বিশ্ব নদী দিবস
ডাকাতিয়া নদী রক্ষায় প্রধান সমস্যাসমূহ
সমাজ-সভ্যতার সঙ্গে আমাদের জীবন সংসার অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আমাদের চারপাশের পরিবেশ আমাদের জীবনধারণের জন্য এবং আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু বায়ুর সমুদ্রে থেকে যেমন ভুলে যাই বায়ুর কথা- তেমনি আমরা আমাদের বেঁচে থাকার যে সহায়ক উপাদান পরিবেশ, সেই পরিবেশের কথা আমরা ভুলে যাই।
কিন্তু সবাই তো আমাদের মতো নন, কিছু মানুষ আছেন যাঁরা আত্মবিস্মৃত নন, তাঁরা জানেন বেঁচে থাকার জন্য এই পরিবেশের মূল্য কী। কীভাবে এই পরিবেশ আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে আপন সন্তানের মতো। আমাদের নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য আমরা যার যার মতো ব্যস্ত। নিজের হাতেই ক্রমাগত ধ্বংস করছি নিজেদের বেঁচে থাকার এই পরিবেশ। কিন্তু আমাদের অস্তিত্ব টিকে রাখতে হলে অবশ্যই আমাদের পরিবেশকে বাঁচাতে হবে। মানবদেহের হৃৎপিণ্ড যেমন সারা দেহে রক্ত সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক তেমন নদী পরিবেশের সব উদ্ভিদ ও প্রাণিকূলের জন্য পানি সরবরাহ করে। আর পানির অপর নাম জীবন। তাই আমাদের বেঁচে থাকার জন্য নদীর ভূমিকা অপরিসীম।
তাই বাংলাদেশের কুমিল্লা, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদী রক্ষা করা আবশ্যক। কিন্তু বর্তমানে ডাকাতিয়া নদী রক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যাগুলো নিম্নরূপ :
অবৈধভাবে নদী দখল
চাঁদপুর জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) অমীমাংসিত মালিকানায় দখলের তোড়জোড় চলছে ডাকাতিয়া নদীর দুই তীরে। এক শ্রেণির ভূমিদস্যু নদীটির দুই তীরে গড়ে তুলছে একের পর এক স্থাপনা। নির্মিত হচ্ছে বহুতল ভবন। মরে যাচ্ছে একসময়ের সেই খরস্রোতা ডাকাতিয়া। আইন প্রয়োগ করে ডাকাতিয়া রক্ষকরাই আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে তথাকথিত ভূমিদস্যুদের সাহায্য করছে। ফলে দিন যত যাচ্ছে, ততই স্থাপনা বাড়ছে ডাকাতিয়ার দুই তীরে। ক্রমেই থেমে যাচ্ছে ডাকাতিয়ার খরস্রোত, তর্জন-গর্জন এবং জোয়ার-ভাটার প্রাবাল্য। মারাত্মক পরিবেশ ও কৃষি বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালীর লাখ লাখ মানুষ। ২০০৮ সালের নভেম্বরে জেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ এবং চাঁদপুর পৌরসভার যৌথ জরিপ অনুযায়ী, বড় স্টেশন মোলহেডের কাছে মোহনা থেকে ইচলি পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার নদীর দুই তীরে প্রায় ১৩৬টি স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে চাঁদপুর জেলা প্রশাসন ৩৪টি স্থায়ী, ৫৮টি অস্থায়ী, পৌরসভা ১৫টি স্থায়ী, আটটি অস্থায়ী এবং বিআইডব্লিউটিএ চারটি অস্থায়ী লিজ প্রদান করে। এর বাইরে আরো ১৭টি ব্যক্তি মালিক দাবিদারের স্থাপনা রয়েছে। বর্তমানে নদীটির দুই তীরের দখলদারের সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক।
নদী, ফোরশোর ল্যান্ড, খাস সব জমির মালিক ভূমি মন্ত্রণালয়। ১৯৬০ সালে চাঁদপুরকে বন্দর ঘোষণার পর ডাকাতিয়ার দুই পাড়ের ১৩০ একর সম্পত্তি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিআইডব্লিউটিএকে লিজ দেওয়া হয় ৩০ বছরের জন্য। ১৯৯০ সালে সেই মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর আরো ১৩ বছরের জন্য সেই লিজ নবায়ন করা হয়। যার মেয়াদ শেষ হয় ২০০২ সালে। এরপর অদ্যাবধি তাদের লিজ নবায়ন করা হয়নি। তাই বিআইডব্লিউটিএর বর্তমানে ডাকাতিয়ার দুই তীরে নিজস্ব কোনো জায়গা নেই।
১৯৬০ সালে সরকার গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে চাঁদপুরকে নৌবন্দর ঘোষণা করে। সে সময় ডাকাতিয়ার দুই তীরের ফোরশোর ল্যান্ড রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিআইডব্লিউটিএকে সংরক্ষক নিযুক্ত করে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আইন অনুযায়ী, ভরা বর্ষায় নদীর পানি দুই তীরে যতটুকু ওঠে, তার ৫০ গজ দূরত্ব পর্যন্ত ভূমিকে ‘ফোরশোর ল্যান্ড’ বলে। ভূমি মন্ত্রণালয় দুই দফা প্রায় ৪৩ বছরের জন্য ফোরশোর ল্যান্ড বিআইডব্লিউটিএকে লাইসেন্স করে দেয়।
হঠাৎ করে ওই মেয়াদ শেষ হলে ২০০৩ সাল থেকে ওই ভূমির লিজ নবায়নে জেলা প্রশাসন অনীহা প্রকাশ করে। অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএর লিজের মেয়াদ শেষ হওয়ার বহু আগে থেকেই অর্থাৎ ১৯৯০ সাল থেকে জেলা প্রশাসন চাঁদপুর নদীবন্দরের তীর ভূমি বিভিন্ন ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে স্থায়ী/অস্থায়ী লিজ দেওয়া শুরু করে। সেই থেকে লিজগ্রহীতারা ডাকাতিয়ার দুই পাড় দখলের প্রতিযোগিতায় নামে। তারা নদী ভরাট করে পাকা স্থাপনা, বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বহুতল ভবন নির্মাণ করে।
বিআইডব্লিউটিএর দাবি, জেলা প্রশাসন সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিক এবং অন্যায়ভাবে বিশেষ সুবিধা নিয়ে নৌবন্দরের জায়গা বিভিন্ন ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে লিজ দিয়েছে। অথচ মেয়াদ শেষে বিআইডব্লিউটিএকে বন্দরের জায়গাটির লাইসেন্স নবায়ন করে দেয়নি। ১৯৬০ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, বরিশাল ও টঙ্গীর সঙ্গে চাঁদপুরকে নৌবন্দর ঘোষণা করে। সে সময় বন্দর সীমানা নির্ধারণসহ বিআইডব্লিউটিএকে কনজারভেটর নিয়োগ করে। ওই গেজেট নোটিফিকেশনে নির্ধারিত সীমানার মধ্যে ফোরশোর ল্যান্ডের ১৩০ একর তীরভূমি বিআইডব্লিউটিএর অনুকূলে হস্তান্তর করে। নানা কারণে ওই পরিমাণ সম্পত্তির বিরাট অংশ এরই মধ্যে বেদখল হয়ে গেছে।
অন্যদিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম, হাজীগঞ্জে অবস্থিত ডাকাতিয়া নদীর বেশির ভাগ অংশই দখল হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নদীর ওপর অবৈধ বাঁধ তৈরি করা হয়েছে।
ভয়াবহ পরিবেশদূষণ
পরিবেশদূষণের কারণে গত ২০ বছরে নদীর ৮০ ভাগ মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে সুপারির মৌসুমে এক শ্রেণির সুপারি ব্যবসায়ী হাজার হাজার কাউন পাকা সুপারি চার-পাঁচ মাস নদীতে ভিজিয়ে রাখে। আর সুপারির বাকল পচে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুম এবং বোরো মৌসুমে ডাকাতিয়া নদী পানিশূন্য হয়ে পড়ে। অপরদিকে পানির ধারণক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় বর্ষার সামান্য বৃষ্টিতে ডাকাতিয়া টইটুম্বুর হয়ে পড়ে। নদীর দুই তীর উপচে জনপদে পানি ঢুকে পড়ে। সৃষ্টি হয় অকালবন্যার। সেচের অভাবে হাজার হাজার একর জমির ফসল শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যায়।
জীববৈচিত্র্য হ্রাস
এই নদীতে ইলিশ, চিংড়ি, বোয়াল, গজার, শোল ও অনেক ধরনের মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু নদী ভরাট ও পানিদূষণের কারণে নদীতে আগের মতো আর মাছ পাওয়া যায় না। ময়লা-আবর্জনা নদীতেই ফেলার ফলে নদীতে জলজ জীব বসবাস করার উপযোগিতা হারিয়ে ফেলছে। নদীর আশপাশের কৃষিজমিতে প্রচুর পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে নদীর পানির অণুজীবগুলো মরে যাচ্ছে। ফলে খাদ্যচক্রে এর প্রভাব পড়ছে ও বাস্তুতন্ত্র বিনষ্ট হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে ডাকাতিয়া নদীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ, বাঁধ নির্মাণ, নদী দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়া, অধিক মাত্রায় মৎস আহরণসহ মানবসৃষ্ট বিভিন্ন জটিলতার ফলে ডাকাতিয়া নদীর জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে।
অর্নিধারিত সীমানা
ডাকাতিয়া নদীর সীমানা অনির্ধারিত এবং এই নদীর কোনো সুনির্দিষ্ট ম্যাপ নেই। তাই দুষ্টচক্র এর সুযোগ নিয়ে অবাধে নদী দখল করছে ও নদীর আশপাশে অনেক অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলছে যা নদীর পানি ও পরিবেশ উভয়কেই দূষিত করছে।
এই সমস্যাগুলোর সমাধান হলে পুনরায় ডাকাতিয়া নদী তার হারানো যৌবন ফিরে পাবে বলে আশা রাখি।
লেখক : সাংবাদিক

জিল্লুর রহমান