অভিমত
সরকারের অর্জন ম্লান করতে এ বাজেটই যথেষ্ট
একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকার বেশ উত্তেজনার মধ্যেই আছে, বিষয়টি বোঝা যাচ্ছে সাংসদদের কথাবার্তা থেকে। তাঁরা বলছেন, এবার অর্থমন্ত্রী যে বাজেট ঘোষণা করেছেন তাতে সাধারণ মানুষ সরকারের ওপর নাখোশ হবেন। কারণ এ বাজেট পাস হলে তাদের দৈনন্দিন জীবনে নাভিশ্বাস উঠবে। ১৫ শতাংশ ভ্যাটের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে যাবে। ঘর ভাড়া থেকে শুরু করে নির্মাণসামগ্রীর দামও বেড়ে যাবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব এরই মধ্যে দেওয়া হয়েছে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ভোটের সময়। সাংসদরা এলাকায় গিয়ে কোন মুখে ভোট চাইবে জনগণের কাছে।
কঠিন বাস্তব সত্য হলো, অধিকাংশ সাংসদেরই তৃণমূলের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। পাস করে এলাকার মানুষের খোঁজখবর রাখার প্রয়োজন মনে করেননি। তাঁরা যখন এলাকায় যাবেন ভোট চাইতে, তখন সাধারণ মানুষ এমনিতেই তাঁদের ওপর নারাজ, তার ওপর যদি অর্থমন্ত্রীর এবারের বাজেটের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়, তা হলে আর হাসিমুখে কথা তো বলবেই না, শব্দ করেই দরজা লাগিয়ে দিতে পারে।
এসব কথা ভেবেই সংসদ থেকে শুরু করে সরকারের যে কোনো সভায় সাংসদরা অর্থমন্ত্রীকে কিছুটা নমনীয় হওয়ার জন্য অনুরোধ করছেন। যেমন গত ১২ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় সরকারদলীয় সাংসদ আবদুল মান্নান আবগারি শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানান। তিনি এ সময় অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, এখানে জেদ ধরার বিষয় নেই। আওয়ামী লীগ মানুষের রাজনীতি করে। মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কাজ করছেন। মানুষ এ শুল্ক চায় না।
সরকারি দলের এ কে এম এ আউয়াল বলেন, গ্রামের নারীরা এক লাখ, দুই লাখ টাকা ব্যাংকে জমা রাখেন। এ অবস্থায় শুল্ক বাড়ানো হলে নির্বাচনের আগে এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হবে। যেটাতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা রাখার যুক্তি নেই।
ওয়ার্কার্স পার্টির সাংসদ ইয়াসিন আলী বলেন, এ বাজেটের নেতিবাচক দিক হলো আশ্বাস দেওয়ার পরও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ১৫ শতাংশই রাখা হয়েছে। তিনি মূসক ১০ শতাংশ করা, আবগারি শুল্ক বাড়ানো ও সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানোর প্রস্তাব থেকে ফিরে আসার জন্য অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রংপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এবারের বাজেট নির্বাচনী বাজেট হওয়া উচিত ছিল। তা না করে এমন একটা বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে, যা দেশের মানুষ গ্রহণ করেনি। এ বাজেটে কেউ খুশি নয়। বাজেটে বাড়তি করের বোঝা চাপানোর ফলে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। জনগণের জীবনযাত্রা আরো কঠিন করে তোলা হয়েছে।
এসব থেকেই বোঝা যাচ্ছে সরকারের কাছের লোকজন চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু অর্থমন্ত্রী তাঁর জায়গা থেকে একচুলও নড়বেন না, এ রকম একটা ভাব নিয়েই আছেন, মনে হচ্ছে। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ‘রাবিশ’ শব্দটি এরই মধ্যে প্রয়োগ করেছেন বাজেট নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সমালোচনা করায়।
তা হলে, আওয়ামী লীগের ভিশন ২০২১-এর কী হবে?
এমনিতেই সাধারণ মানুষ নানা কারণে সরকারের ওপর বিরক্ত। এ সরকারের আমলে কয়েক দফায় বিদ্যুৎ বিল বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো হলো দুই দফায় গ্যাসের দাম। চালের দাম বেড়ে কোথায় গিয়ে ঠেকবে কেউ জানে না। আগামী ১ জুলাই থেকে ভ্যাট কার্যকর হলে হলুদ মরিচসহ সব ধরনের মসলার দাম বেড়ে যাবে।
আওয়ামী লীগের আগামী নির্বাচন কেমন হবে? আদৌ নির্বাচন হবে কি না , নির্বাচনে বিএনপি আসবে কি না, এ নিয়ে অনেক কথাবার্তা চলছে। এ রকম মুখরোচক রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
তাই তারা ঈদের পরেই নির্বাচনকে সামনে রেখে দল গঠনে নামবে আওয়ামী লীগ।
যদি তাই সত্য হয়, তা হলে তো অর্থমন্ত্রীর এই গোঁ ধরা ভাব ভোটের রাজনীতিতে বিরাট প্রভাব ফেলবে, সন্দেহ নেই। এখন সুষ্ঠু নির্বাচন হলেই সাধারণ মানুষ তাদের মনের ক্ষোভ মেটাতে ঠিক কাজটি করবে ব্যালটের মাধ্যমে।
এবারের বাজেটের প্রতিফলন দেখা যাবে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী, আপনি গোঁ ধরেই থাকুন, আমরা দেখব আওয়ামী লীগের পরাজয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনেক অর্জন ম্লান করে দেওয়ার জন্য এ রকম বাজেটই যথেষ্ট।
লেখক : ছড়াকার ও সাংবাদিক।

সারওয়ার-উল-ইসলাম