বিরোধীরা আশাবাদী হতেই পারেন
কথায় বলে ‘সাইলেন্ট ইজ গোল্ড’। নীরবতা এবং কুশলতা যে সফলতার বাহন হতে পারে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন তার একটি প্রমাণ। বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় এটি একটি ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি’। কুসিক নির্বাচন সেখানে একটি ব্যতিক্রম উদাহরণ। ব্যতিক্রম এই কারণে যে, ২০১৪ সালে সাধারণ নির্বাচনের পর এই প্রথমবারের মতো অনুভূত হলো যে, দেশে নির্বাচন কমিশন রয়েছে। সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনের জন্য এটি ছিল একটি প্রাথমিক টেস্ট কেস। নতুন নির্বাচন কমিশনের অধীনে এই প্রথম একজন বিরোধী প্রার্থী জয়লাভ করলেন। এর আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এবং ১৪টি উপজেলা উপনির্বাচনে এক রকম গতানুগতিকতা দেখা গেলেও এই নির্বাচন জনগণের কাছে একটি আশার আলো বলে প্রতিভাত হচ্ছে। নির্বাচনটি যে নিরঙ্কুশভাবে নির্ভেজাল হয়েছে তা নয়। তবে, বিরাজমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন এ রকম হতে পারে তা কমিশন প্রমাণ করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ঐতিহ্য অগ্রাহ্য করে আওয়ামী লীগ স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে প্রার্থীর পরিচয় প্রচ্ছন্নভাবে জানা থাকলেও তা নির্বাচনকে প্রভাবিত করত সামান্যই। বরং, প্রার্থীর সততা, সাহসিকতা ও জনপ্রিয়তা বিজয়ের মাত্রা নির্ধারণ করত। ২০১৩ সালে সরাসরি দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না করেও পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তৎকালীন বিরোধী দল-বিএনপি জয়লাভ করে। এই জয়লাভের ঘটনায় বিএনপি যেমন অতিমাত্রায় উৎফুল্ল হয়ে ওঠে তেমনি ক্ষমতাসীন দল অশনী সংকেতে আতঙ্কিত হয়।
এবার অবশ্য কমিশনের ইতিবাচক কর্মকর্তারা কুশলতার সঙ্গে সরকারি নেতাদের চাপ ও অন্যায় দাবি অগ্রাহ্য করেছেন। এটা তারা করতে পেরেছে এ জন্য যে, নির্বাচন কমিশন তাদের প্রধান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে, তবে আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষের ভূমিকায় আগের মতোই হতাশ হতে হয়েছে।
আমাদের নিচু রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ব্যতিক্রমধর্মী ছিল। নির্বাচন চলার সময়ে উভয় প্রার্থী জনগণকে আশ্বাস্ত করেছিলেন যে, তারা জনগণের রায় মাথা পেতে নিবেন। সরকারি দলের প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা ইতিমধ্যেই জনগণের রায় মাথা পেতে নিয়েছেন। নির্বাচন পরবর্তীকালে উভয় পক্ষই কমবেশি দায়িত্বশীল আচরণের পরিচয় দিয়েছে। যেসব কেন্দ্রে অতি উৎসাহী কর্মীরা অপ্রীতিকর আচরণ করেছে উভয় প্রার্থীর সংযমের কারণে তা বেশিদূর অগ্রসর হয়নি।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন গণতান্ত্রিক শক্তিকে উৎসাহিত করবে। এখনো যে ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করা সম্ভব- এ প্রত্যয় তাদের হয়েছে। সরকারের নানা আচরণের কারণে যাঁরা হতাশ হয়েছিলেন তাঁরা কুসিক ফলাফলে তারা আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠবেন। ইতিমধ্যে যাঁরা নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়েছেন তাদের কেউ কেউ হয়তো বিপথগামী হয়েছেন। এখন তাঁরা অন্যবিধ চিন্তা না করে গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থা ও গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন। এ ধরনের নির্বাচন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা না করলেও ইঙ্গিতবাহী। সবারই মনে থাকার কথা যে, ২০১৩ সালের নির্বাচনে পাঁচ সিটি করপোরেশনে বিএনপির বিজয় রাজনৈতিক মাইলফলকের কাজ করে। পরবর্তীকালে বিএনপি ক্ষমতার প্রান্তসীমায় পৌঁছেও ক্ষমতায় যেতে পারেনি। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার ধ্বসের প্রমাণে আওয়ামী লীগ ভিন্নতর কৌশল গ্রহণ করে।
প্রথমত তারা নির্বাচনকালীন তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নিজেদের হাতে ক্ষমতা রেখেই নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল লক্ষ করে যে, কিছু লোক দেখানো চমক ছাড়া নির্বাচনকে সবার গ্রহণযোগ্য করার কোনো চেষ্টাই আওয়ামী লীগ করেনি। এটা ছিল তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ। তারপরের ঘটনাবলী সবারই জানা কথা। কুসিক নির্বাচনের মাধ্যমে এখন সরকার দেখাতে চায় যে আগামী জাতীয় নির্বাচনে তাদের ওপর নির্ভর করা যায়। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এখন আবার কুসিক নির্বাচন নিয়ে ২০১৩ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে। দেশবাসী এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আওয়ামী লীগ সরকার এ বার্তা দিতে চাচ্ছে যে তাদের অধীনে বিএনপির জয় লাভ সম্ভব। কিন্তু, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এককথা নয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয় না। কুসিক নির্বাচনের মতো আরো ১০০টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি জিতলেও সরকারের কিছু আসে যায় না।
বর্তমান সময়ে বিরোধী রাজনীতি বিনষ্ট করার জন্য নানা নামে এবং নানা ধরনে বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার যে প্রক্রিয়া চলছে কুসিক নির্বাচন তাকে আরো ব্যাপকতা প্রদান করবে। সরকার আরো বেশি শক্তি প্রয়োগে ভবিষ্যৎ প্রার্থীদের শক্তির মাধ্যমে দমন করার প্রয়াস নিতে পারে। নির্বাচন কমিশন প্রধান নুরুল হুদা সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চান। এই রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে যে জনগণ একটি বিপ্লব সাধন করেছে নীরবে, তা সরকারকে একটি বার্তা দিয়েছে।
আগেই বলা হয়েছে যে, স্থানীয় সরকারে বিরোধীদের বিজয় সরকার পরিবর্তনের নিদের্শক নয়। সরকার পরিবর্তনের নিয়ামক যে নির্বাচন অর্থাৎ আগামী সংসদ র্নিবাচন তত্ত্বাবধায়ক বা নির্বাচন কালীন সরকারের অধীনে না হলে পরিবর্তনের কোন আশা নেই। সরকার ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে চাইবে, আর বিরোধীরা পরিবর্তন প্রত্যাশী হবে- এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুযায়ী পরিবর্তন প্রত্যাশা করলে তার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ তিতিক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে কুসিক নির্বাচনের আশাবাদকে কাজে লাগিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য গণবিপ্লব সৃষ্টি করতে হবে। এভাবে জণগনের গণতান্ত্রিক আশা আকাঙ্ক্ষাকে অভিষ্ট লক্ষে পৌঁছে দিতে হবে।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ড. আবদুল লতিফ মাসুম