প্রতিক্রিয়া
মুক্তমনার পরিণতি কি তবে মৃত্যু!
যেহেতু তিনি সংস্কৃতি চর্চা করতেন সেহেতু তিনি মুক্তমনা মানুষ; সুতরাং যা ঘটেছে তা স্বাভাবিক কিংবা পরিণতি। বলছিলাম সদ্য খুন হওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর কথা। জানা যায়, শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সঙ্গীতের একটি স্কুল চালাতেন, নিজেও সেতার বাজাতেন এবং সাহিত্য সংস্কৃতিবিষয়ক একটি পত্রিকা সম্পাদনাও করতেন। আর যিনি সাহিত্য বা সংস্কৃতি চর্চা করবেন তাঁকে আমরা মুক্তমনা হিসেবে চিহ্নিত করেছি। কিন্তু মুক্তমনা শব্দটি এখন আতঙ্কের নাম। এটাই সত্য। অনেকের ধারণা, মুক্তমনার কপালে মৃত্যু স্বাভাবিক নেই। ক্ষেত্র বিশেষে মনে হয় আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরাও একই ধারণা পোষণ করেন; মুক্তমনা মানে তাকে একটি গোষ্ঠী কুপিয়ে হত্যা করতেই পারে। তাই তো এমন কোনো হত্যাকাণ্ডের পর দেখা যায়, পুলিশ প্রশাসন তাৎক্ষণিক বলে দেন, উনি আসলে কি ধরনের লেখা লিখতেন এবং তাঁর কর্মকাণ্ডগুলো কোনো ব্যক্তি বিশেষের খারাপ লেগেছে কি না খতিয়ে দেখতে হবে।
এখানে অপরাধটি মুখ্য নয়, মুখ্য হয়ে যায় ভিকটিমের বিগত দিনের মুক্তবুদ্ধির চর্চাটা। আর ব্যাপারটি এমন হয়ে গেছে যে, ‘মুক্তমনা’ টাইপের এমন কিছু হলেই বোধ হয় পুলিশ বাঁচে। কারণ এই ঘটনার আর কোনো কূল কিনারা না করতে পারলেও সমস্যা নেই। এসব ঘটনার বিচারের অগ্রগতি আশাব্যঞ্ছক নয়, তেমনি জবাবদিহির জায়গায়ও হতাশাজনক চিত্র। বিগত দিনের একই কায়দায় ঘটে যাওয়া ঘটনারগুলোর বিচারের কার্যক্রম সেটাই প্রমাণ করে।
সারা দেশের ঘটনাগুলোর কথা বাদই দিলাম শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গই যদি টেনে আনি তাহলে কি দেখতে পাই আমরা? গত এক যুগে চার শিক্ষককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের শিকার সব শিক্ষক ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তার। শিক্ষক মাত্রই আলোকবর্তিকা, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তো শুধু তার শিক্ষার্থী নয়, আলোর পথ দেখান সমাজ ও দেশকে। কারণ তাঁদের বুদ্ধিভিত্তিক বক্তব্য নেতৃত্বকে সঠিক পথে রাখতে সহায়ক হয়। অথচ ঘটনাগুলো থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই বার্তাই কি পাচ্ছেন না, তাঁরা কেবল শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বইয়ের ভিতরে থেকে পাঠদান করাবেন, লেখালেখি বলতে শুধু পাঠ্য বই রচনা করতে পারবেন; ব্যস এতটুকই। এই পরিস্থিতি থেকে একটি সমাজ বিকশিত হবে কীভাবে? এখনো আমরা রুগ্ন সমাজে আছি; তাহলে কি সামনের দিনগুলো আরো অন্ধকার? এই পরিস্থিতির উত্তরণ না ঘটলে ভবিষ্যৎ একটি প্রতিবন্ধী সমাজ উপহার পাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কুপিয়ে হত্যার চেষ্টায় মারাত্মকভাবে আহত সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক হুমায়ন আজাদ স্যারের একটি লেখার শিরোনাম টেনে এনে আমার লেখায় সমাপ্তি টানছি, ‘আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?’
লেখক : আইনজীবী ও নির্বাহী পরিচালক, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘স্বপ্ন’।

ড. বদরুল হাসান কচি