গণপরিবহন
সিটিং বাস ও শুভঙ্করের ফাঁকি
বাঙালি হিসেবে রোজকার নানামুখী বিশৃঙ্খলা এখন আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। তবে সইতে গিয়ে মানুষকে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বুঝি দিতে হচ্ছে সড়ক চলাচলে। নৌরুটে পিনাকের মতো লঞ্চ ডুবি কিংবা হালের বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজের নাট বল্টু খুলে যাওয়া, রানওয়ে থেকে ছিটকে গিয়ে ধান ক্ষেতে মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা সচরাচর ঘটে থাকে। কিন্তু সড়ক পরিবহনে হেন ঘটনা নেই যা ঘটে না। এককথায় পরিবহন সংশ্লিষ্টদের হাতে মানুষ পুরোমাত্রায় জিম্মি। অবস্থাটা এমন যে, ওরা যেমন খুশি আমাদের তেমন নাচাবে।
এরই মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দিলেন আইনের মাধ্যমেই পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে । তিনি জানিয়েছেন, এখানে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। রাজধানীতে সপ্তাহখানেক ধরে বাসের ‘সিটিং সার্ভিস’ বন্ধসহ যানবাহনের বাম্পার অপসারণ ও অন্যান্য অনিয়ম বন্ধে অভিযান চলছে এবং পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরে না আসা পর্যন্ত এমন ধারার অভিযান চলবে। সবাই নিয়মের মধ্যে এলে কোনো সমস্যাই হবে না এবং যাত্রীদের ভোগান্তি দূর করতেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতমন্ত্রী। সেইসঙ্গে ‘সিটিং সার্ভিসে’র নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ফন্দি রুখতেই তা বন্ধ করার কথাও বলেছেন তিনি।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এতটা বছর ধরে রাস্তায় গাড়ি চলছিল কি বেআইনিভাবে? না বিষয়টা এমন না। বাংলাদেশের মোটরযান আইন অনুসারে ‘সিটিং সার্ভিস’ বলে কিছু নেই। চালক-মালিকরা তাদের সুবিধামতো অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ফন্দি হিসেবে ‘সিটিং সার্ভিসে’র মতো ব্যতিক্রমী ‘ইনোভেশন’ দেখিয়ে আসছেন। সেটা আইন প্রণেতাদের অগোচরে হয়েছে এমন কথা অবিশ্বাস্য। কাজেই এখন নতুন আইন দেখিয়ে বিশৃঙ্খলার রাশ টানবেন, তা হবেই, এমন আস্থাও কারো থাকবার কথা নয়!
সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক সড়ক পরিবহন সমিতি গেল ৪ এপ্রিল সভা করে জানিয়েছিল, ১৫ এপ্রিলের পর যাত্রীদের কাছ থেকে কোনোভাবেই অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া যাবে না। ভাড়ার তালিকা বাসের ভেতর দৃশ্যমান স্থানে টাঙিয়ে রাখতে হবে। ছাদের ওপরে ক্যারিয়ার, সাইড অ্যাঙ্গেল ও ভেতরের অতিরিক্ত আসন খুলে ফেলতে হবে। প্রতিটি বাস ও মিনিবাসে নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা আসন সংরক্ষণ করতে হবে। এক মাসের মধ্যে রংচটা, রংবিহীন, জরাজীর্ণ বাস মেরামত করে রাস্তায় নামাতে হবে। এসব কথার ছিটেফোটাও এখনো কেউ মানছে না।
মন্ত্রী বা সড়ক আধিকারিকরা দামি গাড়িতে করে ঘুরে বেড়ান, প্রান্তিক চালকের ভাড়ার তালিকা টাঙিয়ে রাখার বাধ্যবাধকতা অথবা অতিরিক্ত ভাড়ার বিবিধ ফন্দির সরেজমিন খোঁজ নেওয়ার ‘টাইম’ তাঁদের কোথায়? তা ছাড়া সড়ক থেকে বিপথে আদায়কৃত অর্থ ডানহাত বামহাত হয়ে আধিকারিকের কোষাগারের সুরক্ষিত ভল্টে পৌছে না, এমনটা কে দাবি করতে পারেন?
বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) নাজমুল আহসান মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বাস মালিক সমিতির নেতারা আমাদের কথা দিয়েছেন, এখন থেকে বাড়তি ভাড়া তাঁরা নেবেন না। সব বাসে ভাড়ার তালিকা থাকবে। আমরা অভিযানে এ বিষয়গুলো দেখছি। এ ছাড়া বাম্পার, ক্যারিয়ার আছে কি না, সেটাও দেখা হচ্ছে। আমরা আশা করছি, নিয়মিত অভিযান চললে শৃঙ্খলা ফিরবে।’
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখন আর দরজা বন্ধ করা ‘সিটিং সার্ভিস’ বলে কিছু নেই সত্য। কিন্তু গাড়িগুলো যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে, দরজা পর্যন্ত ঝুলিয়ে যাত্রী বহন করছে এবং ভাড়া রাখছে সেই আগের দরেই। বিপাকে পড়েছেন কর্মমুখী নারী, বৃদ্ধ ও স্কুলগামী শিশুরা। এখন সবাই বলছেন, তাহলে তো অবৈধ হলেও আগের সিটিং সার্ভিসই ভালো ছিল। কারণ এখন সিটিং সার্ভিসের ভাড়া গুনে তাদের দিব্যি লোকাল বাসে চড়ে গাদাগাদি করে চ্যাংদোলা হয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিয়ে বুঝি এটাকে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো বলে?
সড়ক বিশেষজ্ঞরা বরং মনে করতে বাধ্য হচ্ছেন, এসব অভিযান আসলে নতুন কিছু ‘ইনোভেশন’ আমদানির ফন্দি। প্রেক্ষাপট তৈরি করা হচ্ছে, ভোগান্তি বাড়িয়ে দিয়ে তা সমাধানের নামে বিআরটিএ কিংবা সরকার ঘনিষ্ঠ পরিবহন ব্যবসায়ীরা নতুন সার্ভিস চালু করবার কথা বলবে। মধ্যম আয়ের দেশে টাকা কোনো ব্যাপার না। সেসব স্পেশালাইজড ট্রান্সপোর্ট সেবায় পাবলিকের কাছে যা ভাড়া চাওয়া হবে তারা তাই দিতে বাধ্য থাকবে। টাকা দিয়ে হলেও মানুষ এখন শান্তি ও স্বস্তি কিনতে চায়। আর নীতিনির্ধারকরাও এটা ভালো করেই জানেন।
দেশে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর নেতৃত্বে চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ ৪৪ সদস্যের জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল রয়েছে। সদস্যদের নিয়ে দুই মাস অন্তর সভা হওয়ার কথা। কিন্তু গেল চার বছরে দু-তিনটির বেশি বৈঠক তাঁরা করতে পারেননি। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে কাউন্সিলের হাতে অগাধ ক্ষমতা ছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে যথাযথভাবে সিদ্ধাস্ত বাস্তবায়ন করছে না তারা।
তাহলে সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে আইনের কথা বলে কী লাভ? নিজে না বদলিয়ে হাজারটা আইনের বদল ঘটালেও অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো যাবে না। পরিবহনে সিটিং বা চিটিং না হয় বন্ধ করলেন, কিন্তু শুভঙ্করের ফাঁকিটা যে রয়েই যাচ্ছে, তার কী হবে?
কাজেই ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সততা আর সদিচ্ছা যত দিন না আমরা আত্মস্থ করতে পারব, যত দিন না লোভের পোকারা আমাদের মস্তিষ্ক ছেড়ে যাবে, যত দিন না মানুষ হয়ে উঠবার ব্রতে ব্রতচারী হয়ে উঠতে পারব, তত দিন পর্যন্ত আসলে আমাদের কাজের চেয়ে কথারাই বড় হয়ে থাকবে। এই দেশে আদৌ কি ‘কথা’র চেয়ে ‘কাজ’ বড় হবে? জানা নাই।
লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন

ফারদিন ফেরদৌস