ভারত সফর
বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় শেখ হাসিনার অবদান
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে ৭ থেকে ১০ এপ্রিল রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সফরে ৩৫টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। তার ভেতর বর্ডার হাট স্থাপন, তথ্য ও সম্প্রচার, বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট ও মহাকাশ গবেষণা, ভূ-তাত্ত্বিক বিজ্ঞান, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, ভারত কর্তৃক প্রদেয় লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি), কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্পর্কিত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক উল্লেখযোগ্য।
জানা গেছে, এ সফরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী মিলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র হিন্দি সংস্করণের মোড়ক উন্মোচন করবেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের যেসব সেনা শহীদ হন, তাঁদের মরণোত্তর সম্মাননাও দেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় সেনাসদস্যদের আত্মত্যাগকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেবে। তবে শেখ হাসিনার সফরে দুই দেশের স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে—পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারেজ নির্মাণ, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, নদীর অববাহিকাভিত্তিক পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত সুরক্ষা, দ্বিপক্ষীয়ক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, আন্তযোগাযোগ তথা কানেকটিভিটি, উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা, জনযোগাযোগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা, মাদক চোরাচালান ও মানবসম্পদ রোধ প্রভৃতি ক্ষেত্রে।
শেখ হাসিনা এর আগে ভারত সফর করেন ২০১০ সালে। ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সেই সফরের সময় তিনি শেখ হাসিনাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে, বিশেষত ভারতের গণমাধ্যমে, জল্পনা-কল্পনা ও আলোচনার ঝড় উঠেছে। বিএনপি তিস্তা চুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির পুরোপুরি সমর্থন না থাকার কারণেই তিস্তা চুক্তি ইস্যুটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। ২০১১ সালে তাঁর বিরোধিতায় তিস্তা চুক্তি হয়নি। বর্তমানে উত্তর প্রদেশসহ কয়েকটি নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির দলের জয়ে মমতা ব্যানার্জি আগের চেয়ে কিছুটা নরম সুরে কথা বলতে শুরু করেছেন। ফলে আশা করা হচ্ছে, শেখ হাসিনার ভারত সফরে তিস্তা নিয়ে একটি খসড়া চুক্তি হতে পারে।
এ কথা সত্য, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতবিরোধী সন্ত্রাসীদের কঠোরহস্তে দমন করে সুনাম কুড়িয়েছেন। উপরন্তু ‘গঙ্গার জল বণ্টন’ (১৯৯৬), ‘ছিটমহল’ ইস্যুর সমাধান (২০১৫), তার আগে সমুদ্রসীমার বিরোধ মীমাংসা এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে সড়ক ও রেলপথের আন্তযোগাযোগ স্থাপনে তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টার সাফল্য বিশ্বব্যাপী নন্দিত হয়েছে। অবশ্য বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরা গান্ধীর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের সূত্র ধরেই পথ হাঁটছেন তিনি। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নতুন দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়া ও শেখ হাসিনা একটি সামগ্রিক বৈদেশিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তিটি ছিল বাংলাদেশের ন্যূনতম জল সরবরাহের গ্যারান্টিসহ ৩০ বছরের জলবণ্টন চুক্তি।
১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান একটি বহুব্যাপী বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সহযোগিতা ও শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী জলসম্পদ বণ্টন, সেচ, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় নিয়ন্ত্রণের মতো সাধারণ বিষয়গুলোর জন্য একটি যৌথ নদী কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর এ দেশের স্বৈরশাসকরা পাকিস্তানপন্থী হওয়ায় ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। ফলে ১৯৯৬ পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয় ভারতের সঙ্গে পুনঃসম্পর্ক স্থাপনের জন্য। সে সময় প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা পুরোনো সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করেন। আর ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারতই হয়ে ওঠে বন্ধু রাষ্ট্রের অন্যতম দৃষ্টান্ত।
এ জন্য দেখা যায়, ২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের আগে সীমান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য সংবিধান সংশোধনী বিল পেশ এবং ৬ মে রাজ্যসভায় তা পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। একাত্তরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যে উচ্চতায় উঠেছিল, ওই বিল পাস হওয়ায় সেই সম্পর্ক আবার সেই উচ্চতায় পৌঁছেছে। রচিত হয়েছে সহযোগিতা ও বন্ধুতার এক নতুন সংজ্ঞা। এত দিন ছিটমহলবাসীর কোনো রাষ্ট্র ছিল না; এখন স্থলসীমান্ত নির্দিষ্ট হওয়ায় নিজেদের পরিচয় বিকশিত হয়েছে। আর বিলটি পাস হওয়ায় ১৯৭৪ সালের বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরা গান্ধী চুক্তি বাস্তবায়নের সব বাধা দূর হয়। উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব গ্রহণ করেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি একাধিকবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ ব্যাপারে আশ্বাসও দেন। একই আশ্বাস দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন ভারতের বিশিষ্টজনরা এককথায় স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় বন্ধু। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের সবচেয়ে বড় মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলের ১৯৭৪ সালের চুক্তি ও শেখ হাসিনার আমলের ২০১১ সালের প্রটোকল চুক্তি অনুযায়ী ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসান হয়েছে। এর ফলে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও উগ্র সন্ত্রাসবাদীদের চলাচলও ঠেকানো যাচ্ছে।
যদিও বিএনপি-জামায়াত সব সময় ভারতের বিরোধিতা করে আসছে, তবু আমরা বিশ্বাস করি প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তা পারস্পরিক আস্থা ও মর্যাদার ভিত্তিতে হওয়া দরকার। সমুদ্রসীমার রায় পাওয়ার পর তিস্তার পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যাসহ দুই দেশের মধ্যকার সমস্যাগুলোর সম্মানজনক সমাধান হবে বলে আশা করছি। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ (বাধ্যবাধকতামূলক শর্ত) রাখার দাবি জানিয়েছেন কেউ কেউ। তবে দুই দেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হলে যেকোনো চুক্তি ফলপ্রসূ হবে। কেউ কেউ বলছেন, চুক্তি করে বাংলাদেশ কখনো লাভবান হয়নি। পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে ফারাক্কা ইস্যুতে ভারতের উদারতার অভাব রয়েছে। সেই বাঁধের প্রভাবে বাংলাদেশের ২০টি নদী আজ মৃত। পানিকে ঘিরে টানাপড়েনের অবসান চান সকলে। আমরা মনে করি, ‘ভারত প্রতিবেশীকে ছাড় দেয় না’—এটা এই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। শেখ হাসিনার সফরের সময় দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। দুই পক্ষ লাভবান হবে বিভিন্ন চুক্তিতে। শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় দুই দেশের অনেক দিনের সমস্যাগুলো সমাধান হয়েছে এবং আরো হতে যাচ্ছে।
শেখ হাসিনার ভারত সফরের মধ্য দিয়ে সীমান্তের নিরীহ মানুষ হত্যা বন্ধ হবে এবং পানির ন্যায্যহিস্যা প্রাপ্তি ঘটবে, বাংলাদেশ-ভারতের সুসম্পর্কের প্রধান প্রত্যাশা এটাই। মোদি সরকার এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। মোদি সরকার বাংলাদেশ সফরের সময় খালি হাতে আসেননি। বিশেষত, তিস্তা চুক্তি এবং বাণিজ্যিক অসাম্য দূর করার প্রচেষ্টা ছিল তাঁর সরকারি সফরের মুখ্য উদ্দেশ্য। যদিও সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। আসলে শেখ হাসিনা সরকার ভারতের পরম বন্ধু, এটি প্রতিষ্ঠা করতে পরস্পরের আস্থা বিশ্বাস আরো দৃঢ় করতে হবে। এ জন্য মানবিক হতে হবে মোদি সরকারকে। বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপনই হোক উভয় দেশের সম্পর্কের মৌল স্তম্ভ।
লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

মিল্টন বিশ্বাস