প্রতিক্রিয়া
ধর্ষকের দালালদের বলছি
কয়েক দিন ধরে প্রিন্ট, টিভি, অনলাইন মিডিয়া বলেন বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম বলেন, সবখানে খবরের মধ্যে বড় একটা জায়গা দখল করে আছে ধর্ষণের খবর। হঠাৎ করেই যেন ধর্ষণ বেড়ে গেছে। সম্প্রতি অভিজাত একটি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্রীকে ধর্ষণ করা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমগুলো সরগরম। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সন্তানরা এই ধর্ষণে অভিযুক্ত বলে শোনা যাচ্ছে। এর কয়েক দিন আগে ছিল গাজীপুরে আট বছর মেয়ের ধর্ষণের বিচার না পেয়ে বাবা আলীর আত্মহত্যা। মুক্তাগাছায় মসজিদের ভেতর ইমাম কর্তৃক কিশোরী ধর্ষণ, রাজধানীতে মাদ্রাসায় বালক ধর্ষণ ইত্যাদি। তো, যখনই এমন ধরনের ঘটনা ঘটে, তখনই প্রতিবাদের পাশাপাশি নানা মহল থেকে ইনিয়ে-বিনিয়ে ধর্ষণের জন্য ভুক্তভোগীদের দোষারোপ করা হয়, দায়ী করা হয় মেয়েদের চলাফেরা আর পোশাককে।
তাদের বলা হয়, মেয়েরা তোমরা তোমাদের শরীরে পরতের পর পরত কাপড় জড়িয়ে নাও। সিলগালা করে রাখো নিজেকে। শরীরের কোনো অংশ অনাবৃত রাখার অধিকার তোমার নেই। কারণ, তোমার শরীর তোমার নয়। তুমি মানুষ নও, তুমি ‘মাল’। তোমাকে দেখে কোনো কামুকের কামভাব প্রবল হলে সে দায় তার নয়, সে দায় তোমার। কী অদ্ভুত আর হাস্যকর যুক্তি, তাই না?
আমার যুক্তি হলো, কোনো মেয়ে কী পোশাক পরে রাস্তায় ঘুরবে, সেটা তার রুচির বিষয়। সে কখন কোথায় যাবে, সেটাও তার প্রয়োজন আর ইচ্ছা। এখন তাকে দেখে যদি কোনো পুরুষের কামভাব মাথাচাড়া দেয়, তাহলে সেটা সামলানোর দায় ওই পুরুষেরই। মেয়েটির নয়। আর যে পুরুষ নিজেকে সংযত রাখতে পারে না, সে আসলে পুরুষ নয়—পশু।
ইসলামে পর্দা শুধু নারীদের নয়, পুরুষকেও পর্দা করতে বলা হয়েছে। যাঁরা মনে করেন, নারী পর্দা না করলে পুরুষের কাজ ধর্ষণ করা, তাঁদের জন্য এই হাদিসগুলো মুখস্থ করা জরুরি। পুরুষদের পর্দার বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন,
‘হে নবী! মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনমিত রাখে এবং যৌন পবিত্রতা রক্ষা করে চলে। এটাই তাদের জন্য পবিত্রতম পন্থা। নিশ্চয়ই তারা যা কিছু করে আল্লাহ তা অবহিত। (সূরা আননূর : ৩০)
জারির ইবনে আবদিল্লাহ বাজালি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কোনো নারীর প্রতি হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে যাওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, সাথে সাথেই দৃষ্টি সরিয়ে নেবে (সহিহ মুসলিম)।
বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আলী (রা.)-কে বললেন, হে আলী! দৃষ্টির ওপর দৃষ্টি ফেলো না। হঠাৎ যে দৃষ্টি পড়ে ওটা তোমার ক্ষমার্হ; কিন্তু পরবর্তী দৃষ্টি তোমার জন্য ক্ষমাহীন পাপ [হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আবু দাউদ (রহ.)]।
কয়েক দিনে এসব খবরে খুব অস্থির লাগছিল। কী হচ্ছে এসব? গতকাল বিকেলে ফেসবুকে কুকুর-সংক্রান্ত একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম, সেখানে কোথাও পুরুষ শব্দটি লিখিনি। কিন্তু খুব অদ্ভুত ব্যাপার হলো কিছু সংখ্যক লোক ধর্ষকদের পক্ষ নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করলেন। মেয়েরা খারাপ, তারা যায় কেন? মেয়েরা কুকুরী, আমি কেন এত অশ্লীল কথা লিখলাম ইত্যাদি। যেসব বন্ধু সভ্য, জ্ঞানী, যাদের বোন বা মা প্রিয়, তাঁরা বুঝে গিয়েছেন যে বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেন এই ধরনের ক্ষোভ? ৬ তারিখে এক মা মেয়ের উত্ত্যক্তকারীকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছেন, কিন্তু কেন? কোন ক্ষোভ থেকে? কোনো মা চায় না, তার মেয়ে আর একজন তনুর পরিণতি পাক।
প্রতিদিন খবর দেখে মনে হয়, যেন ধর্ষণের মহোৎসব চলছে। আমরা জানি, কুকুর কার্তিক মাসে উন্মাদ হয়ে থাকে। তো, এখন কোন মাস যে কিছু কিছু পুরুষ কাম প্রভাবে এমন উন্মাদ হয়ে উঠেছে? আর সেই প্রশ্ন যদি আমি করি, সেটা অশ্লীল হয়ে উঠল? সেটা অন্যায় হলো? মেয়ে রাস্তায় বিবস্ত্র হয়ে ঘুরুক, তাতে ধর্ষণের অবাধ অধিকার পেয়ে গেল এসব কামুক পুরুষ? ওই মেয়েরা হোটেলে গিয়েছিল বলেই দল বেঁধে ধর্ষণ করতে হবে? ওই আট বছরের ছোট্ট বালকটি শরীরের কোন অংশ অনাবৃত রেখেছিল বলে পাষণ্ডদের শিশ্ন উত্তেজিত হয়েছিল? একজন ডাক্তার লিখেছেন, এক মা তাঁর পাঁচ বছরের শিশুকে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে এসেছেন কারণ, তাঁর শিশুটিকে একজন ডিগ্রি পড়া যুবক ধর্ষণ করেছে। শিশুটির যোনী ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। যেখানে অনেক সেলাই দিতে হয়েছে। ওই শিশুটি কোন পোশাক পরে যুবকটিকে উত্তেজিত করেছিল? ভাবুন, আপনার কন্যা বা ছোট্ট পাঁচ বছর বয়সী বোনের কথা। ডাক্তার সাহেব বলেছেন, ছয় মাসে তিনি এমন তিনজন শিশুর চিকিৎসা দিয়েছেন। সব খবরে আসে না। বুঝতে পারছেন কিছু?
এসব অমানুষের পক্ষে যাঁরা দালালি করছেন, ধর্ষণকে যাঁরা হালাল করতে চাইছেন, তাঁরাও আমার চোখে এক অর্থে ধর্ষক। আপনারা শিশুদের পর্যন্ত ছাড়বেন না আর আমরা কবিতা রচনা করব, তাই তো? আপনার উত্তেজিত শিশ্নকে শান্ত করতে একটা শিশুকে ধর্ষণ করে তার সমস্ত নারীত্বকে ধ্বংস করবেন আর আমরা বলব বাচ্চা মেয়েরা তোমরা হিজাব পর, তাহলে তোমাদের আঙ্কেলগণ রেপ করবে না? অশ্লীল আমার ওই স্ট্যাটাস নাকি আপনার মানসিকতা? কোন ধরনের মানসিকতায় আপনি ধর্ষকদের সাফাই গাইছেন, নাকি নিজেদেরও এই ইতিহাস আছে? মেয়েদের পোশাকের দোহাই দিয়ে ধর্ষকদের পক্ষে যাঁরা দালালি করবেন আল্লাহ না করুন, তাঁরা সেদিনই রাস্তায় আসবেন যেদিন দেখবেন নিজের কাছের কোন আত্মীয়া ধর্ষিত হয়েছেন। আমাকে কী বলতে হবে, কী করতে হবে সেটুকু বোঝার জ্ঞান আমার আছে। নিজে কী বলছেন, সেটা ভেবে বলছেন তো? বলার আগে ভাবুন। আমার কন্যাসন্তান নেই, তবুও কন্যাদের এ অবস্থায় দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। কায়মনে দোয়া করি, আমার পুত্রেরা যেন ধর্ষক শ্রেণির না হয়, বা আপনাদের কারো কারো মতো ধর্ষকের দালাল না হয়।
লুতুপুতু কবিতা লিখে বা প্রেমের গল্প লিখে নিজের পরিচয় দাঁড় করিয়ে দেওয়ার আগে আমি একশ গুণ বেশি পছন্দ করব নিজেকে নারী এবং সর্বোপরি একজন মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে। আমার পাশে আমার বোন ধর্ষিত হবে, আমার মেয়ে ধর্ষিত হবে আর আমি উট পাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে বই পড়ব, তেমন বড় সুশীল আমি নিশ্চয় নই। আমি মানুষ, স্রেফ ক্ষুদ্র একজন মানুষ।
লেখক : গল্পকার এবং প্রভাষক

ম্যারিনা নাসরীন