সৃজনশীল পদ্ধতি
ঘোড়া আগে না গাড়ি আগে?
নিশ্চয়ই আগে ঘোড়ার ব্যবস্থা করা যাবে কি না, সেটা জেনেবুঝেই পরে ঘোড়ার গাড়ির কথা ভাবেন তাঁর চালক।
তা না হলে তো গাড়ি বানিয়ে বসে থাকতে হবে, পরে সন্ধানে বের হতে হবে ঘোড়ার। ঘোড়া পাওয়া যাওয়ার পর ঘোড়ার গাড়িতে করে মালবহনের কথা ভাবতে হবে তাঁকে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সৃজনশীল পদ্ধতির কথা ভাবতেই ঘোড়া আগে না গাড়ি আগে কথাটা মাথায় এলো। আমাদের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা যাতে মুখস্থবিদ্যার মাধ্যমে পড়াশোনা না করে মূল পাঠ্যবই পড়ে নিজে নিজে যাতে প্রশ্নের উত্তর পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারে, সেই চিন্তা থেকে ২০০৮ সালে মাধ্যমিক স্তরে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়। সে সময় বলা হয়েছিল, এই পদ্ধতিতে নোট-গাইড বই আর থাকবে না। কোচিং-প্রাইভেট পড়া লাগবে না। শিক্ষকরা ক্লাসে সৃজনশীল বিষয়টি কী, কীভাবে একজন শিক্ষার্থী পাঠ্যবই পড়ে নিজে নিজেই উত্তর লিখতে পারবে, সে সম্পর্কে ক্লাসেই বুঝিয়ে দেবেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ার সময়ও বাঁচবে, অভিভাবকদের সন্তানদের নিয়ে আর শিক্ষকের পেছনে দৌড়ানো লাগবে না, অর্থও বাঁচবে। সেই আশায় গুড়ে বালি। যারা নোট বইয়ের ব্যবসা করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে, তারা নাম পরিবর্তন করে নোট বই, গাইড বইয়ের জায়গায় নিয়ে এসেছে অনুশীলন বা সহায়ক বই। ব্যবসার বিস্তার লাভ করেছে ব্যাপক।
কিন্তু পাশাপাশি অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়েছে বিপাকে। কারণ তাদের বলা হয়েছিল, ক্লাসে শিক্ষকরা এমনভাবে সৃজনশীল বিষয়টি কী, তা বুঝিয়ে দেবেন। তা তো হয়ইনি, বরং স্কুলের পরীক্ষার খাতায় পেয়েছে কম নম্বর। বিষয়টি অনেকটা লেজেগোবরে অবস্থার মতো হয়েছে।
এর প্রধান কারণ বেশির ভাগ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সৃজনশীল বিষয়টি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই। কীভাবে ক্লাসে পড়াবেন, কীভাবে পড়ালে বা বোঝালে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নোট বই মুখস্থ না করে মূল বইটি পড়ে নিজেদের মতো প্রশ্নের উত্তর লিখতে পারবে, সে সম্পর্কে শিক্ষকরা কিছুই জানেন না। যাঁরা নিজেরাই জানেন না, তাঁরা আর শিক্ষার্থীদের কী বোঝাবেন? কী শিখাবেন?
তবে এই যে শিক্ষকদের ধারণা না থাকার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহল বলেছে, সৃজনশীল বিষয়ে শিক্ষকদের মাত্র তিন দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যেটা পর্যাপ্ত নয়। তাঁরা এটাকে বাড়ানোর প্রস্তাবও করেছেন। এক সরকারি প্রতিবেদনেও শিক্ষকদের ধারণা না থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, যেমন গত ৫২ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক এখনো সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্নই করতে পারেন না। এটা গত মে মাসের করা প্রতিবেদন। আর তার আগে বছরের, অর্থাৎ গত বছরের মে মাসে করা প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, ৪৫ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন করতে পারেন না। তার মানে প্রশ্ন করতে না পারার বিষয়টির ক্রমে অবনতি ঘটছে।
এ ছাড়া আরো অভিযোগ আছে বেসরকারি বিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা বেশিরভাগই যেনতেনভাবে নিয়োগ পাওয়া। সৃজনশীল বিষয়টি ভালোভাবে না বোঝার কারণে তাঁরা নোট-গাইড বই থেকে সরাসরি প্রশ্ন করেন।
এ ছাড়া আরো কারণ রয়েছে, ক্লাসে যাঁরা সৃজনশীল সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দিতে পারেন, তাঁরা মনে করেন সেটা ক্লাসে না দিয়ে বাড়িতে কোচিং বা প্রাইভেট পড়ালে বাড়তি টাকা কামানো যাবে। শিক্ষাকে তাঁরা বাণিজ্যে পরিণত করেছেন। এ কারণে সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কে সব শিক্ষার্থী ন্যূনতম ধারণা পাচ্ছে না।
আর অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে সন্তানদের হাজার হাজার টাকা নোট-গাইড বই কিনে দিয়েছেন আগের মতই। কোচিং পড়ানোর জন্য ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ছুটে বেরিয়েছেন, কোথায় ভালো শিক্ষক আছেন, যিনি সৃজনশীল পদ্ধতিতে নোট করে দেবেন।
শিক্ষার্থীরাও বোঝেনি সৃজনশীল বিষয়টি কী? কেন তাদের জন্য সরকার এই পদ্ধতি চালু করেছিল। মুখস্থবিদ্যা নির্ভর করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে তারা এখনো। ভালো রেজাল্ট করছে হয়তো কেউ কেউ। কিন্তু নিজের সৃজনশীল মেধার বিকাশ ঘটানোর সুযোগ পাচ্ছে না। অবশ্যই অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আছে, যারা একটু গাইড পেলে নিজের চিন্তাশক্তি দিয়ে প্রশ্নের উত্তর নিজের মতো করে লিখে পরীক্ষায় আরো সাফল্য অর্জন করতে পারত। সরকারের উদ্যোগ কিছুটা হলেও সাফল্যের মুখ দেখত। আর শিক্ষকরা প্রশিক্ষণটা আরো গোছানো এবং দীর্ঘ হলে তাঁরাও উপকৃত হতেন।
এই হচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্গতি। একবারের জন্যও ভাবা হয়নি যে শিক্ষক ক্লাসে সৃজনশীল সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেবেন, তাঁর নিজের আদৌ কোনো ধারণা আছে কি না। সেসব কিছু না ভেবেচিন্তে হুট করেই সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করায় বিষয়টি হয়েছে—না ঘরকা না ঘাটকা।
এটা যেন ঘোড়ার আগে গাড়ির কেনার অবস্থারই মতো। যে টেনে নিয়ে যাবে আমাদের শিক্ষার্থীদের তার মেধা বা শিক্ষা দিয়ে, তাকে পুরোপুরি তৈরি না করে শিক্ষার্থীদের বলা হয়েছে তোমরা চলো।
কীভাবে চলবে শিক্ষার্থীরা? তারা তো জানে না কীভাবে চলতে হবে। তাদের তো চলার পথ দেখাবেন যে শিক্ষকরা, তাঁরাই তো চলতে শেখেননি ঠিকমতো। তাঁরা কীভাবে প্রশ্ন করতে হয় সৃজনশীল পদ্ধতিতে, সেটাই তো শেখেননি। বাধ্য হয়েই তাঁরা নোট-গাইড বইয়ের দ্বারস্থ হন।
হে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার চালক, আগে ভালোমতো তাঁদের শেখান, প্লিজ। তারপর কোমলমতি শিশুদের ঘাড়ে চাপান সৃজনশীলের বোঝা।
আপনাকে বুঝতে হবে, আগে ঘোড়া পরে গাড়ি। তা না হলে শিক্ষার হাল দিন দিন করুণ হতেই থাকবে। গাড়ি উল্টে খাদে পড়ে যাবে, ঘোড়া পেছন পেছন দৌড়াবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
লেখক : ছড়াকার ও সাংবাদিক।

সারওয়ার-উল-ইসলাম