নগর ভাবনা
হাতিরঝিলের ক্যানসার আরো তিন বছর!
উন্মুক্ত স্থান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০-এর পঞ্চম ধারায় বলা হয়েছে, ‘খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন করা যাইবে না বা উক্তরূপ জায়গা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করা যাইবে না বা অনুরূপ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা যাইবে না।’
কিন্তু বাংলাদেশে জনসাধারণের জন্য তৈরি করা এমন আইনসমূহ বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে এসবের মান্যতা দেখা যায় যায় খুব কমই। গেল ১৯ বছর এ আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ভবন। বিদ্যমান সব আইনকে পাশ কাটিয়ে ভবনটি প্রাকৃতিক জলাধার হাতিরঝিলের হৃদয় চিড়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। যে ভবনটি নির্মাণে প্রচ্ছন্নভাবে জড়িয়ে গিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে আইনি লড়াই শেষে চূড়ান্তভাবে এ ভবনের কর্তৃপক্ষকে আইন মানতে বাধ্য করতে পেরেছেন আদালত।
বিজিএমইএ ভবন অবিলম্বে ভেঙে ফেলতে সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে (রিভিউ) করা আবেদন খারিজ হয়েছে। ফলে বিজিএমইএ ভবন ভাঙতে হবে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের তিন সদস্যের বেঞ্চ ৫ মার্চ রোববার এই রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে তা খারিজ করেন। বিজিএমইএ অন্যত্র সরাতে কত দিন সময় লাগবে, তা জানিয়ে বৃহস্পতিবারের মধ্যে একটি আবেদন দিতে বলেছেন আদালত। ওই দিন আদালত পরবর্তী আদেশ দেবেন।
এর আগে গত বছর রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলের পূর্ব পাশে অবস্থিত পোশাকশিল্প প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ১৬ তলা ভবনটি অবিলম্বে সংগঠনের নিজ খরচায় ভেঙে ফেলতে রায় দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ আদালত।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৯৮ সালে বিজিএমইএ তাদের প্রধান কার্যালয় ভবন নির্মাণের জন্য সোনারগাঁও হোটেলের পাশে বেগুনবাড়ী খালপাড়ের এ জায়গা নির্ধারণ করে এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কাছ থেকে পাঁচ কোটি ১৭ লাখ টাকায় জমিটি কেনে। সে সময় বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের অভিযোগ ছিল, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না নিয়ে এবং উন্মুক্ত স্থান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০ ভঙ্গ করে বেগুনবাড়ী খালের একাংশ ভরাট করার মাধ্যমে ওই ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। এমনকি ভবনটি নির্মাণের সময় অনুমোদিত নকশাও অনুসরণ করা হয়নি বলে জানিয়েছিল রাজউক। এই অবৈধ ভবন উচ্ছেদের দাবিতে বিভিন্ন নাগরিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের সদস্যরা আন্দোলন, মিছিল-সমাবেশসহ বেশ কয়েকবার প্রধানমন্ত্রী বরাবর খোলা চিঠিও দেন।
এ বিষয়ে একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদন নজরে আনা হলে ২০১০ সালের ৩ অক্টোবর উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল দেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল বিজিএমইএ ভবন অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন উচ্চ আদালত।
ভবনটি নিয়ে ১৯ বছর ধরেই নানামুখী বিতর্ক চলে আসছে। প্রায় দুই দশক আগে নির্মিত বিজিএমইএ ভবনকে সৌন্দর্যমণ্ডিত হাতিরঝিল প্রকল্পে ‘একটি ক্যানসার’ বলেছিলেন উচ্চ আদালত।
ভবনটির মোট এলাকা বা স্পেস দুই লাখ ৬৬ হাজার বর্গফুট। ভবনের ওপরের দুটি ফ্লোর নিয়ে বিলাসবহুল ‘অ্যাপারেল ক্লাব’ করেছে বিজিএমইএ। সেখানে সংগঠনের সদস্যদের জন্য সুইমিং পুল, ব্যায়ামাগার, রেস্টুরেন্ট, সভাকক্ষ ইত্যাদি সুবিধা রয়েছে। সব মিলিয়ে পুরো ভবনটি প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বলে দাবি করছে বিজিএমইএ।
তাহলে বিজ্ঞ আদালতের পর্যবেক্ষণ মতো ‘ক্যানসারে’র ডালপালা কতটা বিস্তৃত, এ পরিসংখ্যান থেকে তার একটি সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু বিজিএমইএর নেতারা ‘ক্যানসারে’র পক্ষে বছরের পর বছর আইনি লড়াই চালিয়ে গেলেও দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় ভবনটির বিকল্প নির্মাণ পরিকল্পনা এখনো সম্পন্ন করতে পারেনি। তাদের এই অদূরদর্শিতা তৈরি পোশাক বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু তার দায়ভার নিশ্চিতই বর্তাবে এখানকার কর্তাব্যক্তিদের ওপরেই। কারণ তাদের জানা উচিত ছিল, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলে এই ভবনের প্রতি প্রেম বা দরদ থাকা চলে না। অবৈধ ভবন দিয়ে আর যা-ই হোক, সৎ বাণিজ্যের আশা করা পুরোদস্তুর অর্বাচীনতা। অন্য একটি ভবন প্রতিস্থাপিত না হওয়ার আগে আদালতের আদেশ মানতে গেলে ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত পড়বে, তা জানা কথা। অথচ আমরা বরাবর এই ভবন নিয়ে বিজিএমইএ নেতাদের মধ্যে এক ধরনের খামখেয়ালিপনা বা টালবাহানা পরিলক্ষিত হতে দেখেছি। এখনকার ভবনটি দুই বিঘা জমির ওপর হলেও তাঁরা এখন চাইছেন ১০ বিঘা। কিন্তু ঢাকা শহরের মতো অধিক জনসংখ্যার শহরে একচিলতে জমি খুঁজতে যেখানে গলদঘর্ম হতে হয়, সেখানে তাদের এই অতিরিক্ত দাবিটা নতুন বিজিএমইএ ভবন নির্মাণকে থমকে দেওয়া ছাড়া আর কিছু কি দিতে পারবে?
রোববার রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান গণমধ্যমকে বলেছেন, ‘আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা ভবন ছেড়ে দেব। এ জন্য মহামান্য আদালতের কাছে তিন বছর সময় চাইব। বিজিএমইএর কার্যালয়টি এত বড় যে দুদিনের জন্য অন্য জায়গায় নেওয়া যাবে না। সে জন্য যদি সময় না দেওয়া হয়, তাহলে ভাবমূর্তির সংকট হবে। পোশাক রপ্তানির ব্যবসা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
তাই যদি হয়, দেশের ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে, দুই দিনে ভবনটি সরানো যাবে না, ব্যবসা মার খাবে; তাহলে এই নেতৃবৃন্দরা এত দিন কোথায় ছিলেন? ভবনটি নিয়ে তো প্রায় দুই দশক ধরেই কথা উঠছে। আদালত চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর আগেই কি তাদের বোধোদয় হওয়া উচিত ছিল না?
আদালতের রায়ের পর আরো তিন বছর সময় হাতিরঝিলকে ক্যানসার বয়ে বেড়ানোর দাবি করছেন বিজিএমইএ নেতারা। কিন্তু এখনো এমন দাবি করে যাওয়াটা কি সামান্যতম ভব্যতার মধ্যে পড়ে? নেতারা কি বুঝবেন না যে, তাঁরা দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে হেরে গেছেন? এখন দ্রুত হাতিরঝিলের ক্যানসার অপসারণ করে ওই জলাধারকে তার নিষ্কণ্টক জায়গা ফিরিয়ে দেওয়ার মোক্ষম সময়। বিক্ষত হাতিরঝিলের কাছে আবার কেন নতুন আবদার; নতুন বাহানা?
২০১৩ সালের ১৯ মার্চ প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে উচ্চ আদালত বলেছিলেন, ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসেবে বিজিএমইএর আইনের প্রতি আরো বেশি শ্রদ্ধাশীল হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। তারা তা না করে আইনকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে।’
আমরা বলব, আর কোনো বাহানা নয়, অবিলম্বে রাজধানী ঢাকার বোঝা এই ভবনকে উচ্ছেদ করা হোক। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য না করে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুক বিজিএমইএ। আর ভবিষ্যৎ নিধিরা এমন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া কিংবা উদ্বোধনের আগেই জেনে পূর্বাপর ভেবে নিন; কাজের পরে নয়! হাতিরঝিল তথা দেশের সব জলাধার হোক সত্যিকার অর্থেই সৌন্দর্যমণ্ডিত ও নিষ্কলুষ।
লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন।

ফারদিন ফেরদৌস