টাম্পাকো থেকে মাল্টিফ্যাবস
বাড়ছে গ্লানির মিছিল
রানা প্লাজা, তাজরীন ফ্যাশন, টাম্পাকো হয়ে এবার তৈরি পোশাক কারখানা মাল্টিফ্যাবসে ঘটল বড় দুর্ঘটনা। ব্যাপক প্রাণহানি আর অসহায় শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের করুণ কান্নায় আবার ভারি গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল। শ্রমিকদের সুরক্ষা ও তাঁদের জন্য অনুকূল কর্মপরিবেশ নির্ধারণে সরকারিভাবে শ্রম আইন বলবৎ আছে।
কিন্তু মানুষকে রক্ষার জন্য যে মানবিকতা, ভালোবাসা, ঔদার্য আর সদিচ্ছা থাকা দরকার, তার বড় অভাব এই বাংলাদেশে। লোভে পড়ে মানুষ জলাভূমি ভরাট করে রানা প্লাজা বানায়, ফায়ার ফাইটিংয়ের ব্যবস্থাপনা ছাড়াই কারখানা বানায়। আর এবার মেয়াদোত্তীর্ণ বয়লার বিস্ফোরণে প্রাণ গেল অসহায় শ্রমিকের। আহত হয়ে হাসপাতালে জীবনের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে অর্ধশত মানুষ।
ঈদের ছুটির পর গাজীপুরের নয়াপাড়া এলাকায় শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা মাল্টিফ্যাবস লিমিটেডের খোলার কথা ছিল ৪ জুলাই মঙ্গলবার। এ জন্য আগের দিন থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছিল কারখানা কর্তৃপক্ষ। সোমবার দুপুরের পর ডাইং ইউনিটের বয়লার সেকশনটি চালু করা হয়। এতে ২৫-৩০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে বয়লারটির বিস্ফোরণ ঘটলে চারতলা ভবনের নিচতলা ও দোতলার দুই পাশের দেয়াল, দরজা-জানালা ও যন্ত্রাংশ উড়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলেই মারা যান পাঁচ/ছয়জন বয়লার শ্রমিক। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। সর্বমোট ১৩ শ্রমিক এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। এতে কারখানার শ্রমিক ছাড়াও সামনের রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী অর্ধশত লোক আহতও হন।
ঘটনার পর যথারীতি জেলা প্রশাসনের তরফে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসও তাদের মতো করে তদন্ত কমিটি করেছে। কিন্তু যা কিছুই করা হোক না কেন, হারানো প্রাণ কি আর ফিরিয়ে আনা যাবে? পথে বসে যাওয়া শ্রমিকের পরিবার কি আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে? মা-বাবা তাদের বয়সকালের অবলম্বন আর শিশু পুত্র-কন্যারা কি তাদের আবদারের ভরসাস্থল বাবাকে কোনোদিন খুঁজে পাবে?
ঘটনার পর মধ্যরাতেই কারখানাটির চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দিন ফারুকী ঘটনাস্থলে আসেন। সেখানে এসে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বয়লারের যন্ত্রাংশ ভালো ছিল বলে দাবি করেন। তিনি নিহত ব্যক্তিদের প্রত্যেকের পরিবারের সদস্যকে তাঁর কারখানায় চাকরি দেওয়ার ঘোষণা দেন। এ ছাড়া আহত ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ চিকিৎসার দায়িত্ব নেবেন বলে জানান। কিন্তু পাঁচ/ছয় হাজার শ্রমিকের ভাগ্যনিয়ন্তা বয়লারটি যে গেল ২৪ জুন ২০১৭ তারিখে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে, সে কথা তিনি উচ্চারণ করবার সৎসাহস দেখাতে পারলেন না। এখন নয়নভরা জলের কান্না কি ১৩ শ্রমিকের অমূল্য প্রাণের সম্পূরক হবে? এই কারখানায় যদি সব শ্রমিক কাজে থাকা অবস্থায় বয়লার বিস্ফোরণ ঘটত, আগুন ধরে যেত, তবে কতটা মানবিক বিপর্যয় হতো, ভাবা যায়? বিকট শব্দের আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়েও মারা যেতে পারত বিপুল প্রাণ!
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ বলে একটি আইন দেশে বিদ্যমান আছে। সেখানে শ্রমিক ও কারখানার নিরাপত্তা বিধানে ব্যাপক ও বিস্তৃত আলোচনা আছে। ওই আইনের ধারা ৬১-এর উপধারা ১-এ বলা আছে, ‘যদি কোন পরিদর্শকের নিকট ইহা প্রতীয়মান হয় যে, কোন প্রতিষ্ঠানের কোন ভবন বা ইহার কোন অংশ অথবা ইহার কোন পথ, যন্ত্রপাতি বা প্ল্যান্ট এমন অবস্থায় আছে যে, ইহা মানুষের জীবন বা নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক, তাহা হইলে তিনি মালিকের নিকট লিখিত আদেশ জারী করিয়া, উহাতে উল্লিখিত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, তাহার মতে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন—উহা গ্রহণ করিবার নির্দেশ দিতে পারিবেন।’
কিন্তু মাল্টিফ্যাবস লিমিটেড কারখানার বয়লারটির মেয়াদ এক সপ্তাহ আগে শেষ হয়ে গেলেও সেটিতেই আবার ঈদের ছুটি শেষে কাজ করবার প্রয়াস নেয় কারখানা কর্তৃপক্ষ। বয়লারের মতো এতটা ঝুঁকিপূর্ণ একটি যন্ত্রাংশ চালাতে এমন দায়িত্বহীনতা কি মানানসই? প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কাছে দেশের সমস্ত কারখানার আপডেট ডাটা থাকবার কথা। এই কারখানার ক্ষেত্রে তাঁর কি কোনো কার্যকরী নির্দেশনা ছিল। যদি সব প্রশ্নের উত্তর না হয়। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষ ও বয়লার পরিদর্শন অধিদপ্তরকে কেন এই বিপুল প্রাণবিনাশের দায়ে অভিযুক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না?
সমস্যা হলো, বাংলাদেশে কারোরই কিচ্ছু হয় না, যায়-আসেও না। এক অন্ধকার নির্বিকারতার মধ্য দিয়ে চলছে এ দেশের আইনি কার্যক্রম। বৈশ্বিকভাবে ব্যাপক সমালোচিত মানবীয় বিপর্যয়ের ঘটনা হাজার প্রাণবিনাশী রানা প্লাজা ধসের চার বছর হলেও কাউকেও বিচার বা শাস্তির আওতায় আনা যায়নি। তাজরীন ফ্যাশন বা হালের টাম্পাকো ফয়েলস কারখানার অবস্থাও তথৈবচ। কাজেই মাল্টিফ্যাবসের ক্ষেত্রেও দায়িত্বজ্ঞানহীনদের বিচারের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক কিছু ঘটবে, যাতে অন্য কারখানা কর্তৃপক্ষ কিংবা সরকারি পরিদর্শন অধিদপ্তরগুলো শিক্ষা পায়, তেমন কিছুই উপলক্ষ করা যাবে না বলেই আমরা বিশ্বাস করি।
অতএব, অসহ্য বেদনার করুণ বিড়ম্বনা, অকালে বেঘোরে প্রাণপাত আর চরম বঞ্চনাই শ্রমিকের চিরায়ত ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ছিল আছে থাকবে। শ্রমিকের রক্ত-ঘামে মালিকেরা প্রাসাদ গড়েন, দেশ ওঠে যায় মধ্যম আয়ে উচ্চ আয়ে। আর শ্রমিক থাকে তার জন্য নির্ধারিত আজন্মের অতলান্তিক তিমিরেই।
সভ্যতার মাপকাঠিতে বিশ্বসভায় যদি ন্যূনতম যোগ্যতাও আমরা চাই, তবে এখনই বন্ধ করা হোক শ্রমিকের মৃত্যু শোকের গ্লানির মিছিল। শ্রমিক পাক ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ কর্মপরিবেশ। বৈশ্বিক মানদণ্ডে যথার্থ দাম পাক তাঁর শ্রম ও ঘামের। আর বড় মনের মানুষের মনেও এই প্রতীতি বসত গাড়ুক যে শ্রমিক আমার ভাই, আমার সন্তান, আমার স্বজন। সবার আগে রাষ্ট্র স্বীকার করুক, শ্রমিকও রাষ্ট্রনিয়ন্তাদের মতোই একজন মানুষ।
লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন।

ফারদিন ফেরদৌস