ভালোবাসার ইতিবৃত্ত
ফেব্রুয়ারি মানেই ভালোবাসা। আর বাংলাদেশের ঐতিহ্যে এর গোড়াপত্তন ১৯৫২ সাল থেকেই। যাঁদের জন্য আজ বাংলা ভাষায় লিখছি, পড়ছি, বলছি, তাঁদের ত্যাগ কি শুধুই মর্যাদা বা সম্মানের? তাঁদের জন্য আছে আমাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ। তাঁদের তরুণ প্রজন্ম বক্ষে ধারণ করে আছে। এই আন্তর্জাতিক দিবসের সঙ্গে পুরো ফেব্রুয়ারিজুড়েই আছে আরো কিছু দিবস। আছে আলোচনা, সমালোচনা। সে যাই থাক, দিবসের গোড়াপত্তন জানা উচিত সবার। আমাদের অহংকারের দিবসের পরে আরো একটি দিবস আছে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বেশ ভালোভাবেই উদযাপিত হয়ে আসছে। দিনকে দিন জনপ্রিয় হচ্ছে আমাদের দেশেও। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, কোনোভাবেই ভুলে গেলে চলবে না। আসুন ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস সম্পর্কে একটি আলোচনা করি।
এটা সত্যি যে ভ্যালেন্টাইন ডের ইতিহাস কিছুতা হলেও অস্পষ্ট। তবে, এই ইতিহাস পুনরায় নির্ধারিত হয়েয়ে কিছু উপকথার ভিত্তিতে। আজ আমরা যে দিবসটি পালন করছি সেটার আবির্ভাব হয়েছে প্রাচীন রোম সভ্যতা থেকে। কিছুতা অবাক হওয়ার মতোই তথ্য, নিরাপদ উর্বরতার জন্য এই মাসেই তখনকার সময়ে একটি অনুষ্ঠান পালন করা হতো। পরবর্তীকালে, পোপ গেলাসিয়াস-১ এই পৌত্তলিক অনুষ্ঠানের কিছুটা পরিবর্তন আনেন এবং নামকরণ করেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ডে।
কিন্তু কোন ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’কে সম্মান প্রদর্শন করতে এই নাম করন করা হয়েছে, সেটা কিছুটা অনিশ্চয়তার মাঝেই রয়ে গেছে।
সেন্ট ভ্যালেন্টাইন-এর রহস্য জানতে ক্যাথলিক এনসাইক্লোপিডিয়া অনুযায়ী তিনজন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন-এর নাম পাওয়া যায়। প্রথমজন রোমের পুরোহিত, দ্বিতীয়জন ইতালির টারমি শহরের খ্রিস্টান পাদ্রীদের জ্যেষ্ঠ সদস্য এবং তৃতীয়জন সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি, শুধু জানা গেছে তার শেষ কর্ম আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ঘটনাটি
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এই তিনজন সেন্ট ভ্যালেন্টাইনই ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখ মারা গিয়েছিল। তবে বেশির ভাগ ইতিহাসবিদ মনে করেন, প্রথমজন অর্থাৎ রোমের পুরোহিতের নামানুসারেই ভ্যালেন্টাইন ডে নাম হয়। তিনি রোম সম্রাট ক্লাডিয়াস-২-এর কিছুটা অপছন্দের ছিলেন। আর এই পর্যন্তই বাস্তবিক ঘটনা হিসেবে জানা যায়, পরবর্তী তথ্য পুরোটাই পৌরাণিক।
পৌরাণিক ঘটনার দুটি প্রমাণ পাওয়া যায়।
প্রথমত, রোম সম্রাট তরুণদের বিয়ে প্রথা রহিত করেন আর তাদের সৈনিক হিসেবে যোগদানে অনুপ্রেরণা দেন। কিন্তু সেন্ট ভ্যালেন্টাইন পালিয়ে বিয়ে করলেন ও ধরা পড়ে গেলেন, ফলাফল মৃত্যু।
দ্বিতীয়ত, ক্লাডিয়াস, সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে কারাগারে পাঠান। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন জেলারের মেয়ের প্রেমে পড়ে যান। মৃত্যুদণ্ডের আগে চিঠিও লিখে ফেলেন তাকে। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন সম্পর্কে সবচেয়ে সত্যি যে তথ্য মনে করা হয়, তিনি আবেগী ভালোবাসায় বিশ্বাসী ছিলেন না, ছিলেন খ্রিস্টীয় প্রেমে। নিজের ধর্ম পরিবর্তন করতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে মেরে ফেলা হয়। তবে ১৯৬৯-এর দিকে পঞ্জিকায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয় এই প্রশ্নবিদ্ধ কারণকে পরিহার করতে।
তবে ১৩৮১ সালে ইংরেজ কবি জিওফ্রে ছসার, ইংল্যান্ডের রাজা (১৩৭৭–৯৯) রিচার্ড-২ (১৩৬৭–১৪০০) ও রোমান সম্রাট চার্লস চতুর্থ মেয়ে বোহেমিয়ার অ্যান-এর বাগদানকে সম্মান দেখিয়ে একটি কবিতা রচনা করেন। এই ইংরেজ কবি রাজকীয় বাগদান ও ভ্যালেন্টাইন ডের মাঝে সংযুক্তি স্থাপন করেন।
১৮ শতাব্দীর দিকে ভ্যালেন্টাইন ডে-তে ইংল্যান্ডজুড়ে উপহার আদান-প্রদান ও হাতে তৈরি কার্ড বিনিময় ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শুধু কি তাই? আমেরিকান বসতিতেও এই দিনে ছড়িয়ে পড়ে, হৃদয় আকৃতির কার্ড যা কিনা লেস, ফিতা ইত্যাদি জিনিস দিয়ে তৈরি। তবে ১৯৫০ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রে এই দিবস প্রচলিত ছিল না। বর্তমান যুগে এই দিনটি বাণিজ্যিকভাবে সার্থক।
আমাদের দেশে তরুণ প্রজন্ম এই দিনটিকে ঘিরে বেশি উৎসাহী। অবশ্য সমালোচনা আছে, সব প্রজন্মের লোকের ভেতরেই। সেটা অবশ্য সবার ব্যক্তিগত বিষয়। ভালোবাসার মানুষকে একদিন বেশি করে ভালোবাসতে দোষ থাকুক বা নাই থাকুক, তবে দেশের ইতিহাস ভুলতে বসলে অবশ্যই দোষ আছে। বহির্বিশ্বের দিবসকে গ্রহণ করতে গিয়ে কখনই যেন আমাদের নিজেদের ঐতিহ্যের দিবসগুলো পালনে ভাটা না পড়ে যায়। ১৪ ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে তারুণ্যের ছোঁয়া যেভাবে লাগে, ২১ ফেব্রুয়ারিও যেন সেভাবেই লাগে—এটাই কাম্য।
লেখক : প্রকৌশলী

তাওহীদ হাসান