প্রতিক্রিয়া
একটি ভাইরাল ছবি ও আমাদের হুজুগ
বাঙালি যে হুজুগে জাতি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কোনো একটি বিশেষ ইস্যু হাতে পেলে আমরা সবাই মেতে উঠি তা প্রচারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো একটি সংবাদকে ভাইরালে পরিণত করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। বিশেষ করে কাউকে হেয় করার মতো বিষয়ে অনেকেরই আগ্রহ বেশি। কিন্তু ভেবে দেখি না, কী নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছি কিংবা কিসে মেতে উঠছি। যে বিষয়ে আমরা মেতে উঠছি, তা কি সমাজকে আদৌ ভালো কিছু শেখাচ্ছে? নাকি সমাজকে আরো কলুষিত করে তুলছে? এমন ভাবনা আমাদের আসে না বললেই চলে। আমরা নিজেরা আমাদের বাচ্চাদের পড়াশোনার পাশাপাশি নানাভাবে সামাজিক আচার-আচরণ, কৃষ্টি-কালচার শিক্ষা দিয়ে থাকি। এসব ক্ষেত্রে অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। আমরা গণমাধ্যম থেকে অনেক সময় সতর্ক হই, আবার অনেক সময় উৎসাহিত হই। মাঝেমধ্যে এমন কিছু খবর প্রচার হয়, যাতে সর্বসাধারণের সতর্ক হওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায়, কিছু বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি সেখান থেকে নেতিবাচকভাবে উৎসাহিত হয়ে থাকে।
গণমাধ্যমে ওই খবর প্রচারের সঙ্গে প্রায়ই এমন ঘটনা বিভিন্ন জায়গায় অনবরত ঘটতে দেখা যায়। আবার অনেক সময় কোনো ঘটনার সত্যাসত্য বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই মেতে উঠি। গুজব সত্য কি মিথ্যা, তা বিচার ছাড়াই মাঠে নেমে যাই। এ প্রসঙ্গে কবি শামসুর রাহমানের কথা মনে পড়ে যায়। তিনি তাঁর ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে, চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে। দিন দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা গেল উড়ে, কান না পেলে চার দেয়ালে মরব মাথা খুঁড়ে।’ প্রকৃতপক্ষে কান চিলে নিয়েছে কি না, তা পরীক্ষা না করেই চিলের পিছে দৌড়ে বেড়ানোর স্বভাবটা আমাদের একটু বেশি। আমাদের গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমগুলোকে যদি যথাযথ কাজে ব্যবহার করি, তা থেকে সমাজ অনেক উপকৃত হতে পারে। কাজেই অপরাধকে যেমন ঘৃণা করি, তেমনি অপরাধীকেও। কিন্তু অপরাধীর পেছনে লাগতে গিয়ে আদ্যোপান্ত যেসব বিষয় নিয়ে আমরা মেতে উঠছি, তা কি আদৌ আমাদের রুচির ইতিবাচক দিককে তুলে ধরছে? নাকি সেখান থেকে সমাজে কিছু নেতিবাচক প্রচারণা আমাদের সামনে আসছে। একজন অপরাধীর ঘটনায় তার সঙ্গে পরিচিতজনদেরও অপরাধী করে তুলছে।
তাহলে এখন কি আর ছবি তোলা যাবে না? নাকি ছবি তোলার আগে জীবনবৃত্তান্ত দেখতে হবে? সময় এসেছে, কারো সঙ্গে ছবি তুলতে গেলে তার চারিত্রিক সনদ কিংবা আদ্যোপান্ত জীবনবৃত্তান্ত দেখার। আবার জীবনবৃত্তান্ত অনেক ভালো, ভবিষ্যতে যে তিনি কোনো সত্য কিংবা মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত হবে না, তারই বা কী প্রমাণ। আমরা প্রায়ই দেখি, কেউ কোনো অপরাধ করলে, তার সঙ্গে কার কার ছবি আছে, কোন কোন ভঙ্গিতে আছে, সেলফি আছে কি না, ঘাড়ে হাত দিয়ে ছবি তুলেছিল কি না, হাতলে বসে ছবি উঠেছিল কি না এমন সবকিছুই বিবেচনায় চলে আসে।
বিশেষ করে কয়েক দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সামিয়া রহমানের লেখা গবেষণা প্রবন্ধে অন্য কারো লেখার অনেকাংশ হুবহু মিলে যাওয়ার ঘটনায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। তার পরেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগটি আমলে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত সাপেক্ষে এর সত্যাসত্য বের হবে, ফলে এ বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না। এরই মধ্যে গণমাধ্যম সূত্রে সামিয়া রহমানের দেওয়া বক্তব্য থেকে জানতে পেরেছি, যৌথভাবে ওই প্রবন্ধ প্রকাশিত হলেও সামিয়াকে না দেখিয়েই প্রকাশের ব্যবস্থা করেছেন সহলেখক। তবে যেভাবেই হোক, তিনি হয়তো এই দায় এড়াতে পারেন না। শিক্ষক সমাজের এমন নেতিবাচক বিষয়ে অনেক সময় নিজেদের মাথা নুয়ে পড়ে। আবার যখন দেখি, শিক্ষকরাই এমন নেতিবাচক খবর প্রচার করে নিজেদের লুকায়িত মনের নেতিবাচক বাসনা মেটাতে উন্মুখ হয়ে ওঠেন, তখনো মনে চরমভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হই।
আমরা লক্ষ করি, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কাদা ছোড়াছুড়ির মাত্রাটা একটু বেশি। একজন শিক্ষক আরেকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো কিছু পেলে সেটির সত্যাসত্য বিচার ছাড়াই মেতে ওঠেন। উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনেক অভিযোগই পরে মিথ্যা, ভিত্তিহীন কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমাণিত হয়। কিন্তু অভিযোগের পর যেভাবে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়ে থাকে, পরে সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও সেভাবে আর গণমাধ্যমে প্রকাশ করা পায় না। মিথ্যা অভিযোগ হলেও একবার তা গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যে মান ও মর্যাদারহানি ঘটে, তা কোনোভাবেই পূরণযোগ্য হয় না। আমরা জানি, যিনি যত বিখ্যাত, তিনি তত সমালোচিত। সে অনুযায়ী সামিয়া রহমান সমালোচনায় এগিয়ে গেছেন।
আমরা অনেক সময় কোনো বিষয় প্রচার করতে গিয়ে ভালো-মন্দ বিচারের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। বিশেষ করে কেউ কোনো ভালো কাজ করলে সেটি যতটা না প্রচার পায়, কোনো খারাপ কাজ তার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত প্রচার পায়। সামিয়া রহমানের গবেষণাপত্র চুরির খবরটি প্রচার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আর কী কী কাজে জড়িত, কার কার সঙ্গে ছবি তুলেছেন, সেগুলো নিয়েও আমরা মেতে উঠেছি। এ জন্যই হয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসির হাতলে বসে সামিয়া রহমানের স্থিরচিত্রের দৃশ্য প্রচার এবং ভিসির সঙ্গে সামিয়া রহমানের সম্পর্ক অনেকের আলোচনার খোরাক হয়েছে। তৎকালীন ভিসি আরেফিন সিদ্দিকের সঙ্গে একাত্তর টেলিভিশনের কর্ণধার মোজাম্মেল বাবু, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এবং সামিয়া রহমান তাঁর অফিসে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় যে যার মতো বসলেও সামিয়া রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি আরেফিন সিদ্দিকের চেয়ারের হাতলে বসেন। বিষয়টি নিঃসন্দেহে দৃষ্টিকটু কিংবা আদব-কায়দার বিচারে অত্যন্ত নিম্নমানের। কিন্তু ছবিটি যে বা যাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল আকারে ছড়িয়ে দিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের একটু প্রশ্ন করে দেখুন—এটি কতটুকু রুচিসম্মত হয়েছে।
লেখার শুরুতেই আমি কিছু সামাজিকতা ও কৃষ্টি-কালচারের কথা বলেছি। কিন্তু যেভাবে এই ছবিটিকে ভাইরাল করা হয়েছে, তা থেকে আমাদের ছেলেমেয়েরা কী শিক্ষা নেবে? হয়তো কেউ কেউ এ থেকে যথেষ্ট সতর্ক হবে, আবার অনেকই যে উৎসাহিত হবে না, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। আবার সেলিব্রেটিদের ছবি তোলার বিষয়টি নিয়েও এক ধরনের বিড়ম্বনা তৈরি হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রশ্ন আসাই স্বাভাবিক, ছবি তোলা এবং তা প্রচারের কোড অব কন্ডাক্ট কিংবা নীতিমালাটাও কি এখন জরুরি নয়?
কবি শামসুর রাহমানের ভাষায়, ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাওয়ার মতোন ব্যাপারস্যাপার, যা এককথায় আত্মঘাতী। এমন আত্মঘাতী প্রবণতা আমাদের ঘাড়ে চেপে বসলে সামনের দিনগুলোতে কিছু সংকট তৈরি হওয়াটা কি স্বাভাবিক নয়? এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও আক্রান্ত হতে পারেন। আত্মঘাত বহন করবেন মননে, আত্মস্থ করবেন মেধায়। আমরা সবাই ব্যক্তির দোষ খুঁজতে গিয়ে নিজেদের সংস্কৃতিকে স্থায়ীভাবে কলুষিত করছি। আমরা যদি নিজেদের রুচির পরিচয়টাকে আরো সুন্দর ও গঠনমূলক করতে না পারি, তাহলে আগামীর সমাজ নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ড. সুলতান মাহমুদ রানা