সরকারের মন্ত্রী, শ্রমিকের মন্ত্রী!
দেশব্যাপী দুদিনের পরিবহন ধর্মঘটের কারণে আলোচনায় এসেছেন মন্ত্রী শাজাহান খান। ধর্মঘট হয়েছে সড়ক পরিবহনে। তবে তিনি সড়ক পরিবহনমন্ত্রী নন, তিনি নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। স্বাভাবিকভাবেই ধর্মঘট ও এ সম্পর্কিত আলোচনায় তাঁর নাম উঠে আসার কথা ছিল না। তবু তিনি ছিলেন আলোচনায়, এবং স্পষ্ট করে বললে মূল আলোচনায়। কারণ, তিনি এ ক্ষেত্রে যতটা না ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী, তার চেয়ে বেশি ছিলেন শ্রমিক নেতা ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি।
যে কারণে এ পরিবহন ধর্মঘট ও জনদুর্ভোগ, তার পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, এর মূল কারণ আদালতের রায়। আদালতের সাক্ষ্যপ্রমাণভিত্তিক দুই রায়ের একটিতে দুই পরিবহন শ্রমিককে যাবজ্জীবন দণ্ড এবং অন্য এক মামলায় এক ট্রাকচালককে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ডাদেশ। দুই মামলার প্রথমটিতে নিহত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ আরও তিনজন। এবং অপর মামলায় ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে এক ট্রাকচালক হুমকি দিয়ে এক নারীকে চাকায় পিষে হত্যা হরে। দুই মামলায়ই আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে রায় দিয়েছেন, এবং এ রায়গুলোই সর্বশেষ রায় নয়। কারণ, বিচারিক পর্যায়ের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে তবে আসত চূড়ান্ত রায়।
সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলার রায়ের পর উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় আট দিনের ধর্মঘট শেষে যখন সাভারের নারী খোদেজা বেগম হত্যার রায় ঘোষণা দেন আদালত, তখন কোনোরূপ পূর্বঘোষণা ছাড়াই দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘট ডাকে। এর ফলে কার্যত অচল হয়ে পড়ে দেশ। পরিবহন শ্রমিকদের পিকেটিং, রাস্তায় রাস্তায় যাত্রী হয়রানি, দুর্ব্যবহারে প্রথম দিনেই অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে দেশের মানুষ। তার ওপর নৌপরিবহনমন্ত্রী ও শ্রমিক সংগঠনের নেতা শাজাহান খান পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, এটা ধর্মঘট নয়, কর্মবিরতি। মন্ত্রী উল্টো উদাহরণ দিয়ে বলেন, আপনারা (সাংবাদিক) যেভাবে খাতা-কলম সঙ্গে নিয়ে শাহবাগে বসে পড়ে কর্মবিরতি পালন করেন, ঠিক সেভাবেই এ কর্মবিরতি।
মন্ত্রীর এমন বক্তব্য দেশের একাধিক মিডিয়ায় এসেছে। পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হয় না, এটা যতটা না একজন মন্ত্রীর বক্তব্য, তার চেয়ে বেশি ছিল এক শ্রমিক নেতার বক্তব্য।
প্রথম দিন পরিবহন শ্রমিকদের আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে নেওয়া পরিবহন ধর্মঘটের দিন পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন জায়গার কোথাও কোনো পুলিশ সদস্য দেখা যায়নি। যেন শ্রমিকদের তাণ্ডব চালানোর সুযোগ করে দেওয়া। এরই মাঝে সারা দিনের তাণ্ডব ও যাত্রী হয়রানির পর রাজধানীতে পুলিশ বক্সেও হামলা চালায় পরিবহন শ্রমিকরা। এরপর দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই অ্যাকশনে যায় প্রশাসন। গাবতলীতে পরিবহন শ্রমিক ও পুলিশ-র্যাবের সংঘর্ষে এক পরিবহন শ্রমিক নিহত হয়, আহত হয় আরো কয়েকজন।
দ্বিতীয় দিনের পুলিশের অ্যাকশনের বাইরে সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শাজাহান খানসহ শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে আরো ছিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গাসহ আওয়ামী লীগ সমর্থক পর্যায়ের পরিবহন নেতারা। এর পর শাজাহান খান তাঁদের মতিঝিলের কার্যালয়ে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। শ্রমিক নেতা ও মন্ত্রী শাজাহান খান শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার নির্দেশনা দেন, অথচ ঠিক একদিন আগে তিনি ওই শ্রমিকদের সংক্ষুব্ধ পক্ষ হিসেবে দাবি করে বলেছিলেন, তারা নাকি কর্মবিরতিতে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, আগের দিন যারা ছিল সংক্ষুব্ধ পক্ষ, পরের দিন তারা কীভাবে মন্ত্রীর অনুগত হয়ে যায়?
নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের সাফাই বক্তব্যের মধ্যে আরো আছে, ‘ফাঁসির ভয় মাথায় রেখে ড্রাইভাররা গাড়ি চালাবে কীভাবে?’ এতে করে তিনি যে সড়কে মানুষ হত্যার লাইসেন্স চান, সেটা পরিষ্কার। আমাদের অতীত বলে, সড়কে মৃত্যু হলে কেউ কোনো দিন বিচারের মুখোমুখি হয় না, শাস্তি তো দূরের কথা। তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীরের নিহত হওয়ার ঘটনায় বিচারের রায় আমাদের জন্য যেখানে ছিল উজ্জীবিত হওয়ার বিষয়, সেখানে সরকারের একজন পূর্ণমন্ত্রী সরাসরি মানুষ হত্যার অপ্রকাশ্য লাইসেন্স চেয়ে বসেন; এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না।
তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের নিহত হওয়ার ঘটনার মামলার রায়ের বাইরেও দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘট যে কারণে হয়েছে, সে ইতিহাস অনেকেই জানে না। ১ মার্চ সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) খোন্দকার আবদুল মান্নান ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘২০০৩ সালের ২০ জুন সাভারের ঝাউচার এলাকায় ট্রাকচাপায় খোদেজা বেগমের (৩৮) নিহত হওয়ার ঘটিনাটি ছিল পরিকল্পিত। মৃত্যুদণ্ড হওয়া ট্রাকচালক মীর হোসেনের বাড়ি এবং নিহতের বাড়ি একই এলাকায়। ঘটনার দিন নিহতের বাড়ির সামনের পারিবারিক রাস্তা দিয়ে ট্রাকে করে মাটি নিয়ে যাচ্ছিলেন ট্রাকচালক মীর হোসেন। বেলা ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে ট্রাকের সামনে এসে দাঁড়ান খোদেজা এবং তাঁর স্বামী নুরু গাজী। ওই সময় তাঁরা তাদের পারিবারিক রাস্তা দিয়ে মাটিভর্তি ট্রাক চলাচলে বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাকচালক মীর হোসেন তাদের ওপর দিয়ে ট্রাক চালিয়ে দেন। এতে ঘটনাস্থলেই খোদেজার মৃত্যু হয়। স্বামী লাফ দিয়ে সরে গিয়ে প্রাণে বেঁচে যান।’ এটা কোনো দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ছিল না, ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেন এ আইনজীবী।
সরকারি কৌঁসুলির বক্তব্যে পরিষ্কার, এটা ছিল ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড। ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বাস-ট্রাক চালাতে গিয়ে রাস্তায় হয়নি। মীর হোসেন মীরু কেবল পরিবহন শ্রমিক বলে যেকোনো জায়গা থেকে যে কাউকে হত্যা করার অধিকার নিশ্চয়ই রাখেন না। আর এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের বিরুদ্ধে নেওয়া শ্রমিকদের উসকে দেওয়া, সহযোগিতা করাও নিশ্চয়ই একজন শ্রমিকনেতার কাজ হতে পারে না। আর তিনি যদি মন্ত্রী হয়ে থাকেন, তাহলে কেবল প্রশ্নই করা যায়—এও কি সম্ভব?
কবির য়াহমদ : কবি ও সংবাদকর্মী।

কবির য়াহমদ