বন্ধুদিবস
বন্ধু, তোমার পথের সাথিকে চিনে নিও
যার আলোর পরশে ভোর হয়ে যায় রাত, যার সঙ্গে চলে প্রাণের বোঝাপড়া, করা যায় হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব সে তো বন্ধুই। পৃথিবীর আত্মীয়তার তাবৎ সম্পর্ক বেঁধে দেয় নিয়তি; নিজে বেছে নেওয়া যায় কেবল বন্ধু। প্রকৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিই তো বন্ধুত্ব। বন্ধুর হাতে হাত রেখে পাড়ি দেওয়া যায় ঘনায়মান অন্ধকার পথ। বন্ধুর জন্য খুশির খেয়ালে পাল তোলা যায়; স্মৃতির পটে জমে থাকা ব্যথা ভুলা যায় হাসি আর গানে। শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এই বন্ধুর জন্যই গান গেয়ে যান :
বন্ধু তোমার পথের সাথিকে চিনে নিও
মনের মাঝেতে চিরদিন তাকে ডেকে নিও
ভুলো না তারে ডেকে নিতে তুমি।
আজ সেই পথের সাথিকে বিশেষ করে মনে করবার দিন। ব্যাকুলতা প্রকাশের দিন । নিজের নিঃসঙ্গতাকে ভুলে যাওয়ার দিন। যদিও বন্ধুতার জন্য নির্দিষ্ট করে কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না। তবু আজ বিশ্ব বন্ধু দিবস।
১৯৩৫ সালে আগস্টের প্রথম শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে এক ব্যক্তি বন্ধু বিয়োগের আঘাতে আত্মহত্যা করেন। বন্ধুর জন্য বন্ধুর এ আত্মত্যাগের ঘটনায় সৃষ্টি হয় ব্যাপক চাঞ্চল্য। সে বছরই মার্কিন কংগ্রেস বন্ধুত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে আগস্টের প্রথম রোববারকে বন্ধু দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সেই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধুদের মধ্যে কার্ড, ফুল ও অন্যান্য উপহারসামগ্রী বিনিময়ের মাধ্যমে প্রতিবছর দিনটি উদযাপন করে সবাই। এখনকার ভার্চুয়াল দিনে ব্লগ লিখে, ইলেকট্রনিক কার্ড বিতরণ করে, ফেসবুক-টুইটারে বিশেষ স্ট্যাটাস দিয়ে এবং চেনাজানা বন্ধুদের নিয়ে লং ড্রাইভে গিয়ে হ্যাং আউট করার মাধ্যমে বন্ধু দিবস পালন করে তরুণ-তরুণীরা।
পৃথিবীতে বন্ধুরও আছে অনেক রূপ। পরম আস্থা ও আবেগময় অনুভূতি প্রকাশ করবার অকৃত্রিম সম্পর্কের নাম হলো বন্ধুত্ব। কেবল আগস্টের দ্বিতীয় রোববার নয়; বছরজুড়েই নানামুখী বন্ধুত্বের দিবস রয়েছে। যেমন আগস্টের তৃতীয় রোববার নারী বন্ধু দিবস, মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহ বাল্যবন্ধু দিবস ও নতুন বন্ধু সপ্তাহ। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারি মাসটাকেই আন্তর্জাতিক বন্ধু মাস হিসেবে কোনো কোনো দেশে পালন করা হয়।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘অভিশাপ’ কবিতায় দয়িতাকে বন্ধু হারানোর বেদনা মনে করিয়ে দিতে গিয়ে বলেছেন :
তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা-বন্ধ,
আমার মতন কেঁদে কেঁদে হয়ত হবে অন্ধ—
সখার কারা-বন্ধ!
বন্ধু তোমার হানবে হেলা
ভাঙবে তোমার সুখের মেলা;
দীর্ঘ বেলা কাটবে না আর,
বইতে প্রাণের শান- এ ভার
মরণ-সনে বুঝবে—
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
অন্যদিকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে বন্ধু হলো এক বিশেষ সম্পর্কের নাম। গোলাপ যেমন একটি বিশেষ জাতের ফুল, বন্ধু তেমনি একটি বিশেষ জাতের মানুষ। দার্শনিক নিটসে বন্ধুত্বের মধ্যে পেয়েছিলেন প্রাণরক্ষার রসদ। তাই তো তিনি বলে রেখেছেন, বিশ্বস্ত বন্ধু হচ্ছে প্রাণরক্ষাকারী ছায়ার মতো। যে তা খুঁজে পেল, সে যেন একটি গুপ্তধন পেল!
আর এই গুপ্তধন নিয়ে এ কালের কবি মহাদেব সাহা ‘বন্ধুর জন্য বিজ্ঞাপন’ শিরোনামে এক দুর্দান্ত কবিতা লিখে রেখেছেন :
আমি একটি বন্ধু খুঁজছিলাম যে আমার
পিতৃশোক ভাগ করে নেবে, নেবে
আমার ফুসফুস থেকে দূষিত বাতাস;...
আমি শুধু সারাজীবন একটি বন্ধুর জন্য প্রত্যহ বিজ্ঞাপন দিই
কিন্তু হায়, আমার ব্লাড গ্রুপের সাথে
কারো রক্ত মেলে না কখনো!
প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ বন্ধুর মন নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করে বলে দিয়েছেন, যদি থাকে বন্ধুর মন গাং পার হইতে কতক্ষণ। আর জনপ্রিয় শিল্পী রুনা লায়লা গাং পার হতে হতে বন্ধুর বিরহে গেয়ে ফেলেন, ‘বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম, দেখা পাইলাম না।’ বন্ধুত্বের সঙ্গে নদীর বহমানতার একটি সাযুজ্য আছেই। রবিঠাকুর যেমনটা বলেন, ওগো নদী, আপন বেগে পাগল-পারা। তেমনি বন্ধুত্বেরও একটি ব্যাপকবিস্তারি আপন বেগ ও আবেগ দুটোই আছে। বিশ্বকে একতাবদ্ধ রাখতে নদীর মতো বেগবান সেই বন্ধুত্বের ওপর আর কিছু নেই।
তবে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে জাতিগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালি অতীতে বড় নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা ও অর্বাচীনতার স্বাক্ষরও রেখেছে। তারা স্বাধীনতার স্থপতি ও বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার-পরিজনের প্রতি বন্ধুত্ব অবমাননার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে। যিনি বঙ্গবন্ধু, তাঁকে শত্রু গণ্য করতেও কুণ্ঠিত হয়নি বাঙালি। পূর্বাপর না ভেবে জাতির চির বন্ধুকে শত্রুতায় পর্যবসিত করে দেশাত্মবোধেই কালিমা লেপন করে দিয়েছিল হন্তারকরা। আগস্টের দ্বিতীয় রোববার যেমন বন্ধুত্বের দিন, তেমনি এই আগস্ট মাসটিকে আমরা শোকের মাস বানিয়ে দিয়েছি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসাপূর্ণ ও ঔদার্যিক গভীর বন্ধুত্বকে পায়ে দলে।
দেশে সেই নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার ধারাপাত এখনো বহমান। বন্ধুত্ব ভুলে যদি আমরা হিংসা হানাহানিতে গা না ভাসাতাম, তবে বহু মত ও পথের মানুষের সম্মিলিত সুন্দর সহাবস্থানে বাংলাদেশ হতে পারত মানুষের শ্রেষ্ঠতম আবাসভূমি। বাঙালি এখন আর প্রিয় বন্ধুর মন খোঁজে না। তার মধ্যে বন্ধুর মানমর্যাদা রক্ষায় সাতসমুদ্দুর পাড়ি দেওয়ার বাসনাও আর প্রবল হয়ে ওঠে না। নিজের স্বার্থচিন্তায় ভরাডুবি হলেও তাতেই সই।
অথচ আমাদের স্বাধীনতার প্রজন্ম সংগীতশিল্পী আবদুল জব্বার বন্ধুর দেওয়া আঘাতে মধুর বেদনাবোধ করেছেন দারুণভাবে। তাই তো তিনি গেয়ে উঠতেন, ‘শত্রু তুমি বন্ধু তুমি, তুমি আমার সাধনা!’ আর শিল্পী জেমস বন্ধুর চোখের জল মুছে দিতে গেয়েছেন, ‘তোমাদের মাঝে কি কেউ আছে বন্ধু আমার, তোমাদের মাঝে কি কেউ আছে পথ ভোলা, তবে বন্ধু নৌকা ভেড়াও মুছিয়ে দেব দুঃখ সবার, তবে বন্ধু নৌকা ভেড়াও মুছিয়ে দেব দুঃখ-জ্বালা।’
আর সংগীতশিল্পী তপু পুরো পৃথিবীর বিপরীতে রেখেছেন বন্ধুকেই, ‘পুরো পৃথিবী একদিকে আর আমি অন্যদিক, সবাই বলে করছ ভুল আর তোরা বলিস ঠিক, তোরা ছিলি তোরা আছিস জানি তোরাই থাকবি, বন্ধু বোঝে আমাকে, বন্ধু আছে আর কী লাগে?’ এভাবে গীতিকবির চেতনাগত চিত্রকল্পে হয়তো বন্ধুত্বের আবেগটা অভাবনীয়, কিন্তু বাস্তবতা নিশ্চিতই ভিন্নতর।
গ্রিক নাট্যকার ইউরিপিদিস বলতেন, ১০ সহস্র আত্মীয়ের চেয়েও বড় একজন বিশ্বস্ত বন্ধু। একে অপরের ভালোবাসায় বিশ্বসভায় এগিয়ে থাকতে নিজেদের জাতটাকে বাঁচিয়ে রাখতে সেই বন্ধুত্বই আমাদের আরাধ্য। জয়ী হোক বন্ধু, জয় হোক বন্ধুতার।
লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন।

ফারদিন ফেরদৌস