টানা দ্বিতীয় শিরোপার লক্ষ্য স্কালোনির নতুন আর্জেন্টিনার
কাতার বিশ্বকাপের সেই লুসাইল স্টেডিয়ামের জাদুকরী রাত আর লিওনেল মেসির হাতে সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরার দৃশ্য আজও ফুটবলপ্রেমীদের চোখে টাটকা। তবে অতীত উদযাপনে মজে থাকার দল যে আর্জেন্টিনা নয়, তা তারা প্রমাণ করেছে মাঠের পারফরম্যান্সে।
২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয় এবং দক্ষিণ আমেরিকান বাছাইপর্বের শীর্ষস্থান ধরে রেখে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আলবিসেলেস্তেরা এবার পা রাখছে উত্তর আমেরিকার বিশ্বমঞ্চে। এটি আর্জেন্টিনার ১৯তম বিশ্বকাপ অভিযান।
১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের টানা দু’বার বিশ্বকাপ জয়ের পর ইতিহাসের প্রথম দল হিসেবে ‘ব্যাক-টু-ব্যাক’ বিশ্বজয়ের অনন্য কীর্তি গড়ার লক্ষ্যেই এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর সবুজ গালিচায় নামছে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা।
ডাগআউটে বিশ্বজয়ী মাস্টারমাইন্ড স্কালোনি
২০১৮ সালে হোর্হে সাম্পাওলির বিশৃঙ্খল অধ্যায়ের পর লিওনেল স্কালোনি যখন আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নেন, তখন অনেকেই তাকে কেবল একজন ‘অস্থায়ী’ কোচ ভেবেছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সাবেক রাইট-ব্যাক আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতিকেই বদলে দিয়েছেন। আলবিসেলেস্তেদের ডাগআউট সামলাতে যাচ্ছেন টানা দুটি বিশ্বকাপে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর দূরদর্শী চিন্তা করেছিলেন স্কালোনি। দ্রুত সাফল্য না খুঁজে তরুণদের ওপর ইনভেস্ট করেছিলেন তিনি। যে কারণে দলে রদ্রিগো ডি পল, লাউতারো মার্টিনেজ ও জিওভানি লো চেলসোর মতো নতুন প্রতিভাদের তুলে এনেছিলেন। নতুন আর অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে দলের মধ্যে তৈরি করেছেন এক অপরাজেয় মানসিকতা।
তিন দশকের ট্রফির খরা কাটিয়ে ২০২১ কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, ২০২২ বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকার ব্যাক-টু-ব্যাক ট্রফি জয়— স্কালোনির হাত ধরেই আর্জেন্টিনা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা সোনালী সময় পার করছে।
বাছাইপর্বে দারুণ ছন্দময় আর্জেন্টিনা
দক্ষিণ আমেরিকান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ৫ ম্যাচ হাতে রেখেই সবার আগে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। বাছাইপর্বে উড়ন্ত ছন্দে ছিল আলবিসেলেস্তেরা। যেখানে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি ব্রাজিলকে ৪-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দেয় তারা। বাছাইপর্ব শেষ করেছে টেবিলের শীর্ষে থেকেই।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ম্যাচসূচি
গ্রুপ পর্বে আফ্রিকা ও ইউরোপের শক্তিশালী রক্ষণের মুখোমুখি হতে হবে আর্জেন্টিনাকে। বাংলাদেশ সময় ১৭ জুন কানসাস সিটির চিমাক স্টেডিয়ামে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শিরোপা ধরে রাখার মিশন শুরু করবে আর্জেন্টিনা। ২২ জুন ডালাস স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া। ২৮ জুন একই স্টেডিয়ামে জর্ডানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলবে তারা।
পজিশনভিত্তিক স্কোয়াডের গভীরতা
কাতারের বিশ্বজয়ী মূল কাঠামোর ওপর ভরসা রেখেই ২৬ সদস্যের ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড সাজিয়েছেন লিওনেল স্কালোনি, যেখানে রিয়ালের তরুণ তুর্কি মাস্তানতুয়ানো জায়গা না পেলেও যোগ হয়েছে নতুন কিছু মুখ।
গোলপোস্টের নিচে যথারীতি থাকছেন ‘পেনাল্টি শুটআউট স্পেশালিস্ট’ ও ‘বাজপাখি’ খ্যাত বিশ্বসেরা গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। বড় ম্যাচে তার মনস্তাত্ত্বিক লড়াই আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা।
ক্রিস্টিয়ান রোমেরো এবং লিসান্দ্রো মার্টিনেজের ইস্পাতকঠিন জুটি ডিফেন্সের মূল ভরসা। অভিজ্ঞ ওটামেন্দির পাশাপাশি নাহুয়েল মোলিনা, গঞ্জালো মন্তিয়েলরা রাইট-ব্যাক পজিশনে শক্তি বাড়িয়েছে।
মাঝমাঠে ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ ও ম্যাক অ্যালিস্টারের রসায়ন খেলা নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি। এর সঙ্গে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা নিকো পাজ ব্যাক-আপ হিসেবে দলের গভীরতা বাড়িয়েছেন। আক্রমণভাগে অধিনায়ক লিওনেল মেসির জাদুকরী উপস্থিতির সঙ্গে লাউতারো মার্টিনেজ ও জুলিয়ান আলভারেজের ফিনিশিং প্রতিপক্ষের ডিফেন্স চূর্ণ করতে প্রস্তুত।
স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা
বিশ্বের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে ৬টি বিশ্বকাপ খেলা মেসির উপস্থিতিই দলের বড় শক্তির জায়গা। তিনি মাঠে থাকলে আর্জেন্টিনা যেন অন্যরকম শক্তি পায়। সেই সঙ্গে তার অভিজ্ঞতা ও পারফরম্যান্স আলবিসেলেস্তেদের শিরোপা জয়ে বড় সহায়ক হবে।
গত ৪ বছরে ৪টি বড় ট্রফি জয়ের ফলে দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে এক অপরাজেয় মনস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে নকআউট পর্বে ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ালে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের পোস্টের নিচে থাকাটাই প্রতিপক্ষের জন্য বড় ভয়ের কারণ। আর আলবিসেলেস্তেদের জন্য বড় স্বস্তির কারণ।
তবে আর্জেন্টিনার এই দলে কিছুটা অস্বস্তিও রয়েছে। ৩৯ বছর বয়সে এসে আমেরিকার তীব্র গরমে ব্যাক-টু-ব্যাক ম্যাচে মেসি কতটা ফিটনেস ধরে রাখতে পারেন, তা বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকবার চোটের মধ্যেও পড়তে হয়েছে তাকে।
মেসি ছাড়াও দলের কয়েকজন ফুটবলারের শারীরিক অবস্থা তাদের জন্য চিন্তার কারণ। মাত্রই চোট কাটিয়ে ওঠেছেন কয়েকজন তারকা। তারা মাঠে কতটা ফিটনেস ধরে রাখতে পারবে সেটি বড় একটি প্রশ্ন।
এছাড়াও আর্জেন্টিনার জন্য আরেকটি দুঃশ্চিন্তার কারণ রয়েছে। স্কালোনির এই স্কোয়াডে সেন্টারব্যাকের পর্যাপ্ত অপশন নেই। ক্রিস্টিয়ান রোমেরো এবং লিসান্দ্রো মার্টিনেজের মধ্যে কেউ চোটে পড়লে ব্যাক-আপ নিয়ে চিন্তা করতে হবে স্কালোনিকে। পজিশন বদল করে হয়তো অন্য কাউকে খেলাতে হবে এই পজিশনে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রেকর্ড বুক
১৯৭৮ সালে কেম্পেসের জাদুতে ঘরের মাঠে প্রথম শিরোপা, ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোর মাটিতে ডিয়েগো ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ জয় এবং ২০২২ সালে কাতারের মরুর বুকে মেসির হাত ধরে ফুটবল ইতিহাসের সেরা ফাইনাল জিতে তৃতীয় নক্ষত্র উন্মোচন করে আর্জেন্টিনা।
স্মরণীয় যত রেকর্ড
রেকর্ডম্যান লিওনেল মেসি : ৫টি বিশ্বকাপ মিলিয়ে ১৩টি গোল নিয়ে আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা মেসি। পেছনে ফেলেছেন ১০ গোল করা বাতিস্তুতাকে। এছাড়া ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে ২৬টি ম্যাচ খেলার বিশ্ব রেকর্ডও তারই দখলে।
স্তাবিলের প্রথম হ্যাটট্রিক : ১৯৩০ সালের উদ্বোধনী বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার গুইলার্মো স্তাবিলে ৮ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম হ্যাটট্রিকের রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি।
সবচেয়ে বড় জয় ও ক্যাম্বিয়াসোর মহাকাব্য : বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় জয় দুটি—১৯৭৮ সালে পেরুর বিপক্ষে ৬-০ এবং ২০০৬ সালে সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোর বিপক্ষে ৬-০ ব্যবধানের জয়। ২০০৬ সালের সেই ম্যাচে ২৫টি পাসের সমন্বয়ে করা ক্যাম্বিয়াসোর গোলটি আজও বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা দলীয় গোল হিসেবে স্বীকৃত।
২০২৬ বিশ্বকাপে লক্ষ্য
লিওনেল স্কালোনির ক্ষুরধার ট্যাকটিক্স আর জীবনের শেষ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির ট্রফি ধরে রাখার অদম্য ইচ্ছা— এই দুইয়ের মেলবন্ধনে আর্জেন্টিনা এবারও বিশ্বজয়ের অন্যতম দাবিদার। কাতার রূপকথার পর আমেরিকার বুকেও শিরোপা উঁচিয়ে ধরে টানা দুটি ট্রফি জয়ের রেকর্ড গড়ার লক্ষ্য তাদের।
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলরক্ষক : হুয়ান মুসো, জেরোনিমো রুলি, এমিলিয়ানো মার্টিনেজ
ডিফেন্ডার : নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, গঞ্জালো মন্তিয়েল, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, নিকোলাস ওতামেন্দি, ফাকুন্দো মেদিনা, নাহুয়েল মোলিনা, সেনেসি
মিডফিল্ডার : লিয়ান্দ্রো পারেদেস, রদ্রিগো ডি পল, ভ্যালেন্তিন বার্কো, জিওভানি লো সেলসো, এজেকিয়েল পালাসিওস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ
ফরোয়ার্ড : হুলিয়ান আলভারেজ, লিওনেল মেসি, নিকোলাস গঞ্জালেজ, থিয়াগো আলমাদা, জুলিয়ানো সিমিওনে, নিকো পাজ, হোসে ম্যানুয়েল লোপেজ, লাউতারো মার্টিনেজ

ক্রীড়া প্রতিবেদক