অভিমত
কে জানে এ প্রশ্নের উত্তর?
আমাদের সবকিছু যেন গা সওয়া হয়ে গেছে। আমরা কি ভুলে যাচ্ছি সোচ্চার হতে? অধিকার আদায়ের কথা বলতে কি ভয় পাচ্ছি আমরা? জীবন তো কোনো না কোনোভাবে চলছেই। চলছে কীভাবে?
আমাদের নিম্নবিত্ত ছাপোষা মানুষের জীবন কীভাবে চলছে? তারা কী খাচ্ছে, কী পরছে, কীভাবে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ বহন করছে? এতগুলো প্রশ্নের উত্তর কে দেবে—দেশের সরকার, নাকি বিরোধী দল, নাকি সুশীল সমাজ?
আমরা বর্তমানে কোন সময় পার করছি? নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে হু-হু করে। কারো যেন মাথাব্যথা নেই। কেউ রাজপথে নামছে না প্রতিবাদ করার জন্য। নামলেই কী বিপদ!
ধরা যাক মাংসের কথা। গত বছরও ২৮০ টাকা ছিল এক কেজি গরুর মাংসের দাম। তখনো কেউ কেউ বলত, হঠাৎ এত দাম বেড়ে গেল! আর আজ? ৫০০ টাকা কেজি খেতে হচ্ছে। কদিন আগেই দামটা নির্ধারিত হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে টুঁ শব্দটা শোনা গেল না। খাসির মাংস ৭৫০ টাকা কেজি। টুঁ শব্দ নেই। নেই কোনো প্রতিবাদ।
সয়াবিনের তেলের দাম বাড়ল। বাড়ল চিনির দাম। বাড়ল চালের দাম। এভাবে দেখা যাচ্ছে প্রতিটি জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, দু-একটি পত্রিকা মাঝেমধ্যে এটা নিয়ে লেখালেখি করার পর থেমে যাচ্ছে। কী কারণে? সাধারণ মানুষকে নিয়ে যাদের কারবার, সেই রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো বড় ধরনের আন্দোলন তো চোখে পড়ছে না।
নির্বাচনের সময় যারা সবচেয়ে দামি হয়ে যান, সেই সাধারণ মানুষ কেমন আছে, কীভাবে চলছে তাদের জীবন—সে খবর রাখার প্রয়োজন মনে করছেন না রাজনৈতিক নেতারা। তা হলে? মানুষ কাদের ওপর ভরসা করবে। কারা সাধারণ মানুষের হয়ে কথা বলবে?
ভোটের সময় যাঁরা আসেন আটপৌরে শাড়ি পরা নারীর কাছে, বৃদ্ধ নারীর কাছে, মাথায় যেন হাত বুলিয়ে একটু দোয়া দিয়ে দেন। সেই নারীরা কেমন আছে? দুবেলা সন্তানদের খাওয়াতে পারছেন কি না। মাসে একবেলা এক টুকরা মাংস তুলে দিতে পারছেন কি না ছেলে বা মেয়ের খাবারের প্লেটে। সে খবর তাদের রাখার সময় নেই। ভোটে পাস করার পর ক্ষমতা পেয়ে সব ভুলে গেছে। ক্ষমতায় থাকার জন্য যত রকমের কৌশল আছে, সব করা হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ, যাদের একটা মূল্যবান ভোট তাদের কপাল খুলে দিয়েছে। যারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে, তারা আরো ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন যেন।
বিরোধী দল বলে দেশে কিছু কি আছে? থাকলে কেন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে আন্দোলন নেই? কেন নেই হরতাল-অবরোধ?
শুধু নির্বাচন নিয়ে তাদের হৈচৈ। কীভাবে আবার ক্ষমতায় যাওয়া যাবে, সে জন্য হাঁসফাঁস সর্বক্ষণ।
আর সুশীল সমাজ? তারা কি সবাই ক্ষমতাশালীদের ধামাধরা হয়ে যাচ্ছে? কোথায় সেই সুশীল সমাজ, যাদের আমরা জাতির বিবেক মনে করি। যাদের জ্ঞানগর্ভ লেখা পড়ে আমরা মুগ্ধ হই। তারা কি সবাই বিক্রি হয়ে গেছে?
তা হলে আর থাকল কে নিম্নবিত্ত ছাপোষা মানুষের পক্ষে?
সরকার নিজের ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশল নিয়ে মেতে আছে। বিরোধী দল ক্ষমতায় যাওয়ার মতলবে আছে। আর তথাকথিত সুশীল সমাজ ব্যস্ত সরকারের তল্পিবাহক হওয়ার জন্য।
আমরা কার কাছে যাব? কাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকব?
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে কিসের কারণে, কারা বাড়াচ্ছে, কোন যুক্তিতে—কোনো ব্যাখ্যা নেই।
সরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে গত মার্চে প্রথম ধাপে। আবার জুনে বাড়ানো হবে দ্বিতীয় ধাপে। পানির দাম বাড়ছে নীরবে। বিদ্যুতের দামও বাড়ছে। বাড়ছে শুধু বাড়ছেই। বাড়ছে না শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান।
গিনিপিগ হয়ে আছি আমরা সাধারণ মানুষ। দাস হয়ে আছি আমরা। ভোটের সময় তাদের ভোট দেবো। আমাদের নানা রকমের প্রলোভন দেখিয়ে ভোট নেব। আর ক্ষমতায় গিয়ে ভুলে যাবে ভোটারদের কথা।
আর যারা পাস করতে পারেনি, তারা হয়তো ভাবে, দেখ মজা কেমন লাগে, ভোট দিয়ে মসনদে বসানোর মজা বোঝো এবার। নাকি তাদের ভেতর জুজুর ভয় ঢুকে গেছে? কী দরকার আন্দোলন করে। ধরপাকড়ের খপ্পরে পড়ার চেয়ে চুপচাপ থাকাই ভালো।
আর সেই সুশীল সমাজ? সবাই যেন চুপসে গেছে হাওয়া চলে যাওয়া বেলুনের মতো। হয়তো পকেটে বা ব্যাংকে জমা পড়েছে ক্ষমতাশালীদের কাছ থেকে পাওয়া উপঢৌকন। কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো পদক থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় মুখে কুলুপ এঁটে বসে বসে ক্ষমতাবানদের হম্বিতম্বি দেখছেন।
বাম ঘরানার রাজনীতিবিদগণ তো ঠান্ডা হয়েই আছেন। সাপের শীতের নিদ্রার মতো। সব আমলেই নাকি তাঁরা ভালো থাকেন, নিন্দুকেরা কথাটা বলে থাকেন।
এভাবে কি একটি দেশ উন্নয়নের মহাসড়কের দিকে এগিয়ে যেতে পারে?
কে জানে এ প্রশ্নের উত্তর?
লেখক : ছড়াকার, সাংবাদিক।

সারওয়ার-উল-ইসলাম