দৃষ্টিপাত
ঈদে আনন্দ-যোগ ও বিষাদ-বিয়োগ
ঈদ মানেই আনন্দ। ঈদ মানেই স্বস্তি। আর সেটা যদি উৎসবপ্রিয় বাঙালির জন্য হয়, তবে তো কথাই নেই। কোনো কিছু দিয়েই বাঙালির কোনো প্রাণের উৎসব থামানো যায় না। বাঙালির এসব প্রাণের উৎসব ধর্মীয় সংকীর্ণতা পেছনে ফেলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলে সব সময়। প্রতিবছর বাঙালি মুসলমানদের জন্য আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে দুটি ঈদ। তার একটি রমজানের ঈদ বা ঈদুল ফিতর আর আরেকটি হলো কোরবানির ঈদ বা বড় ঈদ কিংবা ঈদুল আজহা। ঈদের আনন্দকে আরো অর্থবহ, প্রাণোচ্ছল, স্থায়ী এবং ঈদের আগে-পরে ভ্রমণের ঝক্কি-ঝামেলা কমানোর জন্য সরকার বিশেষভাবে টানা ছুটির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এবারেও প্রধানমন্ত্রী ঈদের ছুটিতে ঈদকে আনন্দময় ও পারিবারিক বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করার জন্য একদিন বাড়তি নির্বাহী আদেশে ছুটি ঘোষণা করেছিলেন। সে জন্য সরকারি কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মজীবীরা ঈদের পাঁচ দিন আগে, অর্থাৎ ৮ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার তাঁদের শেষ অফিস করে যাঁর যাঁর গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা করে কিছুটা হলেও স্বস্তির সঙ্গে বাড়িতে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন। আর বেসরকারি চাকরিতে থাকা কর্মজীবীরা সরকার ঘোষিত সেই ১১ সেপ্টেম্বরের বিশেষ ছুটির সুযোগ না পাওয়ায় তাঁদের একেবারে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত কষ্ট করে যানজট ঠেলে বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেখানেই হয়েছে যত বিপত্তি।
দীর্ঘ যানজটে পড়ে তাঁদের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। আনন্দের ঈদযাত্রা হয়েছে বিষাদময়। আমরা জানি, আমাদের রাজধানী ঢাকা শহর হলো বিশ্বের যেকোনো শহরের চেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে বর্তমানে প্রায় দুই কোটি লোক বাস করে। যেখানে সারাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি, সেখানে ছোট্ট একটি ঢাকা শহরের জনসংখ্যা দুই কোটি, কল্পনা করা যায় না! সেই ঢাকা শহর থেকে ঈদে প্রায় অর্ধেকের বেশি মানুষ ঈদোৎসব পালনের উদ্দেশ্যে শেকড়ের টানে তাঁদের গ্রামের বাড়িতে প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে ছুটে চলে যান। সারা দেশের মানুষই ঢাকা শহরে তাঁদের বিভিন্ন কর্মের খাতিরে বসবাস করে থাকেন। সেই কর্মজীবী মানুষের চারদিকে ছুটে চলার যে ঢল শুরু হয়, তা মাত্র দু-তিন দিনে সম্পন্ন করার প্রয়োজন পড়ে। আর ঢাকা থেকে বের হওয়ার জন্য জল-স্থল-অন্তরীক্ষ সব দিকেই পথ খোলা রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, একসঙ্গে এত মানুষের একত্রে যাত্রা। বাংলাদেশে অন্তরীক্ষে চলার পথ খুবই সীমিত এবং তা সাধারণ মানুষের চিন্তারও বাইরে। বাকি থাকে জল ও স্থল। জলযানের জন্য ঢাকার পার্শ্ববর্তী ভরাট-দখল-দূষণে আক্রান্ত একমাত্র বুড়িগঙ্গাই ভরসা। সেখান থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাত্র কয়েকটি জেলার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে, যা খুবই সীমিত। তার পরও তা সড়ক যোগাযোগের চেয়ে অনেক নিরাপদ এবং ব্যয় সাশ্রয়ীও বটে। বাকি থাকে স্থল যোগাযোগের মধ্যে সড়ক যোগযোগ ও রেল যোগাযোগ। রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ দ্বারা স্থাপিত সে সময়কার রেলের বাইরে দীর্ঘ সাত দশকে তেমন কোনো উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো লক্ষ করা যায়নি। তবে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু হওয়ার পর পূর্বাঞ্চলীয় রেলের সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের রেলের একটি বিরাট ও সম্ভাবনাময় নতুন দ্বারের উন্মোচন হয়েছে। এ ধারা আরো বেশি সূচিত হবে ২০১৮ সালে স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর। তাই বিভিন্ন স্থানে নতুন রেললাইন স্থাপন করে এর সম্প্রসারণসহ রেলে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বগি। এতে রেলে আগে যেকোনো সময়ের তুলনায় যাত্রীসেবার মানও উন্নত হয়েছে। সড়ক পরিবহনের চেয়ে রেলে নিরাপদ ও ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়ার কারণে আস্তে আস্তে রেলের যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন। আর সে কারণেই ঈদ এলে এর চাহিদা আরো বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়ে যায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-জামালপুর, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-রংপুর-দিনাজপুর, ঢাকা-খুলনা এবং সর্বোপরি ঢাকা-বেনাপোল-কলকাতা ইত্যাদি বিভিন্ন রুটে রেল চলাচল করছে এখন। প্রায় সারাদেশেই এখন সড়ক পরিবহনের জন্য উপযুক্ত। তাই সবার শেষ ভরসাও এখন সড়ক যোগাযোগের ওপর। ঢাকা থেকে এখন দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা এবং কোনো কোনো উপজেলায়ও সরাসরি সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। এসব জায়গায় যাতায়াতের জন্য এখন যেমন রয়েছে বিভিন্ন বিলাসবহুল ও আরামদায়ক গাড়ি, আবার তেমনি রয়েছে অতিসাধারণ ও মধ্যম মানের যানবাহনও। কাজেই সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এখন অতি সহজেই এসব যানবাহনে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারে। তবে ঢাকা থেকে মূলত সিলেট, চট্টগ্রামসহ পূর্ব, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এলাকাগুলোতে যাতায়াতের জন্য যাত্রীরা সাধারণত যাত্রাবাড়ী বহির্নির্গমন পথ, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে ভ্রমণের জন্য ঢাকা-মাওয়া রাস্তার মাতুয়াইল বহির্নির্গমন পথ, উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে ভ্রমণের জন্য গাবতলী বহির্নির্গমন পথ এবং ঢাকার অদূরবর্তী উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের কিছু এলাকায় ভ্রমণের জন্য মহাখালী বহির্নির্গমন ইত্যাদি পথ ব্যবহার করে মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় যোগাযোগের যাতায়াতকার্য সম্পন্ন করে থাকে।
আগেই বলেছি, ঢাকায় বসবাসকারী প্রায় দুই কোটি মানুষের ব্যস্ততম এ ঢাকা শহর ঈদে একেবারে প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। আর পরিসংখ্যান বলে যে, সে সময় এক কোটির বেশি মানুষ মাত্র দু-তিন দিন সময়ের মধ্যে এই ঢাকা শহর ছাড়ে। এত অল্প সময়ের মধ্যে এ বিপুল পরিমাণ মানুষের মুভমেন্ট করতে গিয়েই চারদিকে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়, যার বহিঃপ্রকাশ দেখার জন্য আমরা যদি ঈদের আগে-পরে মানুষ বোঝাই লঞ্চ-স্টিমার-জাহাজ, বাসসহ অন্যান্য সড়ক যানবাহন এবং রেলের বগির দিকে তাকাই, তাহলেই বিষয়টি সকলের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য বাড়িতে নাড়ির টানে ছুটে যাওয়ার কী যে আবেগ, তা যিনি যাচ্ছেন কেবল তিনিই এর সঠিক অনভূতিসহ ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। অনেকে বাসের-ট্রেনের-লঞ্চের ছাদে চড়ে, বাদুরঝোলা হয়ে যেতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। এভাবে ভ্রমণের অনেক মারাত্মক ঝুঁকি থাকে। এমনকি মাঝেমধ্যে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে অনেকে মূল্যবান প্রাণও হারান। কিন্তু আনন্দের কাছে যেন জীবনের কোনো মূল্যই নেই। মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করে সবাই ছুটে চলে নাড়ির টানে। ঈদ এলেই যেহেতু বাড়িফেরা মানুষের যাতায়াতের একটি ভোগান্তির বিষয় জড়িয়ে যায়, সে জন্য আগে থেকে সরকারি নির্দেশে একটি নির্দিষ্ট সময় পূর্বে প্রতিটি যানবাহনের জন্য অগ্রিম টিকেট দেওয়া হয়ে থাকে। সেই টিকেট সংগ্রহ করতে গিয়েও অনেকে হিমশিম খেয়ে যান। কারণ সেখানে একটি টিকেট সংগ্রহ করার জন্য লম্বা লাইনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তার পরও অনেক সময় টিকেট নামের সেই সোনার হরিণের দেখা পান না অনেকে। যদিও বা অনেক কষ্ট করে টিকেট সংগ্রহ করলেন, তার পরে বাকি থাকে অফিসের বড়কর্তার কাছ থেকে নির্ধারিত দিনে এবং সময়ের জন্য ছুটি পাওয়ার বিষয়টি। সেটিও যদি পাওয়া যায়, তার পরে শুরু হয় গাড়িতে উঠে ভ্রমণযুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়টি। প্রতিটি কাজই যেন একেকটি যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করে দিতে হয় সবাইকে। এর মধ্যে থাকে গাড়ির শিডিউল বিপর্যয়, অর্থাৎ সময়ের গাড়ি সময়ে ফিরে না আসা এবং সময়মতো ছাড়তে না পারা। সে জন্য যাত্রীদের ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ির অপেক্ষায় স্টেশনে বসে থাকার নজিরও রয়েছে, যা খুবই অস্বস্তিকর। তার পরে রাস্তায় বেরিয়েও যেন শান্তি নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে রাস্তায় আটকে থাকতে হয় যাত্রীদের। কোনো কোনো ঈদে যানজটের কারণে এমনও হয়েছে যে, কারো কারো ঈদ রাস্তাতেই সম্পন্ন করতে হয়েছে। তারা ঈদের আগে আর সেই স্বপ্নের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছাতে পারেননি। আর প্রতি ঈদের আগে কিংবা অন্য যেকোনো সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনার কথা না হয় বাদই রাখলাম। এই তো এ বছরের রমজানের ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তো এবারের ঈদেও ছিল পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সে কারণেই হয়তো এবারে কোরবানি ঈদে কোনো ধরনের নাশকতামূলক ঘটনা ঘটানোর সুযোগ পায়নি। কিন্তু ঈদের আগে টঙ্গীতে ‘ট্যাম্পাকো’ নামক একটি ফয়েল কোম্পানিতে তাদের বয়লার বিস্ফোরিত হয়ে সেখান থেকে আগুন লেগে প্রায় কমপক্ষে সর্বশেষ ৩৫ জন লোকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। আহত হয়েছে শতাধিক কর্মজীবী শ্রমিক এবং ঈদের দুদিন পর পর্যন্তও নিখোঁজ রয়েছে আরো কমপক্ষে আট থেকে দশজন। তাঁদের ভাগ্যেও হয়তো মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করতে হয়েছে। হয়তো আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তাঁদের রক্ত-মাংসের দেহখানি। তাঁদের আর ঈদ উদযাপন করা হলো না পরিবারের সঙ্গে। দুর্ঘটনার পর নিকটাত্মীয়দের মাধ্যমে অনেকের আবেগময় অনুভূতির কথা জানা গেছে সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে। তাঁদের কেউ কেউ গ্রামে থাকা ছোট্ট শিশুটির জন্য নতুন জামা কিংবা জুতা কিনে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একটি মাত্র দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে তাঁদের সারা জীবনের স্বপ্ন। এগুলো দুর্ঘটনা ঈদ আনন্দকে বিষাদময় করে তুলেছে।
কিন্তু তার পরও শেষ বিচারে দিন শেষে আনন্দেরই জয় হয়েছে। এর ভেতরেই কেউ কেউ বাড়িতে গিয়ে মেতে উঠেছে ছেলেবেলার নস্টালজিয়ায়, পাড়া-মহল্লায় ক্লাব-সমিতির বিভিন্ন সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে। আবার কেউ কেউ তাঁদের অনেক পুরোনো বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে দাড়িয়াবাঁধা, কাবাডি, ক্রিকেট কিংবা ফুটবল খেলায় মেতে উঠেছে। ঢাকাসহ সারা দেশে ছোট-বড় প্রায় এক কোটি পশু স্বাচ্ছন্দ্যে কোরবানি করা হয়েছে। কোরবানির পরপরই পশুর বর্জ্য অপসারণে এখন মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। সে জন্য রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য অপসারণ করতে অনেকাংশে সফল হয়েছে। ঈদে বাড়ি ফেরার আনন্দ শেষ হতে না হতেই আবার কর্মস্থলে ফেরার সময় শুরু হয়ে গেছে। সে জন্য ফিরতেও শুরু করেছে এরই মধ্যে অনেকে। ফেরার সময়ও বিভিন্ন যানবাহনে ঠিক আগের মতই ভিড়ের চিত্র চোখে পড়ছে। তবে এত কিছুর পরেও আনন্দের জন্য ঈদটি সামনের এক বছরের জন্য স্মৃতিময় হয়ে থাকে। সেখানে ছোটখাটো ঘটনা-দুর্ঘটনা তেমন কোনো বিষাদের ছায়া ফেলে ঈদ আনন্দকে ম্লান করতে পারে না।
লেখক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ড. মো. হুমায়ুন কবীর