দৃষ্টিপাত
রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, বিশ্ব নীরব
মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চলছে নৃশংস নির্যাতন। রাষ্ট্রের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করে সে দেশের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সীমান্তরক্ষীরা নির্বিচারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা করছে, অগ্নিসংযোগ করছে, তাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে জন্মভূমি থেকে। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগ থেকে ক্রমেই প্রবল হচ্ছে এই নির্যাতন। ১৯৭৮ সালে এই নির্যাতন নতুন মাত্রা অর্জন করে। ১৯৯০ সালে তা আরো বিস্তৃত হয়। এবার নির্যাতন-নির্মমতা এর আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমার সরকার স্বাধীনতার লগ্ন থেকেই নাগরিক অধিকার দিতে অস্বীকার করে আসছে। বারবার, প্রতিবার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আশ্রয়ের জন্য জীবনের অস্তিত্বের জন্য পাড়ি জমিয়েছে বাংলাদেশে। সেখানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী একরকম জীবন্মৃত। তারা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। যে যেদিকে পারে ছুটছে জীবন রক্ষার তাগিদে। আরাকান বা রাখাইন স্টেট যেহেতু বাংলাদেশসংলগ্ন, সেহেতু বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আশ্রয়ের জন্য আগমন সবচেয়ে বেশি।
অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এই বর্বর নির্যাতনের মুখেও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে অস্বীকার করছে বাংলাদেশ সরকার। একদিকে নির্মম-নৃসংশতা নিয়ে সে দেশের খোদ সরকার তাদের ওপর অন্যায় অত্যাচার চালাচ্ছে। অপরদিকে ভাতৃপ্রতিম সীমান্তবর্তী দেশ বাংলাদেশও তাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই মানবিক আশ্রয়টুকু তারা পেতে পারে। উদ্বাস্তু সংক্রান্ত জাতিসংঘ হাই কমিশন বাংলাদেশের প্রতি মানবিক আবেদন জানিয়েছে যে, তাদের যেন আশ্রয় দেওয়া হয়। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি এবং কোস্টগার্ডকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ যেন ডাঙায় বাঘ এবং পানিতে কুমির- প্রবাদের মতো। তাহলে এরা যাবে কোথায়? সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের হামলায় বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি উদ্বেগ প্রকাশ করে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে এরকম নিপীড়ন-নির্যাতনের পর বাংলাদেশের সরকার কি এতটাই নাজুক যে তারা সামান্য উদ্বেগটুকুও প্রকাশ করতে পারছে না! যাঁরা ভূ-রাজনীতি এবং কূটনীতি সম্পর্কে ধারণা রাখেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে স্বীকার করবেন যে, বাংলাদেশের শক্ত ভূমিকা রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধের বিষয়টি নির্ভর করে।
বার্তা সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে কমপক্ষে ৩০০ লোক নিহত হয়েছে। ১৫ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাড়িহারা হয়েছে। বাড়িঘরহীন, সহায়-সম্বলহীন এসব রোহিঙ্গা অনাহারে-অর্ধাহারে ঝোপ-ঝাড়ে, জঙ্গলে এবং মিয়ানমার সীমান্তে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছে। এদের একটি বড় অংশ নৌপথে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে। সচিত্র প্রতিবেদনে দেখা যায়, শত শত মৃত দেহ সারি সারি করে রাখা হয়েছে। কাউকে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কাপড় কেড়ে নিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাদের একত্রে করে জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা ইন্টারনেটে প্রকাশিত হয়েছে। হত্যার পাশাপাশি অসংখ্য ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। যে সেনাবাহিনী চূড়ান্তভাবে দেশের রক্ষক এবং নাগরিক নিরাপত্তার জন্য সর্বশেষ ঠিকানা, তারা রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় হেলিকপ্টার থেকে পাইকারি গুলিবর্ষণ করছে। হত্যা, ধরপাকড়, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াওসহ এমন কোন নির্মমতা অবশিষ্ট নেই যা সেখানে ঘটছে না।
এভাবে নিরীহ, অসহায় এবং নিরস্ত্র রোহিঙ্গারা মিয়ানমার শাসকগোষ্ঠীর বর্বরতার স্বীকার হয়ে অস্তিত্বের প্রান্তিক সীমায় পৌঁছেছে। এটি একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মানুষ হওয়ার কারণে যে অনিবার্য অধিকারগুলো নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে সেটিই আন্তর্জাতিক আইন-কানুন, রীতি-রেওয়াজ এবং ভদ্রতা-সভ্যতাকে নির্লজ্জের মতো লঙ্ঘন করে চলেছে। তাদের সাংবিধানিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কোনো অধিকারই নেই। মানবতাবাদী গৌতম বুদ্ধের আদর্শ যেখানে ‘জীব হত্যা মহাপাপ এবং অহিংস পরম ধর্ম’ সেখানে কতিপয় বৌদ্ধ মৌলবাদী হত্যা এবং হিংসার বাণীই শুধু প্রচার করছে না বরং, মুসলমানদের নির্মূল করার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছে। বসনিয়া ও হারজেগোভেনিয়াতেও বর্ণবিদ্বেষী, ধর্মবিদ্বেষী সার্ব জনগোষ্ঠী এভাবে মুসলিম নিধনযজ্ঞ চালিয়েছে। তারা এটাকে নাম দিয়েছিল ‘এথনিক ক্লিনসিং’ অর্থাৎ, গোষ্ঠীগত নিধন। ওই নিধনের শেষপর্যায়ে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ঘটলেও ততদিনে হাজার হাজার মুসলমানকে প্রাণ দিতে হয়েছে। শোনা যাচ্ছে এখানেও তাদের নিধনযজ্ঞের নাম ‘ক্লিন রোহিঙ্গা অপারেশন’। ৯ অক্টোবর সীমান্ত চৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার পর আরাকানজুড়ে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তারা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। হেলিকপ্টার গানশিপ ব্যবহার করে হত্যা করছে। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় দাঙ্গাবাজরা।
বিস্ময়ের ব্যাপার যে, এই অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এক রকম নিশ্চুপ হয়ে আছে। সহিংসতা বন্ধে জাতিসংঘ বা অন্য কোনো সংগঠনের তরফ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে না। জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ঘটনায় শুধুই আবেদন ও উদ্বেগের মধ্যে তাদের দায়িত্ব সীমিত করেছে। তারা অনুরোধ করেছে- মিয়ানমার সরকার যেন সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করে। কিন্তু তাদের এই আহ্বান মিয়ানমার সরকারের নির্মমতার নীতিকে পরিবর্তন করতে পারবে বলে মনে হয় না । কারণ তারা রোহিঙ্গাদের নাগরিক বলেই গণ্য করে না। রাষ্ট্রে রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার তো দূরের কথা বসবাসের অধিকারটুকু ক্রমাগত অস্বীকার করে আসছে। তারা অমানবিক মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে না বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। সবচেয়ে বিস্ময় এবং দুর্ভাগ্যের বিষয় মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্বশীল ওআইসি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা তো দূরে থাকুক ‘উৎকণ্ঠাও’ প্রকাশ করছে না।
মনে হয় তারা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নৃশংসতার কাছে বলি দিতে প্রস্তুত রয়েছে। জাতিসংঘ বাংলাদেশের কাছে আবেদন জানিয়েছে যে, সীমান্ত যেন রোহিঙ্গাদের জীবনরক্ষার জন্য খোলা রাখা হয়। উল্লেখ্য যে, পৃথিবীব্যাপী এই রকম অন্যায়-অনাচার রোধে সীমান্তবর্তী দেশের মানবিক আচরণ আশা করা হয়। আগেই বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ সে ন্যূনতম মানবিক সহানুভূতি দেখাতেও রাজি নয়। বরং, কিছু মতলববাজ রাজনীতিবিদ- মৌলবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তার ধুয়া তুলে মানবিক আবেদনকে নাকচ করতে চাইছে। কিছু বুদ্ধিজীবী এ বক্তব্যের সমর্থনে নানাভাবে বক্তব্য হাজির করছেন।
তথাকথিত মানবতার দাবিদার অং সান সু চি রোহিঙ্গাদের অধিকারের সপক্ষে কথা বলছেন না। তাঁর এই অমানবিক এবং অন্যায্য সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী তিনি সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। অবশেষে অং সান সু চিকেও বর্ণবাদী বলে মনে করা হচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে মুক্ত হওয়ার পর একবারও তিনি রোহিঙ্গা মুসলমানদের পক্ষে মানবিক কোনো কথা উচ্চারণ করেননি। বিগত নির্বাচনে তিনি তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি-এনএলডির পক্ষ থেকে একজন মুসলমান প্রার্থীও দাঁড় করাননি। এখন সু চির মনোভাব এতটাই অনমনীয় যে, হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে তিনি শুধু নিশ্চুপই নন, সেখানকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্টক মার্শেলকে বলেছেন, অত্যাচারিতদের রোহিঙ্গা নামে না ডাকতে। বিস্ময়ের ব্যাপার শত শত বছর পরও সু চি তথা মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি মুসলিম বলে অভিহিত করতে চায়।
বিবিসির সাংবাদিক মিশাল হোসেনকে সু চি একটি সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার নিন্দা জানাতে অস্বীকার করেন। পরে তিনি মন্তব্য করেন যে, মিশেল হোসেন যে একজন মুসলমান তা তাকে জানানো হয়নি। মুসলমানদের সব সময়ই নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ মনে করা হয়। ২০১৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী পাঁচ কোটি মানুষের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। তাদের অধিকাংশের বসবাস আরাকান বা রাখাইন প্রদেশে। এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী কী করে মিয়ানমারের গরিষ্ঠ জনসংখ্যার প্রতি হুমকি হয়ে উঠতে পারে তা একটি বড় ধরনের প্রশ্ন। অন সাং সু চির এই মুসলিম বিদ্বেষের জন্য এখন হাজার হাজার মানুষ অনলাইনে স্বাক্ষর করে শান্তির জন্য পাওয়া নোবেল প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। স্মরণ করা যেতে পারে, তাঁকে যখন নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় তখন বলা হয়েছিল ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য অহিংস পন্থায় সংগ্রামের জন্য’ তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হলো। তিনি এশিয়ায় গণসাহসিকতার অনন্য সাধারণ নজির, নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক’। এর আগে আন্তর্জাতিক চাপ বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ওবামার চাপে রোহিঙ্গা বিষয়ে কিছুটা নমনীয়তা দেখায়। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, নিরসন এবং সুপারিশ প্রদানের জন্য একটি কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন সাম্প্রতিককালে মিয়ানমার সফর করে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং মিয়ানমার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি অনুধাবন করে সহজেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে, মিয়ানমার এখনো ‘মগের মুল্লুক’ই রয়ে গেছে। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি সেখানে এখনো কার্যকর। কোনো নীতি-আদর্শ, আবেদন-নিবেদন মিয়ানমারের তথাকথিত শক্তিমানদের সংহত করতে পারবে না। সুতরাং ‘মুগুর চাই’। বিবেক, মায়ামমতাহীন মিয়ানমার সরকারকে যথার্থ এবং সার্থকভাবেই বাংলাদেশের তরফ থেকে মোকাবিলা করা না হলে সহসা রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো সমাধান আশা করা যায় না। তাই বাস্তবতার আলোকে ‘মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব এবং রোহিঙ্গাদের স্বায়ত্তশাসন’ এই নীতিগত কাঠামোর মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। আমরা আশা করব, দ্রুত মিয়ানমার সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ড. আবদুল লতিফ মাসুম