অভিমত
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গুরুত্ব ও ডুবোজাহাজ
১২ মার্চ (২০১৭) বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে সংযোজিত হয়েছে দুটি আধুনিক ডুবোজাহাজ বা সাবমেরিন, নাম ‘নবযাত্রা’ ও ‘জয়যাত্রা’। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী একটি ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। কমিশনিং অনুষ্ঠানে সাবমেরিন যুগে প্রবেশের ঘটনাকে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও আমাদের নৌবাহিনীর সাবমেরিন ছিল না। অত্যাধুনিক এই সাবমেরিন যুদ্ধজাহাজ আমাদের নৌবাহিনীর সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়েছে। আক্ষরিকভাবেই এখন বাংলাদেশ নৌবাহিনী ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তিনি আরো বলেন, বিশ্বের মাত্র গুটিকতক দেশ সাবমেরিন পরিচালনা করে থাকে। সেই তালিকায় আজ বাংলাদেশের নাম স্থান পাবে। এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার।’
সাবমেরিন দুটির কমিশনিংয়ের সময় প্রধানমন্ত্রী ‘বিএনএস শেখ হাসিনা’ ঘাঁটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, যা হবে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সাবমেরিন ঘাঁটি। চীন থেকে সংগৃহীত সাবমেরিন দুটি কনভেনশনাল ডিজেল-ইলেকট্রিক ধরনের সাবমেরিন, যার প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৭৬ মিটার ও প্রস্থ ৭ দশমিক ৬ মিটার। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১৭ নটিক্যাল মাইল এবং ডিসপ্লেসমেন্ট এক হাজার ৬০৯ টন। টর্পেডো ও মাইনসজ্জিত এই সাবমেরিন দুটি শত্রুজাহাজ ও সাবমেরিনে আক্রমণ করতে সক্ষম। উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় ভারত থেকে সংগৃহীত ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’ নামে দুটি প্যাট্রল ক্রাফট নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কার্যক্রম শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে ঈশা খাঁকে প্রথম ‘নেভাল এনসাইন’ দিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় জলসীমার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালনের জন্য ২০১৬ সালে নৌবাহিনী স্বাধীনতা পদক পেয়েছে।
২.
‘শান্তিতে সংগ্রামে সমুদ্রে দুর্জয়’—এই মহিমান্বিত বাণীর ধারক-বাহক নৌবাহিনীকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো শক্তিশালী দেখতে চান। সাবমেরিনের আগে এরই মধ্যে নৌবহরে যুক্ত হয়েছে আরো নতুন তিনটি যুদ্ধজাহাজ। প্রথমবারের মতো এসেছে দুটি সাবমেরিন। এ ছাড়া সরকারের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় হাতে নেওয়া হয়েছে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ কার্যক্রম। নৌবাহিনীকে আরো আধুনিকায়নের লক্ষ্যে চীনে নতুন দুটি করভেট নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ জন্য গত বছর (২০১৬) ২০ মার্চ নতুন তিনটি যুদ্ধজাহাজ কমিশনিংয়ের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বিশাল সমুদ্রসম্পদ রক্ষা করবে নৌবাহিনী। তাঁর মতে, ভৌগোলিক অবস্থানগত ও কৌশলগত কারণে বাংলাদেশের জলসীমা ও তার সম্পদ রক্ষায় নৌবাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তা বিধান নৌবাহিনীর একটি অন্যতম কাজ। কারণ, আমাদের রয়েছে ৭১০ কিলোমিটার উপকূল এলাকা, যেখানে প্রায় তিন কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহের জন্য সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। বহির্বিশ্বের সঙ্গে দেশের বাণিজ্যের ৯০ ভাগের বেশি সমুদ্রপথেই পরিচালিত হয়ে থাকে। আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমুদ্র এলাকার উন্নয়ন ও নিরাপত্তা বিধান করা অপরিহার্য।
অর্থাৎ মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বিরোধ মীমাংসার পর বঙ্গোপসাগরে সুবিশাল অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে সমুদ্র নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ এলাকায় অবাধে মাছ শিকার ও অন্যান্য সম্পদ আহরণ করা যাচ্ছে। ওশানগ্রাফি ও ব্লু ইকোনমির ওপর কাজ শুরু হয়েছে। সাগরে আমাদের এখন ৬০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য। দুই হাজার ৬০০ বিদেশি জাহাজ আসে বন্দরে, সেখানে আমাদের জাহাজ মাত্র ৬৯। এ জন্য কোস্টাল শিপিং চালু হয়েছে। সমুদ্রকে ঘিরে কর্মসংস্থানের বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সমুদ্রের সম্পদ লুণ্ঠনে অন্যরা শ্যেনদৃষ্টি ফেলছে, জলদস্যুরা টার্গেট নিয়ে আছে। প্রয়োজন একটি বহুবিধ ক্ষমতাসম্পন্ন ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনীর। একদিকে তার থাকবে ভাসমান যুদ্ধজাহাজের বড় নৌবহর, অন্যদিকে থাকবে গভীর সমুদ্রের তলদেশে সাবমেরিনের ক্লাস্টার। আরো থাকবে নৌ অভিযানকে অন্তরঙ্গভাবে সহযোগিতা দিতে নিজস্ব দূরপর্যবেক্ষণ শক্তিসম্পন্ন বহুমাত্রিক দক্ষতার বিমানের সারি। প্রয়োজনে বিমানবাহী জাহাজ সংযোজিত হবে। এমন একটি যুগোপযোগী শক্তিশালী আধুনিক সর্বমাত্রার নৌবাহিনীর প্রয়োজন ভূকৌশলগত অবস্থানের কারণে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অবশ্য সমুদ্র বাণিজ্য রক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব এখন নৌবাহিনীর ওপর। যদিও বাংলাদেশ নৌবাহিনী উপকূলীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন দূর সমুদ্রের চ্যালেঞ্জ তাদের সামনে। আর এ জন্যই সব মহল থেকে এর আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় নৌবাহিনীর দায়িত্ব অনেক। দেশের বিশাল জলসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি সমুদ্রে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রোধ, গভীর সমুদ্রে উদ্ধার তৎপরতা বৃদ্ধি, মৎস্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ব্লকগুলোয় অধিকতর নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি সার্বিকভাবে দেশের ব্লু ইকোনমির উন্নয়নে এ বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। ক্রমাগত সম্পদ আহরণের ফলে বিশ্বের স্থলভাগের সম্পদ আজ সীমিত। তাই সারা বিশ্ব এখন নতুন সম্পদের খোঁজে রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ব্লু ইকোনমির মাধ্যমে সমুদ্রসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির ৯৫ শতাংশ সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবদান ৯২ ভাগ। সমুদ্রবন্দর কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নির্মিত হচ্ছে পায়রা সমুদ্রবন্দর। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নে রাবনাবাদ চ্যানেলের তীরে এটির নির্মাণকাজ চলছে। প্রতিবছর দেশের বন্দরের ব্যবহার ১২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জরুরি হয়ে উঠেছে নতুন একটি বন্দরের। তা ছাড়া বর্তমান দুটি বন্দরে যে আকারের জাহাজ আসতে পারে, তার চেয়ে বৃহত্তর দৈর্ঘ্য ও বেশি গভীরতার জাহাজ সরাসরি পায়রাবন্দরের জেটিতে আসতে পারলে সামগ্রিকভাবে লাভবান হতে পারবে দেশের শিল্প, বাণিজ্য এবং অর্থনীতি। ২০১৩ সালে কাজ শুরু হওয়া পায়রাবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে ট্রানজিট ও অর্থনৈতিক করিডোর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, নৌবাহিনীর ঘাঁটিসহ অবকাঠামোগত আরো অনেক সুযোগ-সুবিধা। পর্যটন ও কর্মসংস্থানেরও বিরাট ক্ষেত্র তৈরি হবে। উপরন্তু মহেশখালীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি দায়িত্ব বাড়বে নৌবাহিনীর।
৩.
সমুদ্র বাণিজ্যের গতিপথ নিশ্চিত করার জন্য দরকার চোরাচালান রোধ, রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য বিদেশির অনুপ্রবেশ বন্ধকরণ, জলদস্যুতা ও অন্যান্য অপরাধ দমন করা। তেমনি বন্দরকে রক্ষা করা দরকার। আর এসব কাজ নৌবাহিনীকে করতে হচ্ছে। নৌবাহিনীর হস্তক্ষেপে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর দুর্নীতিমুক্ত হয়ে আমদানি-রপ্তানির প্রক্রিয়া গতিশীল হয়েছে। নৌবাহিনীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় নদী ড্রেজিংকরণের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো আজ মোংলা বন্দরে নিরাপদে ভিড়তে পারছে এবং দুর্বৃত্তদের কবলমুক্ত হয়ে স্বাভাবিক মাল খালাস প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ নৌবাহিনী সাফল্য দেখিয়েছে। নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। বাংলাদেশের জলসীমার পরিধি বিস্তৃতি লাভ করায় নৌসদস্যদের দায়িত্ব আরো বেড়েছে। আগেই বলা হয়েছে, গড়ে উঠেছে ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনী। যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন জাহাজ, অত্যাধুনিক এয়ার ক্রাফট।
এ ছাড়া নতুন ঘাঁটি ও সংস্থা তৈরি, নতুন নতুন স্থাপনা প্রস্তুতকরণ, নৌসদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত ও বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কলেবর আরো বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলছে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার এই বাহিনীর জন্য ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ প্রণয়ন করে। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে স্থলপথে, আকাশপথে ও সমুদ্রপথে একই সঙ্গে কার্যকরভাবে অপারেশন পরিচালনার দক্ষতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে একটি ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনীরূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০১২ সালে ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ নামে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রভূত উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়। এ উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনী বিশ্বের অন্যতম একটি দক্ষ ও শক্তিশালী নৌবাহিনীতে রূপান্তরিত হবে।
ওই ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর প্রথম ধাপ ২০১২-২০১৫ সম্পন্ন হয়েছে। এ ধাপে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুটি ফ্রিগেট, চীন থেকে দুটি করভেট জাহাজ ও দেশীয়ভাবে খুলনা শিপইয়ার্ড থেকে তৈরি করা যুদ্ধজাহাজসহ ২০টি যুদ্ধজাহাজ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে অত্যাধুনিক নৌবহর, সাবমেরিন, ডেস্ট্রয়ার, অত্যাধুনিক ফ্রিগেট শিপ, করভেট শিপ, মাইন সুইপার, প্যাট্রল ক্রাফট, অয়েল ট্যাঙ্কার, নেভাল এভিয়েশন, গবেষণা ও জরিপ জাহাজ এবং একদল দক্ষ ও অকুতোভয় নৌসদস্যকে নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী একটি শক্তিশালী নৌবাহিনীরূপে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে বাংলাদেশের জলসীমার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে নিজেদের তথা বাংলাদেশকে সম্ভাব্য দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ জলসীমা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাওয়ায় সমুদ্র বাণিজ্য নির্বিঘ্ন এবং দুষ্কৃতকারীদের হীন চেষ্টা প্রতিরোধ করতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সব জাহাজ, ঘাঁটি ও স্থাপনায় বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হচ্ছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক নৌসদস্যকে তাঁদের নিজ নিজ স্থান থেকে আরো সচেতন থাকা জরুরি। এ জন্য বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের উত্থান ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর রণসামর্থ্যের বিষয়গুলো বিবেচনা করে দেশের নৌবাহিনীকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানের অভিযানে নেভি শিল্ডের অংশগ্রহণ ও জঙ্গি নির্মূলের কথা কারো ভুলে যাওয়ার কথা নয়। অবশ্য নৌবাণিজ্য রক্ষায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিজ্ঞান এবং তার প্রয়োগে পারদর্শী হতে হবে। কারণ একবিংশ শতাব্দীতে উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে একটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা আবশ্যক। সমুদ্র-বাণিজ্যের সাফল্যের আরো একটি দিক হচ্ছে নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়া। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর খুলনা শিপইয়ার্ড নতুন নতুন যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের মাধ্যমে সাফল্যের অনন্য নজির স্থাপন করে চলেছে। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে আরো বড় বড় ও আধুনিক যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করার মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে সমৃদ্ধ করবে।
আবার আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দিক থেকেও নৌবাহিনী এগিয়ে আছে। বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীপ্রধানদের সফর, স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমুদ্রবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর সঙ্গে বিশেষ বিশেষ সামুদ্রিক মহড়ায় অংশগ্রহণ, বন্ধুপ্রতিম দেশে নৌবাহিনী জাহাজগুলোর শুভেচ্ছা সফরসহ আন্তযোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সামুদ্রিক মহড়া, শুভেচ্ছা সফর এবং আন্তযোগাযোগ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দক্ষতা ও রণকৌশল সমৃদ্ধ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার মাধ্যমে স্পেশাল ওয়ারফেয়ার ডাইভিং অ্যান্ড স্যালভেজ (সোয়াডস) প্রতিষ্ঠা এর অনন্য নিদর্শন। এই সুসম্পর্ক ও কার্যকলাপগুলো আরো জোরদার করাসহ প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে হবে। মাতৃভূমির জলসীমার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দূরদর্শিতাপূর্ণ পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে পথ চলতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন প্রায় এক লাখ ১১ হাজার ৬৩২ বর্গকিলোমিটার। এই সমুদ্রসীমা অগাধ প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার। এই সীমার আওতায় প্রচুর পরিমাণে মাছ, সমুদ্রজাত উদ্ভিদ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, যা আমাদের দেশের বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার সম্পূর্ণ চাহিদা মেটাতে সক্ষম। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন এই সম্পদের সুষ্ঠু সংরক্ষণ ও ব্যবহার। বাংলাদেশ নৌবাহিনী এ জন্যই কাজ করছে। এ ছাড়া সাঙ্গু উপকূলীয় গ্যাসফিল্ডের ওপর ভিত্তি করে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে সামুদ্রিক অঞ্চলে আমাদের গ্যাস আহরণের কিংবা খনিজ তেল পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি, যা আমাদের জলসীমার গুরুত্ব আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত দেশীয় জেলেদের সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসীদের হাত থেকে বিদেশি জাহাজগুলো নিরাপদে বন্দরে পৌঁছানো এবং সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের স্থাপনা ও পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নৌসদস্যরা দেশের দুর্জয় কাণ্ডারীর ভূমিকা পালন করছেন। মৎস্য আহরণ বাজারজাতকরণসহ সমুদ্রসম্পদ, বিশেষ করে আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ লোকের জীবিকা নির্ভরশীল। ২০০১ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রথমবারের মতো জাটকাবিরোধী কর্মসূচি ‘অপারেশন জাটকা’ অভিযান শুরু করে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর টহল জাহাজ প্রতিবছরই বিপুল পরিমাণ অবৈধ কারেন্ট জাল আটক ও ধ্বংস করে মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বিশাল সমুদ্রে অবৈধ অস্ত্র ও মালামাল বহনকারী জাহাজ ও নৌকা এবং সন্ত্রাসীদের আটক করার জন্য কুতুবদিয়া চ্যানেল ও মহেশখালীতে নৌবাহিনীর জাহাজ ও নৌসদস্যরা নির্ঘুম প্রহরীর ভূমিকা পালন করছেন। বিশাল সমুদ্র সীমানা রক্ষা, নৌপথে মানবপাচার রোধ ও অবৈধ মৎস্য আহরণ রোধ করতে প্রতিনিয়ত পাঁচ থেকে সাতটি নৌবাহিনীর জাহাজ টহলে রয়েছে।
বিদেশ থেকে মাদকদ্রব্য ও ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশ রোধ করে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এ দেশের যুবশক্তিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করছে। দেশের সমুদ্রে অন্য দেশের মাছ ধরার ট্রলার আটক করে এরই মধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অকুতোভয় নাবিকরা নিজের জানমাল বাজি রেখে বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। উপকূলীয় এলাকা সন্দ্বীপ ও সেন্টমার্টিনের প্রবাল দ্বীপগুলো, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজারে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়মিত অপারেশনের ফলে হাজার হাজার মানুষকে নিরাপত্তা প্রদান করে যাচ্ছে।
৪.
এটা সত্য যে, কোনো দেশের সমুদ্রসীমা কখনই ঝুঁকিমুক্ত নয়, এদিক থেকে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা শত্রুমুক্ত রাখতে এবং সমুদ্র-বাণিজ্যকে রক্ষার জন্য আমাদের নৌবাহিনীকে সদা সচেষ্ট থাকতে হচ্ছে। কারণ, তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের সমুদ্রসীমা রক্ষা এবং সমুদ্রসম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ করা। আর বঙ্গোপসাগরের সম্পদরাজির যথাযথ সংরক্ষণ আমাদের নিজেদের উন্নয়নের স্বার্থেই প্রয়োজন। গোটা বিশ্বের মানুষ আজ পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একটি সমুদ্র উপকূলীয় দেশ হিসেবে আমাদের দেশের জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান হার সমুদ্র-নির্ভরতাকে আরো প্রকট করে তুলেছে। সমুদ্র থেকে প্রাপ্ত সব খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে লক্ষণীয় ভূমিকা পালন করতে পারে। আর এসব সম্পদের মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশের জনগণের খাদ্যের নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারি।
এ দেশের বিশাল সমুদ্রাঞ্চলে রয়েছে মৎস্য, গ্যাস ও অন্যান্য খনিজ সম্পদসহ অনাবিষ্কৃত মূল্যবান সম্পদ। এসব সম্পদ রক্ষা, আহরণ ও সমুদ্র এলাকার সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য নৌবাহিনী গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। বিশাল সমুদ্র নৌবাহিনীর কর্মক্ষেত্র। লোকচক্ষুর অন্তরালে উত্তাল সমুদ্রে দিবারাত্রি কঠোর পরিশ্রম ও কর্তব্যনিষ্ঠার যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তারা স্থাপন করেছেন, দেশবাসী তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। উপরন্তু নৌবাহিনীর সদস্যরা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের তৎপরতা সবার প্রশংসা অর্জন করেছে। কেবল সমুদ্র-বাণিজ্য রক্ষায় নয়, সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এখন অনেক বেশি কার্যকর, শক্তিশালী এবং গতিশীল বাহিনী হিসেবে পরিচিত।
লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, অধ্যাপক এবং পরিচালক জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

মিল্টন বিশ্বাস