অভিমত
১৯৭১-এর ইন্দিরা গান্ধী এবং ২০১৭ সালের বাংলাদেশ
১৯৭১ সালের এপ্রিল ও মে মাসে পূর্ববাংলার লাখ লাখ শরণার্থী যখন ত্রিপুরা, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে ঢুকছিল তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইন্দিরা গান্ধীর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ভূমিকা স্মরণ করলে আজকের বাংলাদেশের নাবালকত্ব খুব করে চোখে পড়ে। ইন্দিরা সেদিন প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, বাঙালিদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মাঝে ভারতের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক সম্ভাবনা দেখেছিলেন এবং মাত্র নয় মাসে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে পরিণত করেছিলেন।
কিন্তু সাড়ে চার দশক পর প্রায় একই অঞ্চলে জাতি-সংঘাতের সমধর্মী আরেক অধ্যায় রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার হতবিহ্বল ও দিশাহীন ধরন দিয়ে বাংলাদেশ শুধু এটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে না যে, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির গোলক ধাঁধাঁয় তার দূরদর্শিতা ঝলসে গেছে বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতিতে সে একদিকে যেমন শিশুসুলভ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে-অন্যদিকে তেমনি সংঘাতপূর্ণ আসন্ন দক্ষিণ এশিয়ায় দেশ হিসেবে তার টিকে থাকার শর্তও সে নিঃশেষ করে দিতে উদ্ধত। স্পষ্টত ২০১৭ সালের বাংলাদেশে কোনো ইন্দিরা গান্ধী নেই।
এ লেখা যখন প্রকাশিত হবে তখন বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়েছে মিয়ানমারের অন্তত দুই লাখ রোহিঙ্গা অধিবাসী। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আরাকানের মুসলমান অধ্যুষিত এলাকাকে ইতিমধ্যে ‘সামরিক যুদ্ধ জোন ঘোষণা করেছে। বিশ্বাসযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যম সূত্রে এটা এখন প্রায় নিশ্চিত, আসন্ন দিনগুলোতে আরো কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হবে বাংলাদেশকে। যেহেতু রোহিঙ্গা এলাকায় এখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পোড়ামাটি নীতি বাস্তবায়ন করছে সুতরাং উদ্বাস্তুদের আগমন যে অব্যাহত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। অনিচ্ছায় হোক কিংবা বাধ্য হয়ে হোক-বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক সংকটে রোহিঙ্গা একটা পক্ষ। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য যে ফাঁদ পাতা হয়েছে তাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে না নিয়ে দেশটি কি তাতে আত্মসমর্পণ করবে? ২৫ আগস্ট নতুন করে শরণার্থীর ঢেউ শুরু হওয়ার পর প্রায় দুই সপ্তাহ পার হলেও বাংলাদেশ মিয়ানমারকে প্রভাবিত করার জন্য সে দেশে বা তার প্রধান মিত্র চীন বা ভারতে বা ওআইসি বা জাতিসংঘে কোনো মন্ত্রীকে প্রেরণ করেছে বলে জানা যায় না।বরং বিস্ময়করভাবে এই ইস্যুতে ওআইসির বৈঠক ডাকতে বিবৃতি দিতে দেখা গেছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আফিসকে। ২৫ ঘটনা শুরু হলেও, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে দেখা যাচ্ছে, তারা প্রথম এই ইস্যুতে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদ জানায় দীর্ঘ ১০ দিন পর ৬ সেপ্টেম্বর ।
অথচ রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশা-আত্মদানের পক্ষে অবিশ্বাস্য এক সংহতি দেখছি আমরা বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যমে। এমনকি মিয়ানমারের রাজনৈতিক নেত্রী অং সান সু চির কয়েক দশকের পুরোনো মিত্র ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকার প্রচার মাধ্যমে প্রতিদিন আরাকান সন্নিবর্তী এলাকা থেকে গণহত্যাতুল্য পরিস্থিতির সরেজমিন প্রতিবেদন প্রচারিত হচ্ছে। মোদি যখন আরাকানের গণহত্যাকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ যুদ্ধের অংশ বলছেন তখন ভারতীয় প্রচার মাধ্যমেও কিন্তু তুলে ধরা হচ্ছে মাঠে প্রকৃতই যা হচ্ছে তাই। প্রায় সব প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের বর্তমান ফোকাস আরাকান ও বাংলাদেশ উপকূল। সমকালে বিশ্বের আর কোনো জাতিসত্তার মানবাধিকারের সংগ্রামে এত বেশি বৈশ্বিক সংহতি দেখা যায়নি। বস্তুত ১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধীও বাংলাদেশ সংকটে এত বৈশ্বিক সহানুভূতি দেখেননি। বরং সেদিনের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দিকে আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমের মনযোগ ফেরাতে উত্তর আমেরিকাসহ প্রভাবশালী দেশগুলোতে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে তাঁকে।
প্রায় একইভাবে আজ, বাংলাদেশের কেউ নয়, সে-ই সুদূর তুরস্কের এরদোয়ান মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করছেন; একই সময়ে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারশুদি মিয়ানমার সফর করছেন; পোপ ফ্রান্সিস ঘটনার ৭২ ঘন্টার মধ্যে তাঁর মিয়ানমার সফরের তারিখ ঘোষণা করেছেন; মালদ্বীপ মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত করেছে; জাতিসংঘ ইতিমধ্যে মিয়ানমারকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’-এর দায়ে অভিযুক্ত করেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংস্থা প্রায় প্রতিদিন রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিবৃতি দিচ্ছে-কিন্তু বাংলাদেশ ঠিক কী করছে কেউ বুঝে উঠতে পারছে না।
ঘরের দরজায় বেসামরিক মানুষদের শতাব্দীর অন্যতম জঘন্য গণহত্যা ঘটতে দেখে বাংলাদেশ অজ্ঞাত কারণে ‘ধীরে চলো’ নীতি নিলেও লাখ লাখ শরণার্থীর খাওয়া-পরা-থাকার দায়িত্ব নেওয়া এবং নিজের আকাশসীমা লঙ্ঘন হতে দেখেও তার ধীরস্থির ভঙ্গি বিশ্ব কূটনীতির জন্য প্রকৃতই এক বিস্ময়। উপরন্তু বিশ্ব যখন রোহিঙ্গা গণহত্যার নিন্দায় একত্রিত এবং এই অপারেশন থামাতে পুনঃপুন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে অনুরোধ করছে, চাপ দিচ্ছে বাংলাদেশ তখন সীমান্তে যৌথ সামরিক টহল-অভিযানের প্রস্তাব দিচ্ছে । নিঃসন্দেহে এটাও ১৯৭১-এর ইন্দিরা গান্ধীর কৌশল ছিল না। বরং ইন্দিরা গান্ধীর কৌশল ছিল পূর্ববাংলা নিয়ে সৃষ্ট সম্ভাবনাকে বাস্তব করতে সব রাজনৈতিক দলকে একক জাতীয় স্বার্থে যুথবদ্ধ করা। সেদিনের ভারতে কয়েকবারই তিনি এই বিষয়ে সর্বদলীয় বৈঠক আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ চরম এই সংকটময় মুহূর্তেও উক্তরূপ কোনো সর্বদলীয় বৈঠক ডেকে বিশ্বজুড়ে তার অভ্যন্তরীণ দৃঢ়তা প্রদর্শন করবে এমনটি বোধহয় কেউই এখানে আশা করে না।
তবে ২০১৭ সালের বাংলাদেশ যেমন পূর্ববাংলা নয়-তেমনি আজকের ভারতের শাসক প্রধানমন্ত্রীও সেদিনের ইন্দিরা গান্ধী নন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর আরাকান অভিযানের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই হলেন কোনো বিদেশি দেশের সর্বোচ্চ নেতা যিনি দুই সপ্তাহের মধ্যে মিয়ানমার সফর করছেন এবং প্রকাশ্যেই ভারত আরাকান অধ্যায়কে সমর্থন দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রায় এক ঘরে মিয়ানমারের জন্য মোদির সফর ছিল বিরাট এক স্বস্তি। বস্তুত ১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধী যেভাবে পূর্ববাংলা সংকটে ভারতের ঐতিহাসিক ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ দেখেছিলেন-আজকের ভারতও আরাকান গণহত্যার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের লাভালাভ বুঝে নিচ্ছে। এ মুহূর্তে মিয়ানমারের পাশে মোদির দাঁড়ানোর অর্থই হলো মিয়ানমারের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের পক্ষে চীনের সিল্করুটে যুক্ত হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ভারতই ‘অর্থনৈতিক সহযোগিতা’র ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিয়তি হয়ে থাকা। সেই সূত্রে নরেন্দ্র মোদিকে ইন্দিরা গান্ধীর যোগ্য উত্তরসূচিই বলা যায়। কিন্তু আসন্ন দিনগুলোতে বাংলাদেশের কূটনীতি কী হবে? আদৌ কি বাংলাদেশের বলিষ্ঠ কোনো কূটনীতিক উদ্যোগ দৃশ্যমান?
বস্তুত গত ১০ দিনে বিশ্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে ছিল। মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া-তুরস্কের মতো প্রধান প্রধান শক্তিধর মুসলমানপ্রধান রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের আরো সক্রিয়তার প্রত্যাশায় ছিল। কিন্তু ঘটনার রক্তাক্ত অনেক দিন পরও কূটনীতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কোনো আগ্রাসী ভূমিকা ছিল না। না মুসলমান-প্রধান বিশ্বে, না মুসলমান-বহির্ভূত বিশ্বে।
এর ফল হতে যাচ্ছে বিধ্বংসী। বস্তুত এই মুহূর্তে ঘটনার হোতা হয়েও মিয়ানমারই কূটনীতিতে এগিয়ে। তারা পুরো ঘটনাকে ‘দুষ্ট প্রচারণা’ বলে উপস্থাপন করছে। ইতিমধ্যে এশিয়ার দুই প্রধান শক্তি ভারত ও চীনকেও তারা পক্ষে পাচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ (এবং ভারতও) সচরাচর দাবি করে থাকে যে, ঢাকা ও দিল্লির বন্ধুত্ব ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে। আবার বেজিং ও ঢাকা এও বলে যে, এই দুই দেশ হলো ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার’। কিন্তু ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ আঞ্চলিক সংকটে দেখা গেল চীন ও ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের প্রতিপক্ষের পাশে। চীনকে ব্যবহার করে ১৯৭৮-৭৯ সালে বাংলাদেশ যেভাবে মিয়ানমারকে প্রভাবিত করেছিল এবার তেমন চেষ্টা লক্ষ্যগোচর হলো না।
কার্যত রোহিঙ্গা সংকট বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের কূটনীতিক সামর্থ্য ও স্বাধীন সক্রিয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং যার পরিণতি অন্তত তিনটি কারণে ভয়াবহ হতে বাধ্য।
প্রথমত, মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনীতিক পরাজয় ঢাকাকে লাখ লাখ শরণার্থীর দীর্ঘমেয়াদি ভরণপোষণে বাধ্য করবে এবং এটা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে ভিন্ন ধরনের নতুন কিছু সংকটের জন্ম দেবে।
দ্বিতীয়ত, এই অধ্যায় বাংলাদেশের কূটনীতিক ও সামরিক যেসব দুর্বলতাকে উন্মোচন করেছে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র হিসেবে শুভ ফলদায়ক হবে না। আঞ্চলিক আরো বহুধরনের খবরদারির মুখে পড়বে এখন থেকে বাংলাদেশ।
তৃতীয়ত, মিয়ানমারের সঙ্গে একটি ‘উইন-উইন’ সমাধানে পৌঁছাতে না পেরে চীনের সড়ক ও নৌ সিল্করুটে যোগদানেও বাংলাদেশ বাস্তব প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ল। চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ স্থল যোগাযোগের সম্ভাবনা আপাতত সুদূর পরাহত এবং এর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ আপাতত এশিয়ার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক উলম্ফনে নিজেকে শামিল করতে ব্যর্থ হলো।
লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক।

আলতাফ পারভেজ