অভিমত
বরখাস্তের পর বরখাস্ত
বরখাস্তের পর বরখাস্তের খবর আসছে। এ সপ্তাহ ছিল বরখাস্তের খবরে ঠাসা। সিলেট, রাজশাহী ও হবিগঞ্জের মেয়রকে দ্বিতীয়বার বরখাস্তের পর নাগরিক বিবেক বিচলিত হয়। নিন্দিত হয় সরকারের হঠকারিতা। সব মত, সব পথের মানুষ নানা ভাষায় নানাভাবে এর তীব্র সমালোচনা করেন। সহজ-সরল লোকেরা বিশ্বাস করছিলেন, হয়তো বা এ ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি হবে না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে দুই সিটি করপোরেশন এবং এক মেয়রকে বরখাস্তের দুদিনের মাথায় আরো পাঁচ জনপ্রতিনিধিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। সবার বিরুদ্ধে সাজানো-গোছানো একই ধরনের অভিযোগ। যথারীতি মামলার অভিযোগপত্রগুলো সংশ্লিষ্ট আদালতে গৃহীত হয়েছে। একদিকে সরকার জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করছে, অন্যদিকে হাইকোর্ট সব বরখাস্ত আদেশকে স্থগিত করে দিচ্ছেন। সর্বপ্রথম স্থগিত আদেশ পান সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক। ৪ এপ্রিল স্থগিত আদেশ পান রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এবং হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জি কে গউছ। বরখাস্তকৃত পাঁচ প্রতিনিধি হয়তো আইনের ধারাবাহিকতায় স্থগিত আদেশ পাবেন।
সিভিল সোসাইটি এবং নাগরিক সাধারণের বিরূপ মন্তব্যের পর সংগতভাবেই প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় যে, সরকার কি নিয়ম-কানুন, রীতি-রেওয়াজ এবং ভদ্রতা-সভ্যতা ভুলে গেছে? লোকলজা বলতে সমাজে একটি কথা আছে, তাহলে সরকার কি সেটিও অবজ্ঞা করছে?
একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত সাড়ে তিন বছরে বরখাস্তকৃত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধির সংখ্যা ৩৭৫। গত সপ্তাহেই রাজশাহী, সিলেট, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে এক ডজন প্রতিনিধি বরখাস্ত হয়েছেন। এর আগে অপসারিত হয়েছেন গাজীপুর ও খুলনার মেয়ররা। আরো শতাধিক বরখাস্ত হওয়ার আতঙ্কে দিন গুনছেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, তাঁরা শত শত মামলা মাথায় নিয়ে ঘুরছেন। এঁদের প্রায় সবাই সরকারবিরোধী। অথচ আওয়ামী লীগের পাঁচজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে বাস্তব অভিযোগ দায়ের হলেও তাঁরা কখনো অপসারিত হননি। রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে সরকার বিরোধিতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্যই এ ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। অথচ এ ব্যবস্থা আরো জোরদার ও কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এ ব্যবস্থার ফলে দেশে গণতন্ত্রের যে অবশিষ্টটুকু বহাল আছে, তা-ও বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদে জানা যায়, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ও সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এবং হবিগঞ্জের মেয়র জি কে গউছকে দ্বিতীয় দফায় সরকার বরখাস্ত করেছে। উচ্চ আদালতের আদেশে মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে আবার তাঁদের বরখাস্ত করা হয়। সরকারের দায়ের করা অনেক মামলা-মোকদ্দমা মোকাবিলা করে কারা নির্যাতন শেষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আদেশ নিয়ে এঁরা দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। দুই বছর পর সেদিন দুই ঘণ্টার জন্য মেয়রের চেয়ারে বসেছিলেন সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। দ্বিতীয় দফায় সাময়িক বরখাস্তের চিঠি পেয়েই চেয়ার ছেড়ে চলে যান তিনি। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জনসভায় বোমা হামলার অভিযোগে তাঁকে দ্বিতীয়বার বরখাস্ত করা হয়। অন্যদিকে, রাজশাহীর ঘটনা একটু ভিন্ন ধরনের। আইনগত সব বাধা অতিক্রম করে রাজশাহীর মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাঁর কার্যালয়ে গেলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বাদ সাধে। সহিংসতার পর পুলিশ ডেকে তালা ভেঙে চেয়ারে বসেন বুলবুল। মাত্র আট মিনিট পর মন্ত্রণালয় থেকে ফ্যাক্সে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। পুরোনো ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ায় তাঁকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। একই ঘটনা ঘটে হবিগঞ্জের মেয়র জি কে গউছের ক্ষেত্রে। আরিফুল হক চৌধুরীর মতো তাঁকেও একই অভিযোগে (সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জনসভায় বোমা হামলা) দ্বিতীয়বার বরখাস্ত করা হয়। এর আগে গত বছরের মার্চে কিবরিয়া হত্যা মামলার আসামি হিসেবে তাঁকে প্রথমবার বরখাস্ত করা হয়। দায়িত্ব ফিরে পাওয়ার ১১ দিনের মাথায় জি কে গউছ আবার বরখাস্ত হলেন। বরখাস্তকৃত তিন মেয়রই বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা। তাঁরা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিভিন্ন সময় নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ ধরনের ঘটনা পাকিস্তান আমলের স্বৈরশাসকদের আচরণের কথা মনে করিয়ে দেয়। বঙ্গবন্ধু সে সময় অনেকবার মামলা থেকে খালাস পেয়েও জেলগেটে গ্রেপ্তার হয়েছেন। যেখানেই আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ব ছিল, স্বৈরশাসকরা বারবারই সেখানে নিপীড়নের পথ বেছে নিয়ে ছিল। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে দ্বিতীয় দফা সাময়িক বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের বরখাস্তের আদেশ চ্যালেঞ্জ করেও রিট করা হচ্ছে। হবিগঞ্জের মেয়র জি কে গউছ হয়তো রিট করবেন। এভাবে প্রচ্ছন্ন বিরোধে জড়িয়ে পড়ছে দেশের নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ। উল্লেখ্য, ভোটারদের রায়কে যাতে কেউ নস্যাৎ করতে না পারে, সে রকম একটা রায় আপিল বিভাগে রয়েছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন দল বা সরকার যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার না করে স্থানীয় শাসনে ভোটারদের প্রত্যাশাকে নাকচ করার একচেটিয়া সুযোগ না পায়, সে জন্য ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার স্থানীয় সরকার আইনে সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছিল। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হলে এ ধারাগুলো বাদ দিয়ে নতুন করে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাবিষয়ক আইন প্রণয়ন করা হয়।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রজ্ঞাপনে বিভিন্ন স্বাক্ষরে কিন্তু একই ভাষায় লেখা চিঠি দেওয়া হয় এসব মেয়রকে। চিঠিগুলোতে সিটি করপোরেশন আইন, ২০০৯-এর ১২(১) উপধারার উল্লেখ করা হয়। উল্লেখ্য, এ ধারায় সিটি করপোরেশন মেয়রের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র আদালত কর্তৃক গৃহীত হলে সরকার কর্তৃক লিখিত আদেশের মাধ্যমে সাময়িকভাবে বরখাস্তকরণের বিধান রয়েছে। এসব আদেশকে সংক্ষুব্ধ মেয়ররা প্রায় একই ভাষায় প্রতিবাদ জানান। তাঁরা একে ‘উচ্চ আদালত ও গণতন্ত্রের প্রতি অবমাননাকর ও ষড়যন্ত্রমূলক’ বলে অভিহিত করেন। এভাবে প্রাথমিক স্তরের তিনজন গণপ্রতিনিধিকে আকস্মিক এবং আপত্তিকরভাবে বরখাস্ত করায় নাগরিক সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। দৃশ্যত বিষয়টি ক্ষমতাসীন সরকারের অবিবেচনাপ্রসূত, অসহিষ্ণুতামূলক এবং অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে। এরা আরো মনে করে, বিষয়টি নিয়ে সরকারি পদক্ষেপে কুশলতার অভাব প্রমাণিত হয়েছে। একটি রাজনৈতিক সরকার রাজনৈতিক উপায় এবং কৌশলে কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক। দলীয় কেন্দ্রিকতায় বিশ্বাসী সরকার বুদ্ধিমান হলে ব্যবস্থাটি দুই থেকে চার সপ্তাহ পরে নিলেও সরকারের লোকসান হতো না। দেশে যখন ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) ১৩৬তম সম্মেলন চলছে, তখন এ ধরনের সিদ্ধান্ত অতিথিদের নেতিবাচক বার্তাই দেবে। রাজনৈতিক দূরদর্শী মহল আরো মনে করে, এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে। রাজনীতিকের পরিবর্তে আমলারা যখন অতি উৎসাহী হয়ে উঠছেন, তখন এ ধরনের ঘটনা অসম্ভব নয়। আমলারা ক্ষমতা নিয়ে ভাবেন আর রাজনীতিকরা পদ লালায়িত থাকেন। স্থানীয় পর্যায়ে যেভাবে ভোটবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে, তাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ষড়যন্ত্র অস্বাভাবিক নয়।
স্থানীয় বিষয়াদি স্থানীয়ভাবেই মোকাবিলা করা শ্রেয়। ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌর করপোরেশনের নেতৃত্ব স্থানীয় পর্যায়েই নির্ধারিত হওয়া উচিত। যদি তা দলীয়ভাবে করতেই হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট দলীয় নেতাকর্মীদের ওপরেই সিদ্ধান্তের ভার দেওয়া উচিত। আর সকলেরই জানা কথা যে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের শুরুটা তৃণমূল পর্যায় থেকে আরম্ভ হয়। একজন কর্মী নেতা হয়ে দীর্ঘদিন অবশেষে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন তার ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। এটা দুর্ভাগ্যজনক, আমাদের দেশে কমবেশি সব দলীয় ক্ষেত্রে এ কথা সত্য যে, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক. মাস্তান, খ. কালো টাকা এবং গ. আমলানির্ভর হয়ে ওঠেন। বরখাস্ত করার মাধ্যমে এসব প্রবণতা যে কাজ করেনি, তা হলফ করে বলা যাবে না। ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় যাই হোক, স্থানীয়ভাবেই তার শেষ হওয়া উচিত। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যদি স্থানীয় পর্যায়ে জনকল্যাণের উদাহরণ সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিত্বের বিষয়টি গভীরভাবে ভাবার দাবি রাখে। নিরঙ্কুশ নিরপেক্ষতার সঙ্গে যদি নির্বাচন পরিচালনা করা যায়, তাহলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে।
স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক বরখাস্তকরণ প্রমাণ করে, সরকার তৃণমূল পর্যায়ও বিন্দুমাত্র বিরোধিতা সহ্য করতে চাইছে না। এটি দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। সরকার গণতন্ত্রের কথা উচ্চ স্বরে বলছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আন্তসংসদীয় সম্মেলন করছে। অথচ দেশে তাদের অব্যহত কার্যাবলিতে বিপরীত চিত্র ফুটে উঠছে। গুজব রয়েছে, সরকার শিগগিরই জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেবে। তাহলে কি সরকার এ রকম বিরোধী ব্যক্তিদের জেলে পাঠিয়ে ২০১৪ সালের মতো একক নির্বাচন করতে চায়? নিঃসন্দেহে এই বরখাস্তের আদেশগুলো সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং জনসাধারণ সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পাবে।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ড. আবদুল লতিফ মাসুম