ইউপি নির্বাচন
গড়ে উঠুক স্থানীয় সরকারের মজবুত কাঠামো
সদ্য সমাপ্ত ২৩৫টি পৌরসভায় একসঙ্গে ও দলীয় প্রতীকে প্রথমবারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার রেশ এখনো কাটেনি। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনও পৌরসভার মতো হয়ে পড়ায় দেশের চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন রাজনৈতিক দলের পরিচয় ও প্রতীকেই করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। নির্বাচন পরিচালনা বিধি ও আচরণবিধির খসড়াও নীতিগতভাবে অনুমোদন করা হয়েছে। পৌর নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল মাঠপর্যায়ে কাজও শুরু করেছে।
তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। সঠিক ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হওয়া একান্তই জরুরি। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২২ মার্চ ৭৩৯টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথমবারের মতো দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দলীয় প্রতীকে চেয়ারম্যান পদে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। এরই মধ্যে এ নির্বাচন নিয়ে পর্যবেক্ষক মহলে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন এবং জনগণের সবচেয়ে কাছের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ। এ কারণে এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। সবচেয়ে কাছের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। এ ছাড়া প্রায় ১০০ বছর ধরে নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ফলে এই নির্বাচনের প্রতি গ্রামের মানুষের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। এমনকি এটিকে তারা একটি উৎসবের উপলক্ষ হিসেবেও মনে করেন। সে হিসেবেই এই নির্বাচনের গুরুত্ব জনগণের কাছে অনেক বেশি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনও দলীয় প্রতীকে হলে গণতান্ত্রিক ভিত আরো শক্তিশালী হবে-এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত। তবে নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে স্বচ্ছ, অবাধ, নিরপেক্ষ, প্রশ্নমুক্ত ও সবার অংশগ্রহণমূলক। দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করার পরিবেশ দিতে হবে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেই ভোটাররা তাঁদের পছন্দের প্রার্থী বাছাই করার সুযোগ পান এবং এভাবে সৎ, যোগ্য ও আদর্শ প্রার্থীর নেতৃত্ব লাভের পথ তৈরি হয়।
দলের অংশগ্রহণে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিষয়টি আগে যা অনানুষ্ঠানিক ছিল, এখন তা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হলে স্থানীয় নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত হবে। কেবল সুশাসন ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন নয়, স্থানীয় সরকারব্যবস্থার কার্যকারিতাও বাড়বে। এর ফলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান সরাসরি যাচাই করার সুযোগ পাবে। গ্রামপর্যায় পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার কাজটিও হবে সহজ। নতুনতর ব্যবস্থা আমাদের জাতীয় রাজনীতির সর্বস্তরে রাজনীতি ঘনিষ্ঠতাকে উৎসাহিত করবে এবং সব পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আর ধারাবাহিকতা রক্ষা ও আইনের শাসন বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এটি নতুনতর সুযোগ তৈরি করবে।
অনেকের মতে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয় পরিচয়ে হলে তৃণমূলে রাজনৈতিক সহিংসতা বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনের মতো পেশিশক্তি ও অর্থবিত্তের প্রভাব খাটিয়ে দলীয় মনোনয়ন লাভ করা ও ভোট কেনাবেচার প্রবণতা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও দেখা দিতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন যথাযথ পদক্ষেপ নিলে এসব আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হবে। এ ক্ষেত্রে ভারতের নির্বাচন কমিশন চমৎকার উদাহরণ হতে পারে। বাস্তবে বাংলাদেশে বিদ্যমান সাংবিধানিক এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের গণ্ডির বাইরে নির্দলীয় ইউনিয়ন পরিষদ মূলত একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপস্বরূপ। আর স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও অর্থের নিরবচ্ছিন্ন জোগান অপরিহার্য। দেশের বর্তমান স্থানীয় অর্থনীতির কাঠামোর মধ্যে স্ব-অর্থায়নে স্থানীয় সরকার পরিচালনা সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশে তৃণমূল উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে কেন্দ্রীয় রাজনীতির উত্তরাধিকারের গুরুত্ব নিশ্চয়ই রয়েছে।
২০২১ সালকে লক্ষ্য করে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনে বর্তমান সরকারের যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে তৃণমূলে উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতারা জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেন। সুতরাং ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন ধাপ হলেও এর গুরুত্ব খাটো করে দেখার উপায় নেই। বরং বলা যেতে পারে, স্থানীয় সরকারই সামগ্রিকভাবে সরকারের সফলতা-ব্যর্থতার দর্পণ। সুতরাং দল, মত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু, সুন্দর ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের মজবুত কাঠামো গড়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।
লেখক : উপ-উপাচার্য, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস্ (বিইউপি) এবং প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদ (জানিপপ)

ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ