অভিমত
নৈতিক যোগ্যতা-অযোগ্যতার প্রশ্নে সাংসদ এনাম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান যে নিম্নমানের এ কথা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে প্রায়ই রাজনীতিবিদদের লাগামহীন বক্তব্য বিদ্যমান রাজনৈতিক অবস্থাকে আরো কলুষিত করে তোলে। আর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কর্তৃক সাধারণ জনগণ যখন প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকির শিকার হন তখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাত্রা নিয়ে আমরা আরো শঙ্কিত হই। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণ জনগণ যদি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা হামলার শিকার হন কিংবা তাঁকে ভয় পান তাহলে ওই রাজনৈতিক পরিবেশকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় ফেলা যায় না। সেটি কোনো অর্থেই গণতেন্ত্রর সংজ্ঞায় পড়ে না। যেহেতু জনগণের ভোটেই তাদের জনপ্রতনিধি হতে হয়। কাজেই সেক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের লক্ষ্য থাকা উচত জনকল্যাণসাধন।
কিন্তু জনপ্রতিনিধি যখন প্রকাশ্যে ক্রসফায়ারের খেলায় লিপ্ত হয় তখন বুঝতে হবে দেশের গণতন্ত্রের মাত্রা কেমন পর্যায়ে আছে। সম্প্রতি ঢাকা-১৯ আসনের (সাভার) সাংসদ এনামুর রহমান প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, ‘পাঁচজনকে ক্রসফায়ার দিয়েছি, আরো ১৪ জনের লিস্ট করেছি’। তাঁর এই বক্তব্যে একদিকে জনগণকে শঙ্কিত করে তুলেছে অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কারণ ক্রসফায়ার দিতে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শরণাপন্ন হতে হয়েছে। অবশ্য র্যাব-পুলিশ সাংসদের এই বক্তব্যের দায় নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আবার সাংসদও তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করেছেন। তবে ইতিমধ্যেই বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা বিভিন্নভাবে সম্ভাব্য ক্রসফায়ারের তালিকায় নিজেদের নাম আছে কি না, তা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করছেন। সাংসদের এই বক্তব্যের প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা হলো নাগরিক নিরাপত্তা। সাধারণ জনগণের জান-মাল যখন একজন সাংসদের কাছে নিরাপদ নয় তখন সাংসদেরও পদে থাকা না থাকার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যিনি নাগরিক নিরাপত্তাকে শঙ্কায় ফেলেন, তিনি নিঃসন্দেহে নৈতিকভাবে তাঁর যোগ্যতা হারান। তা ছাড়া এসব ক্ষেত্রে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে।
আমরা জানি সুশাসন প্রতিষ্ঠা বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অধ্যায়ে বলেছিল, ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা হবে এবং সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিষিদ্ধ হবে। একটি সর্বসম্মত আচরণবিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ দশম সংসদ নির্বাচনের আগেও আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল সুশাসনকে। সেখানে আরো একধাপ এগিয়ে, আরো স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে, সংসদের ভেতরে ও বাইরে সাংসদদের সামষ্টিক ও ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনানুগ বিধিবিধান করা হবে। সরকারের প্রদত্ত নির্বাচনী ইশতেহার এবং সাংসদ এনামের সাম্প্রতিক ক্রসফায়ার সম্পর্কিত বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে পরস্পরবিরোধী। তা ছাড়া একজন সাংসদ নির্বাচিত হয়ে শপথ নিতে নৈতিকভাবে নিজের অবস্থানকে সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার করেন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করাই তাঁর মূল নীতি হিসেব বিবেচিত হয়। কাজেই সাংসদ এনাম যে নৈতিকভাবে তাঁর যোগ্যতা হারিয়েছেন- এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘ক্রসফায়ার’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘এনকাউন্টার’-এর নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ অনেক পুরোনো। এরই মধ্যে সরকারদলীয় একজন আইনপ্রণেতার ক্রসফায়ারের তালিকা তৈরির ঘোষণা অত্যন্ত দুঃখজনক। সাংসদের এ বক্তব্য সংবিধানের মূলনীতির বিরুদ্ধে। তাঁর এই বক্তব্য প্রমাণ করে সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে শুধু তাঁদের শপথ গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়, এর জন্য দরকার সুনির্দিষ্ট আইন। সাংসদদের আচরণ আইনি বিধিবিধানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এমন লাগামহীন যাত্রা ভবিষ্যতে আরো বাড়তে পারে। অবশ্য সাংসদদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের বিধি প্রণয়নের উদ্দেশ্যে নবম সংসদে ২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারি সরকারি দলের সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী ‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন ২০১০’ শিরোনামে একটি বিলও এনেছিলেন। কিন্তু সেটি আলোর মুখ দেখেনি। বিলটিতে বলা ছিল, সংসদের ভেতরে সদস্যরা কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ীই চলবেন। তাঁরা আইন প্রণয়ন ও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন। তাঁরা নিজের বা অন্যের স্বার্থে অবৈধ ও অসৎ পথে যাবেন না। উল্লেখ্য, ব্রিটেন, ভারত, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকান পার্লামেন্টে সাংসদদের জন্য আচরণবিধি রয়েছে। এসব দেশে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে সাংসদদের সংসদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানে সাংসদদের মতামত প্রকাশের বিষয়ে ৭০ অনুচ্ছেদ দিয়ে সংসদে স্বাধীন মতামত প্রদানে বাধা সৃষ্টির বিধান রাখা হলেও আচরণ নিয়ন্ত্রণের কোনো বিধান নেই। কাজেই সম্প্রতি সাংসদ এনামের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই সরকারের ভাবা উচিত কীভাবে নির্বাচিত সাংসদদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ড. সুলতান মাহমুদ রানা