একই বিছানায় ঘুমান, তবু মনে ভালোবাসা নেই! কেন বাড়ছে ‘ইমোশনাল ডিভোর্স’?
একই ছাদের নিচে বসবাস, একসঙ্গে খাওয়া, সংসারের দায়িত্ব পালন। বাইরে থেকে সবই স্বাভাবিক। কিন্তু একে অপরের সঙ্গে মনের কথা বলার আগ্রহ নেই, নেই আবেগ কিংবা ঘনিষ্ঠতা। সঙ্গীর পাশে থেকেও অনুভব করেন একাকিত্ব। ঝগড়া নেই, বিচ্ছেদও হয়নি, অথচ সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসার উষ্ণতা হারিয়ে গেছে। দাম্পত্যের এমন অবস্থাকে বলা হয় ‘ইমোশনাল ডিভোর্স’ বা আবেগিক বিচ্ছেদ।
আইনি বিচ্ছেদ ছাড়াই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক রোগনির্ণয় নয়, বরং দাম্পত্যে আবেগ, যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা হারানোর একটি বর্ণনা। ২০২৩ সালে ‘বিএমসি সাইকোলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় আবেগিক বিচ্ছেদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব, দাম্পত্যে অসন্তুষ্টি, ঘনিষ্ঠতা কমে যাওয়া এবং সঙ্গীর অনুভূতির প্রতি উদাসীনতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কীভাবে তৈরি হয় আবেগিক বিচ্ছেদ?
এমন দূরত্ব সাধারণত একদিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিনের অভিমান, অবহেলা, অসম্মান, বিশ্বাসের সংকট কিংবা অমীমাংসিত বিরোধ ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে দেয়। প্রথম দিকে একজন হয়তো নিজের কষ্টের কথা জানান, সমাধান চান। কিন্তু বারবার উপেক্ষিত হলে একসময় কথা বলার চেষ্টাই ছেড়ে দেন। অভিযোগ কমে যায়, তবে সমস্যার সমাধান হয় না। দুজনের মধ্যে তৈরি হয় নীরব দূরত্ব।
‘বিএমসি সাইকোলজি’র গবেষণায় আবেগিক বিচ্ছেদের সঙ্গে অনুভূতি প্রকাশ ও বোঝার অসুবিধার সম্পর্ক পাওয়া যায়। সৌদি আরবের ৩০৫ জন বিবাহিত নারীকে নিয়ে করা ওই গবেষণায় ৭৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে মাঝারি থেকে গুরুতর আবেগিক বিচ্ছেদের লক্ষণ দেখা যায়। তবে এটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর করা গবেষণা, তাই এই হার সব দেশের দম্পতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
সম্পর্কে দূরত্ব তৈরির পেছনে থাকতে পারে কর্মব্যস্ততা, অর্থনৈতিক চাপ, সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব, অসম প্রত্যাশা কিংবা ঘনিষ্ঠতার অভাবও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারের প্রভাবও আলোচনায় আসে।
২০২৪ সালে ‘বিএমসি সাইকিয়াট্রি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত তেহরানের ৪০০ বিবাহিত নারীর ওপর করা গবেষণায় ইন্টারনেট আসক্তি ও পারিবারিক সহিংসতার সঙ্গে আবেগিক বিচ্ছেদের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়। গবেষণাটি অবশ্য এসব বিষয়কে সরাসরি বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে প্রমাণ করে না।
মানসিক স্বাস্থ্যে কী প্রভাব পড়ে?
আবেগিক বিচ্ছেদ শুধু দাম্পত্য সম্পর্কেই প্রভাব ফেলে না, মানসিক সুস্থতার সঙ্গেও এর যোগসূত্র রয়েছে। ২০২৩ সালে ‘পিএলওএস ওয়ান’ সাময়িকীতে প্রকাশিত সৌদি আরবের ২৪১ জন বিবাহিত নারীর গবেষণায় আবেগিক বিচ্ছেদের সঙ্গে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও একাকিত্বের সম্পর্ক পাওয়া যায়। আবেগিক বিচ্ছেদের মাত্রা বেশি এমন অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এসব সমস্যার মাত্রাও তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে গবেষণাটি সম্পর্কের কারণ ও ফলাফল নিশ্চিত করে না।
সম্পর্ক কি আবার আগের জায়গায় ফিরতে পারে?
দাম্পত্যে দূরত্ব তৈরি হলে প্রথম প্রয়োজন সমস্যাটি স্বীকার করা। সঙ্গীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, নিজের অনুভূতি স্পষ্টভাবে জানানো, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং জমে থাকা অভিমান নিয়ে খোলামেলা আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে দম্পতি কাউন্সেলিংয়ের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
তবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব একা একজনের নয়। দুজনেরই আন্তরিকতা, সম্মান ও পরিবর্তনের ইচ্ছা প্রয়োজন। আর সম্পর্কে নির্যাতন বা নিরাপত্তাহীনতা থাকলে সবার আগে নিজের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ, একই ছাদের নিচে থাকা মানেই মানসিকভাবে একসঙ্গে থাকা নয়। কখনো কখনো বিচ্ছেদের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অনেক আগেই দুজন মানুষের মধ্যে আবেগিক বিচ্ছেদ ঘটে যায়।

ফিচার ডেস্ক