বায়ুবিদ্যুৎ
কানিবগার চর ঘিরে স্বপ্ন দেখতে পারে উপকূলবাসী
জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
নবায়নযোগ্য শক্তি বলতে যে শক্তিকে বারবার ব্যবহার করা যায় এবং ব্যবহারের পর নিঃশেষ হয়ে যায় না, তাকে বোঝানো হয়ে থাকে। এ শক্তি একবার ব্যবহারের পর আবার ব্যবহারের সুযোগ থাকে।
বর্তমানে পরিবেশগত বিপর্যয়, আর্থসামাজিক উন্নয়ন সর্বোপরি টেকসই উন্নয়নের জন্য নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারের কথা আলোচনায় চলে আসছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে জ্বালানি সংকট প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে থাকে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ শেষ হয়ে যাবে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, তার সম্ভাব্য মজুদ উত্তোলন সবই নানারকম অনিশ্চয়তায় ঠাসা। অথচ আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় সবটুকুই করা হয় প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। অন্যদিকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এবং চাহিদাকৃত বিদ্যুতের মাঝে রয়েছে বেশ বড় একটি ব্যবধান। অন্যান্য যে জ্বালানি রয়েছে তাও আমাদের অফুরন্ত নয়। উপরন্তু কয়লা ও তেল আমদানিতে আমাদের রাষ্ট্রীয় কোষাগারের একটা বড় অংশই চলে যায়। সুতরাং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিকল্প কিছু চিন্তা করতে হবে।
বিকল্প বা নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার আমাদের দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সাবলম্বিতা অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আর এই বিকল্প বা নবায়নযোগ্য এ জ্বালানিশক্তির উৎস হিসেবে বায়ুশক্তির ব্যবহার নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
বর্তমানে তুলনামূলকভাবে উন্নত পন্থায় বায়ুশক্তিচালিত টারবাইন দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে বায়ু যখন টারবাইন ব্রেডের মধ্য দিয়ে যায়, তখন বায়ুর শক্তি ওই ব্লেডগুলোর সঙ্গে রোটর সংযুক্ত থাকে যা ব্লেডগুলোর ঘূর্ণনের ফলে সক্রিয় হয়। আবার ওই রোটর জেনারেটরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে যা ঘূর্ণনের ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। বায়ু টারবাইন একটি টাওয়ারের ওপর থেকে অধিকাংশ শক্তি ধারণ করে থাকে। বায়ুর গতিশক্তি ব্যবহার করে এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতির মতো কার্বন ডাই-অক্সাইড সৃষ্টি করে না। ফলে বায়ুশক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিবেশের জন্য বেশ উপকারী।
বিশ্ব বায়ুশক্তি পরিষদের রিপোর্ট অনুসারে, বায়ুশক্তির মাধ্যমে ২০ বছরের মধ্যে বিশ্বের বিদ্যুৎ চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। তাদের হিসাবে, বায়ুশক্তি কাজে লাগিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫,৪০০ টেরাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। যদিও পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলো বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অজস্র সম্ভাবনা থাকলেও অগ্রগতি বেশ ধীর।
বাংলাদেশে বায়ুপ্রবাহের মাত্রার হিসেবে মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ হাতিয়ার মতো সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলগুলো উয়িন্ডমিল টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বেশ উপযুক্ত। বায়ুশক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি শক্তির একটি অফুরন্ত উৎস। প্রকৃতি তার অমোঘ বিধানে আমাদের বাতাস দিয়ে চলেছে অনন্তকাল ধরে। এর কোনো শেষ নেই। তা ছাড়া আমাদের দেশ মূলত গ্যাস বিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৮৬ শতাংশ জ্বালানি চাহিদা মেটানো হয় গ্যাস দিয়ে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান। কেননা গ্যাস হচ্ছে অনবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। ফলে যদি আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বায়ুশক্তির বিকল্প উৎসের কথা না চিন্তা করি তবে একটা সময় আমাদের বিরাট সমস্যার মুখে পতিত হতে হবে।
আমাদের উপকূলবর্তী এলাকার সীমানাকে ব্যবহার করে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে আশার আলো দেখাচ্ছে। বলা হচ্ছে, আমরা যদি আমাদের উপকূলবর্তী ৭২৪ কিমি এলাকাকে ব্যবহার করতে পারি, তাহলে তা প্রায় ২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে। সম্ভাবনাময় এই খাতকে ব্যবহার করার জন্য আমাদের এই সম্পদকে উপযুক্ত উপায়ে ব্যবহার করতে হবে। যেসব দেশ এই প্রযুক্তি ব্যবহারে সাফল্য অর্জন করেছে, প্রয়োজনে তাদের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
আমাদের আলোচ্য কানিবগা লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মেঘনার বুকে জেগে ওঠা এক বিশাল চর, এখানকার বায়ুপ্রবাহকে কাজে লাগিয়ে আমরা সহজেই একটি বায়ুশক্তির বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে পারি। এখান থেকে বিদ্যুৎ শুধু লক্ষ্মীপুর নয়, ভোলা, নোয়াখালী এসব অঞ্চলেও সরবরাহ করা যেতে পারে।
তা ছাড়া, বায়ুশক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎশক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে বসবাসরত মানুষের জীবনমানও উন্নত করা সম্ভব। এসব এলাকার মানুষের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম মাধ্যম হলো মৎস্য আহরণ। কিন্তু মৎস্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় সুবিধা নেই বলে তাদের কষ্টার্জিত মৎস্য অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। যদি উয়িন্ডমিল প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে উপকূলীয় মানুষদের দোরগোড়ায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়, তবে উপকূলীয় অঞ্চলের এসব মানুষের সমস্যা বহুলাংশে সমাধান করা সম্ভব। এটি শুধু উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন সাধন করবে না, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করে তুলবে।
লেখক : সংবাদকর্মী

জিল্লুর রহমান