অভিমত
ট্রাম্পের তুঘলকী কাণ্ড আমাদের যা শেখায়
১.
ওবামাকেয়ার প্রশ্নে ব্যর্থ হওয়া নিয়ে গত ২৬ মার্চ ২০১৭ তারিখে নিউইয়র্ক টাইমস-এ রবার্ট ড্রপার নামে একজনের উপসম্পাদকীয় শিরোনাম ছিল ‘ট্রাম্প বনাম কংগ্রেস : এখন কী’। তাহলে মুসলিম অভিবাসন নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রজুড়ে যা ঘটল, তাতে শিরোনাম হতে পারত – ‘ট্রাম্প বনাম কোর্ট’।
ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশীয়দের কাছে মুহাম্মদ বিন তুঘলককে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। কারো কারো কাছে বাংলা সিনেমা পাগলা রাজার কথা মনে হতে পারে। যে মার্কিন রাষ্ট্রকে বিপ্লবী ফ. এঙ্গেলস জন্মবুর্জোয়া রাষ্ট্র বলেছেন, সেখানে দেখা যাচ্ছে তুঘলকরা ক্ষমতায় আসতে পারে কিন্তু তুঘলকী কারবারটা চালাতে পারে না। আর আমেরিকা তো ভক্তিরসে ভরা রাষ্ট্র ছিল না যে, তাদের সংবিধানে একজনকেই সকল ক্ষমতার মালিকানা দিয়ে বসবে!
আমরা দুটো ঘটনায় দেখলাম, প্রথমে কোর্ট দ্বারা এবং পরেরবার দলীয়দের বিরোধিতার কারণে ট্রাম্পের নির্দেশ কার্যকর হলো না। কারণ মার্কিনিদের স্বৈরাচার হয়ে ওঠা ব্যক্তির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার দাওয়াই তাদের ব্যবস্থার মধ্যে আছে। মুদ্রার আরেক পিঠের মতো ভাবা যেতে পারে, আমাদের পরিত্রাণের ব্যবস্থা নেই কেন! কিংবা আমাদের ব্যবস্থার মধ্যেই কোনো খুঁত আছে কি না, যার কারণে মুক্তি মিলছে না! কেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী পদটিই সব ক্ষমতার মালিক আর আমরা সবাই গোলাম?
২.
আমাদের সংবিধান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলের সম্মতি ও মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত হয়নি। গণপরিষদ গঠিত হয় ’৭০ সালে নির্বাচিতদের দ্বারা। তারাই পরে প্রণয়ন করেন বাংলাদেশের সংবিধান।
সংবিধান না থাকাকালে পদাধিকারীদের ক্ষমতার পরিধি বণ্টন হওয়ার আগ পর্যন্ত সংবিধানসভা সকল কর্তৃত্ব ভোগ করার কথা থাকলেও বাংলাদেশে তা হয় নাই। প্রথম থেকেই এক ব্যক্তির নির্দেশে ও কর্তৃত্বে যে হয়েছে, তা বোঝা যায় গণপরিষদ আইনগুলো দেখলেই। যে গণপরিষদ আইনে গণপরিষদ গঠিত হয়, সেখানেই দলীয় সিদ্ধান্ত না মানলে সদস্যপদ খারিজের ধারাও রাখা হয়। ফলে প্রথম দিন থেকেই প্রশ্নহীন আনুগত্য শুরু হয় যা প্রধানমন্ত্রী পদটিকে সকল ক্ষমতার মালিক বানিয়ে দেয়।
আমাদের সংবিধানের ৭(১)-এ বলা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ অর্থাৎ ক্ষমতার মালিক জনগণ, কিন্তু প্রয়োগের কর্তা অন্য কেউ। কারা সেই অন্য কেউ?
সংবিধানের চতুর্থ ভাগ হলো নির্বাহী বিভাগ। এই ভাগের প্রথম পরিচ্ছেদটি হচ্ছে রাষ্ট্রপতি সম্পর্কিত। তিন পৃষ্ঠাব্যাপী রাষ্ট্রপতির নির্বাচন, তাঁর পদের মেয়াদ, তাঁর দায়মুক্তি, অভিসংশন, ক্ষমা প্রদর্শনের অধিকার ইত্যাদির বিবরণ দেওয়া আছে। তবে এই তিন পৃষ্ঠাব্যাপী ক্ষমতার বিসমিল্লাহতেই ৪৮(৩)-তেই বলা আছে, ‘কেবল প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।’ অর্থাৎ তিনি সবই করবেন তবে তা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী।
এবার আসি মন্ত্রিপরিষদ সংক্রান্ত নির্বাহী বিভাগের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে। এখানেও সংবিধান মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী নিয়োগ ও নিয়োগের অবসান, মন্ত্রিসভার আকার-আয়তন তার সব কিছুই প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ারভুক্ত। তাই আমরা প্রতিমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীকে কদমবুছি করতে দেখি, দেখি তার পরই তার পূর্ণমন্ত্রী হতে।
বাকি থাকলেন সাংসদগণ। অনুচ্ছেদ ৫৫(৩) অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী থাকার কথা। কিন্তু অনুচ্ছেদ ৭০ দেখলেই বোঝা যায়, গোটা সংসদই দল তথা দলীয় প্রধানের কাছে শুধু দায়বদ্ধ নয়, একান্ত অনুগত ও বাধ্যগত হতে বাধ্য।
এ ছাড়া আইন প্রণয়নের জন্য সংসদ অধিবেশন না থাকাকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির মাধ্যমেও অধ্যাদেশ জারি করিয়ে নিতে পারেন।
অর্থাৎ জনগণের পক্ষে যাঁরা ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন -সেই রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রিপরিষদ ও সাংসদদের কোনো ক্ষমতাই নেই। সব ক্ষমতা জমা আছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আর আমরা জনগণ ভূত ছাড়া কিছু নই।
এ কারণেই আমাদের সকল প্রধানমন্ত্রী শুভ ইচ্ছা নিয়েও তুঘলকে পরিণত হন, আর মার্কিন প্রেসিডেন্টরা তুঘলক হয়েও তা কায়েম করতে পারেন না।
লেখক : প্রধান সমন্বয়ক, রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি।

নাহিদ হাসান নলেজ