সর্বজনীন উৎসব হয়ে উঠুক পয়লা বৈশাখ
মুসলমানদের বাংলা নয়, হিজরি নববর্ষ পালন করা উচিত বলে মন্তব্য করেছে হেফাজতে ইসলাম। ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেছেন, ‘মুসলমানরা বাংলা বর্ষবরণ করবে, হিজরি বর্ষবরণ কেন করবে না? বাংলা নববর্ষ মুসলমানদের জন্য নয়, হিজরি নববর্ষ মুসলমানদের উৎসব।’ এ তো গেল একটা ব্যাখ্যা। পয়লা বৈশাখ ঘিরে আমাদের মধ্যে নানা রকম ব্যাখ্যা দেখতে পাই।
কেউ বলছেন, বছরের এই একটা দিন বাঙালিয়ানা না দেখিয়ে, পুরো বছরই তা ধারণ করা উচিত। কারও ব্যাখ্যা, ৩৬৫ দিনেই তো আর বৈশাখী উৎসবের মতো আমেজে মেতে থাকা সম্ভব নয়। একটা দিন উপলক্ষ মাত্র। সবার সঙ্গে মিশে যাওয়ার। সর্বজনীন উৎসবটাকে সর্বজনীনভাবেই পালন করার। আর সংস্কৃতি মানে তো কেবল পোশাক কিংবা খাবার নয়, তার সঙ্গে আচরণ, মূল্যবোধ, চিন্তা—সবকিছু মিলিয়ে। তাই উৎসব একটা দিনের হলেও সেই চেতনাটাকে ধারণ করতে পারি বছরজুড়েই।
কেউ বলছেন, পয়লা বৈশাখে ইলিশ খাওয়ার কোনো মানে নেই। ইলিশের সঙ্গে বৈশাখের কোনো সম্পর্ক নেই। আবার কারও কারও যুক্তি, যত দামই হোক, পান্তার সঙ্গে ইলিশ লাগবেই। কেউ পয়লা বৈশাখের প্রস্তুতি হিসেবে আলপনা, দেয়ালচিত্রসহ নানা রকম আয়োজনে ব্যস্ত। কেউ আবার রাতের আঁধারে নববর্ষের দেয়ালচিত্রে এঁকে দেয় পোড়া মবিলের দাগ। তবে সেটা আয়োজন ও উদ্যোগকে এতটুকুও দমিয়ে রাখতে পারেনি। পোড়া মবিলে নষ্ট করে দেওয়া বৈশাখী দেয়ালচিত্রে নতুন করে কিছু আঁকা হয়নি। সেটি রেখে দেওয়া হচ্ছে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে।
সবই ঘটছে, সবই হচ্ছে পয়লা বৈশাখ ঘিরে।
সমান্তরালভাবে বেড়ে উঠছে দুটি শ্রেণি। এক শ্রেণির কাছে, এই উৎসব অন্তর্জ্বালা সৃষ্টিকারী একটা আয়োজন। তাই তারা যতভাবে সম্ভব নববর্ষ উদযাপনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়। অন্তর্ঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করে। যার অংশ হিসেবে কখনো কখনো উৎসবে বোমা হামলাও চালায়। তাদের মতে, নববর্ষ উদযাপনের যে রীতি চলে আসছে, তা ধর্ম পরিপন্থী। তাই এ উৎসবে যেভাবেই সম্পৃক্ত হোন না কেন, ধর্ম বিরোধিতার তকমা পড়বেই আপনার সঙ্গে।
তবে আরেক শ্রেণি মনে করে, ধর্ম কখনো শিল্পের বিপক্ষে নয়; বরং বাঙালির অন্যতম সর্বজনীন উৎসব পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ উৎসব। তাই তো সংস্কৃতির এই উৎসবের সঙ্গে মিশে গিয়ে যে প্রাণের উচ্ছ্বাস, তা কোনো ষড়যন্ত্রে থেমে থাকে না।
আয়োজনে ভিন্নতা থাকলেও শহর কিংবা গ্রামের মানুষের কাছে পয়লা বৈশাখের আবেদন সমান। গ্রামের খুব সাধারণ মানুষেরও চেষ্টা থাকে, দিনটিতে সামর্থ্যের মধ্যে ভালো কিছু খাওয়ার। কোনো ভিত্তি না থাকলেও তাঁদের অনেকেই মনে করেন, বছরের প্রথম দিনটাতে ভালো কিছু খেলে সারা বছরই সেটা ঘটে। বিশ্বাস যা-ই থাক, তবে উদযাপনের বিষয়টা অবশ্যই ইতিবাচক। চিরায়ত ঐতিহ্যের চর্চার বিষয়টা অন্তত ইতিবাচক।
তবে সবকিছুর মধ্যেও কিছু বিষয় বেশ ভাববার। নববর্ষ ঘিরে আমাদের গ্রামীণ মেলা, যাত্রা, লোকগান, পুতুলনাচের মতো ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো আজ একরকম বিলুপ্তির পথে। বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগে হয়তো কোথাও কোথাও এগুলোর আয়োজন করা হয়। তবে আগের মতো ব্যাপ্তি নেই, সীমিত। নগর-সংস্কৃতির প্রভাব হয়তো এর জন্য দায়ী। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অন্তত দেশব্যাপী বিলুপ্ত হওয়া এই উপাদানকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।
যুগ যুগ ধরে চিরায়ত বাংলায় উত্থান-পতনের ডামাডোলেও ঘুরে দাঁড়ানোর দ্রোহচেতনা জাগায় নববর্ষ। আমাদের নববর্ষ যেভাবেই সৃষ্ট হোক না কেন, এ দেশের বৈশাখ রক্তের পরমাণুতে মিশে ঐতিহ্যের গর্ব উচ্চারণ করুক অনন্তকাল।
সারা দেশে বাংলা নববর্ষ এবার কোনো রকম বিঘ্ন ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হোক। মানুষ তাঁদের সাধ্যের মধ্যে নির্মল আনন্দ-উৎসবে দিনটি অতিবাহিত করুক। বাঙালিত্বের চেতনা এই একটি দিনের পরিধি ছাড়িয়ে সম্প্রসারিত হোক বছরব্যাপী। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।
লেখক ও সাংবাদিক

জয়ন্ত কর্মকার