অভিমত
চিকিৎসক, রোগী এবং চিকিৎসাজনিত ভুল
চিকিৎসকের ভুলে বা অবহেলায় রোগী মৃত্যুর খবর আমরা বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত হতে দেখি। ওই দেখা অবধিই আমাদের সীমানা। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা জানতে পারি না উক্ত ঘটনায় চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত ভুল বা অন্যান্য বিষয় কতটা জড়িত ছিল। আর সেটা জানতে না পারার কারণেই আমাদের দেশে চিকিৎসা পদ্ধতি এবং চিকিৎসক সম্পর্কে নানা রকম বিভ্রান্তি সহজেই সমাজে আসন গেড়ে বসেছে। সে বিভ্রান্তি নিরসনকল্পে তাই চিকিৎসায় অবহেলাজনিত অভিযোগের সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য তদন্ত এবং সুরাহা হওয়া জরুরি। তাতে সামগ্রিকভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে তখন পারাস্পরিক আস্থা এবং বিশ্বাসও বৃদ্ধি পাবে।
আর চিকিৎসাক্ষেত্রে ভুল যেহেতু একটু গুরুতর বিষয় তাই আমার মনে হয় সেটা পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার আগে আরো সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কারণ এমন ঘটনা পত্রিকায় দেখার পর মানুষের আস্থা এবং বিশ্বাসে চিড় ধরে। তাই ধারণাগত কোনো অভিযোগের কারণে চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে যেন অহেতুক কোনো অনাস্থার সৃষ্টি না হয় সেটা খেয়াল রাখা সবারই দায়িত্ব। আবার অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি থাকলে সেটাও জনসমক্ষে আনা উচিত চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সতর্ক হওয়ার স্বার্থেই যেন তারা রোগীর চিকিৎসার ব্যাপারে আরো বেশি আন্তরিক হয়।
প্রয়োজনে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে রোগীকে ক্ষতিপূরণ দিতেও বাধ্য হন।
আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা কেউ কারো পতিপক্ষ নই। বরং সামগ্রিকভাবে একটা সুন্দর চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য পাশাপাশি থেকে নিজ নিজ দায়িত্বটুকু পালনে পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতা করাটাই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এটা শুধু স্বাস্থ্য সেক্টর নয় বরং সব সেক্টরের জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু মাঝে মধ্যে আমাদের ভাষা ও ভঙ্গি দেখলে মনে হয় আমরা চিকিৎসক, পুলিশ, সাংবাদিক, আইনজীবী, আমলা বা অন্যান্য পেশাজীবী যেন এক সেক্টর আর এক সেক্টরের পতিপক্ষ! আবার সব সেক্টর মিলেমিশে জনগণের প্রতিপক্ষ। এটা ভয়াবহ ব্যাপার কিন্তু। অনেকটা আগুন নিয়ে খেলার মতো বিষয়।
রোগীর চিকিৎসা বা অপারেশন চলাকালীন সময়ে চিকিৎসকের অবহেলা বা ভুল; যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় Professional Negligence বা “পেশাগত অবহেলা” সেটা আদৌ হয়েছে কি হয়নি বা হয়ে থাকলে তা কতটা গুরুতর হয়েছে সেটা নির্ধারণ করাটা খুবই জরুরি। একটা প্রফেশনাল টিম কর্তৃক তা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। বিশ্বব্যাপী সেটাই স্বীকৃত পন্থা।
অনেকে হয়তো জানে না যে আমাদের দেশে চিকিৎসা সংক্রান্ত অবহেলাজনিত অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য রয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল( BM&DC)। সেখানে এ ধরনের অভিযোগ দায়ের করা যায়। অথবা কেউ চাইলে তা সরাসরি আদালতেও করতে পারে। সেই ক্ষেত্রে মহামান্য আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী সবকিছু চলবে।
মনে রাখতে হবে BM&DC যেমন চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন দিয়ে থাকে তেমনিভাবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা বিচার করে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সে অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে বাতিলও করতে পারে। স্থায়ীভাবে যদি কোনো চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যায় তাহলে তিনি আর কখনই রেজিস্ট্রার্ড জেনারেল প্র্যাকটিশনার বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে চিকিৎসা দূরে থাক; পরিচয়ও দিতে পারবেন না। তার অর্থ হচ্ছে উক্ত চিকিৎসকের পেশাগত মৃত্যু ( Professional Death Sentence) হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে।
অনেকে হয়ো মনে করতে পারেন, আমাদের দেশে চিকিৎসকের অবহেলা প্রমাণিত হলে কী আর এমন কঠিন শাস্তি হবে? নাকি কোনদিন তা হয়েছে? উত্তর হচ্ছে, এ অবধি একজন চিকিৎসকের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত শাস্তি বা Professionsl Death Sentence হয়েছে।সম্প্রতি দুজন চিকিৎসকের ক্ষেত্রে তাদের রেজিস্ট্রেশন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে নির্দিষ্ট মেয়াদ অবধি। এ সময়ে তাঁরা কোনো রকম চিকিৎসা বা চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারবেন না।
তবে, অনেকে হয়তো বলতে পারেন পত্রিকায় চিকিৎসা সংক্রান্ত নানা অভিযোগ তো দেখে থাকি। শাস্তি তাহলে এত কম কেন? উত্তর প্রথমেই দিয়েছিলাম। আবারও একটু বলি। সেটা হচ্ছে অভিযোগ তুলতে আমরা যতটা সরব প্রমাণের জন্য আমাদের কেন যেন ততটা সরব দেখা যায় না! আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সেক্ষেত্রে শাস্তি কীভাবে হবে? বরং কোনো অভিযোগ থাকলে BM&DCতে সেটা করা উচিত।
সেটা যদি সম্ভব না হয় তাহলে সরাসরি আদালতে গিয়েও যে তা করতে পারেন সেটাও আগেই উল্লেখ করেছি। কারণ অভিযোগ নিয়ে তদন্ত হলে তা চিকিৎসক, রোগী এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান সবার জন্যই ভালো বলে আমার মনে হয়। এতে প্রত্যেকে নিজের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পায় এবং সে অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ বা করা বা না করা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়াও সহজ হয়। অহেতুক সন্দেহের অবকাশ তখন থাকে না।
দুঃখজনকভাবে অনেক সময় দেখা যায় রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা মৃত্যু হলে অনেকে তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে বিচ্ছিন্ন বা সংঘবদ্ধভাবে হাসপাতালে মারামারি, ভাঙচুর- এসব কাজে লিপ্ত হয়। তাতে সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা অন্য রোগীরাই আমার মনে হয় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় । কারণ পরিবেশ অস্থির হলে তা সুস্থির না হওয়া অবধি তো চিকিৎসার স্বাভাবিক পরিবেশে ফেরত আনা কঠিন হয়ে ওঠে।
মনে রাখতে হবে আপনি সঠিক চিকিৎসা না হওয়া বা ভুল চিকিৎসার অভিযোগে যে কাজটি করলেন সেটা কিন্তু চিকিৎসা নিতে আসা অন্য রোগীদেরও চিকিৎসায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাল। এ অবস্থায় যদি কারো মৃত্যু হয় তাহলে তার দায়ভার কে নেবে? কয়েক মাস আগে ঢাকায় অবস্থিত গ্রিন রোডস্থ সেন্ট্রাল হাসপাতালে সম্পূর্ণ অনাহূত এবং অবিবেচকের মতো চিকিৎসককে মারধর এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারা। হুজুগে বাঙালি বলে আমাদের যে বদনাম আছে এটা তারই নিদারুণ বহিঃপ্রকাশ ছিল। এমন ঘটনা চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য অশনি সংকেত।
আবার সম্প্রতি পটুয়াখালীর বাউফলে মাকসুদা আক্তার নামের একজন রোগীর অপারেশনের সাড়ে তিন মাস পর পুনরায় অপারেশন করে পেটের ভেতর থেকে গজ বের করার ঘটনা ঘটেছে। অপারেশন শেষে পেটের ভেতর গজ, ব্যান্ডেজ, সিজার বা অন্য যন্ত্রপাতি রেখে আসা গুরুতর অবহেলার প্রমাণ দেয়। এটা এমন এক ধরনের পেশাগত অপরাধ (Criminal Negligence) যাকে “ রেস ইপসা লোকুইটর” ( Res Ipsa Loquitor)বলা হয়ে থাকে।
‘রেস ইপসা লোকুইটর’ (Res ipsa loquitur)-এর অর্থ হচ্ছে যেখানে ঘটনা নিজেই চিকিৎসাজনিত অবহেলার বিষয়টাকে সত্য হিসেবে প্রমাণ করে। এ ব্যাপারে মহামান্য উচ্চ আদালত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক, পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন এবং বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানকে তলব করেছেন। সবকিছু দেখেশুনে আশাকরি এ ব্যাপারে আদালত করণীয় নির্ধারণ করবেন।
সেই সঙ্গে দেশের আনাচে কানাচে গজিয়ে ওঠা এমন ক্লিনিক নিয়ন্ত্রণেও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া মনে হয় খুব জরুরি। কারণ সেবার চেয়ে ব্যবসা এখানে মুখ্য। এমন অবস্থা তাই বন্ধ করতে হবে এখনই। যেমনভাবে চিকিৎসকরা তাদের পেশাগত দায়বদ্ধতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন তেমনিভাবে রোগীরাও চিকিৎসাকাজে চিকিৎসকদের সার্বিক সহযোগিতা করবেন—সেটাই সবার প্রত্যাশা। রোগী, চিকিৎসক এবং এ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের সার্বিক সহযোগিতা, বিশ্বাস ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টিই পারে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের পথ সুগম করতে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ।

ডা. পলাশ বসু