুর সবজি খাই। আর যখন খুব বেশি ক্ষুধা লাগে, তখন চিঁড়া খাই। কারণ চিঁড়া ফ্যাট ফ্রি এবং খেলে ভাতের চাহিদাও পূরণ হয়।
ছবি : সালেক বিন তাহের

জান্নাতুল এ্যানি