‘অনেক প্রথমের’ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব যেমন কেটেছে
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ এটি। সেই বিশ্বকাপ ঘিরেই কি না তৈরি হয়েছিল রাজ্যের বিতর্ক। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরুর আগে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ছিল নতুন ফরম্যাট নিয়ে। ১৯৯৮ সাল থেকে টানা সাতটি আসরে ৩২ দলের বিশ্বকাপ দেখেছে ফুটবল দুনিয়া। এবার প্রথমবারের মতো সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৮। স্বাগতিক দেশ তিনটি, এটিও প্রথমবারের মতো।
দল বাড়ায় সূচিপত্রেও আসে জটিলতা। ১২টি গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুই দলের পাশাপাশি সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দলও জায়গা পাচ্ছে শেষ ৩২-এ। অর্থাৎ, অংশ নেওয়া ৪৮ দলের দুই তৃতীয়াংশই খেলছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। তাই অনেকের প্রশ্ন ছিল, নকআউটে ওঠার পথ এতটা সহজ হলে গ্রুপ পর্ব কি হারাবে তার চিরচেনা উত্তেজনা?
প্রথম রাউন্ড প্রায় শেষ। পাওয়া গেছে সেই প্রশ্নের উত্তর। যতটা ভাবা হয়েছিল, ততটা ম্যাড়মেড়ে হয়নি বিশ্বকাপ। বরং, তুলনামূলক ছোট দলগুলো জমিয়ে তোলে গ্রুপ পর্ব।
প্রথম রাউন্ডের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় লিখেছে ছোট দলগুলো। বিশ্বকাপের মঞ্চ যে এখন আর শুধু ঐতিহ্য আর নামের লড়াই নয়, সেটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তারা। সবচেয়ে বড় উদাহরণ কেপ ভার্দে। আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটির জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ। বিশ্বকাপে এটাই তাদের প্রথম অংশগ্রহণ। অথচ অভিষেক আসরেই তারা এমন এক গল্প লিখেছে, যা বহুদিন মনে রাখবে দুনিয়া।
সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেওয়া, দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ সমতায় ফেরা এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে সৌদি আরবের বিপক্ষে মূল্যবান পয়েন্ট তুলে নেওয়া। এই তিন ম্যাচই কেপ ভার্দেকে পৌঁছে দিয়েছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে জনসংখ্যার বিচারে নকআউটে ওঠা সবচেয়ে ছোট দেশ এখন তারা। সাহস, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস মিলিয়ে কেপ ভার্দে হয়ে উঠেছে এবারের প্রথম রাউন্ডের সবচেয়ে বড় রূপকথা। সেই রূপকথার নায়ক গোলরক্ষক ভোজিনহা।
আফ্রিকার আরেক প্রতিনিধি দক্ষিণ আফ্রিকাও লিখেছে নতুন ইতিহাস। ১৯৯৮, ২০০২, ২০১০ ও ২০২৬ সালের চারটি বিশ্বকাপে অংশ নিলেও এবারই প্রথম নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করেছে তারা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে উচ্ছ্বাসে ভেসেছে বাফানা বাফানারা।
কুরাসাও রুখে দিয়েছে ইকুয়েডরকে। এই বিশ্বকাপের আগে দেশটির নাম শোনা মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা যেত। এখন সবার মুখে মুখে তারা। ইকুয়েডরকে আটকে দিয়ে ড্র তুলে নেয়। দলটির গোলরক্ষক এলয় রুম ১৫টি সেইভ করেন ইকুয়েডরের বিপক্ষে, বিশ্বকাপের ইতিহাসে যা এক ম্যাচে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে ১-১ সমতায় আটকে দেয় কঙ্গো। যে গোল কঙ্গোর বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোল। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে গোল পায় কঙ্গো। যেখানে পর্তুগালকে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে ধরা হচ্ছে।
ছোটদের উত্থানের বিপরীতে বড় দলগুলোর কয়েকটি ব্যর্থতা প্রথম রাউন্ডকে আরও নাটকীয় করেছে। উরুগুয়ে একটি ম্যাচও জিততে পারেনি। কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্র এবং স্পেনের কাছে হারের পর গ্রু পপর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে তাদের। জার্মানিও ইকুয়েডরের কাছে হেরে সমর্থকদের হতাশ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দল শেষ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
নতুন ফরম্যাটের সবচেয়ে বড় আলোচনা হয়েছে তৃতীয় স্থানধারী দলগুলোর সুযোগকে কেন্দ্র করে। এবার তিন কিংবা চার পয়েন্ট নিয়েও দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পরিস্থিতিই তার বড় উদাহরণ। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ১-০ গোলে হারলেও তিন পয়েন্ট নিয়ে তারা নকআউটের আশা বাঁচিয়ে রেখেছে।
এই নিয়মের প্রভাব দেখা গেছে কয়েকটি ম্যাচে। গ্রুপ ডি-তে অস্ট্রেলিয়া ও প্যারাগুয়ের গোলশূন্য ড্র দুই দলের জন্য সুবিধাজনক ফল হয়েছে। কয়েকটি গ্রুপে শেষ ম্যাচের সমীকরণে ড্র হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
অবশ্য এর উল্টো ছবিও আছে। আগের ফরম্যাটে দ্বিতীয় ম্যাচেই অনেক দলের বিদায় নিশ্চিত হয়ে যেত। এবার শেষ ম্যাচ পর্যন্ত অধিকাংশ দলই দ্বিতীয় রাউন্ডের স্বপ্ন ধরে রাখতে পেরেছে। ফলে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত সমীকরণ বদলেছে, বদলেছে সম্ভাবনার হিসাব।
এসবের বাইরে লিওনেল মেসি আছেন আপন আলোয় উজ্জ্বল। কাতারে যেখান থেকে শেষ করেছেন, মার্কিন মুলুকে শুরু করেছেন সেখান থেকে। ২ ম্যাচে ৫ গোল, দেখিয়ে চলেছেন বুড়ো হাঁড়ের ভেলকি। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কঙ্গোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে নিজেকে হারিয়ে খোঁজেন। তার শেষ দেখে ফেলেছিল প্রায় সবাই। পরের ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে পর্তুগিজ তারকা দিলেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা কামব্যাক।
দুজন আবার গড়েছেন রেকর্ড। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা মেসি। রোনালদো গড়েছেন টানা ছয় বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র ফুটবলার হওয়ার কীর্তি। এখনও বিশ্বকাপে মূল আকর্ষণ মেসি-রোনালদোই।
দুই বুড়োর সঙ্গে লড়াইয়ে আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ড, উসমান দেম্বেলেরা। এসব ছাপিয়ে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব বিশেষ হয়ে উঠেছে আরেক কারণে। তিন বছর পর ব্রাজিলের জার্সিতে মাঠে নেমেছেন নেইমার। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের জয় ছাপিয়ে এটিই হয়ে উঠেছিল মূল বিষয়।
প্রথম রাউন্ড শেষে ৪৮ দলের বিশ্বকাপকে তাই ব্যর্থ বলা যায় না। বিশ্ব ফুটবল পেয়েছে নতুন শক্তি, নতুন গল্প আর নতুন নায়কের দেখা। কেপ ভার্দের সাহস, দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাস, মরোক্কোর ধারাবাহিকতা কিংবা বড় দলগুলোর অপ্রত্যাশিত হোঁচট মনে করিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখনও তার অনিশ্চয়তায় লুকিয়ে আছে।

স্পোর্টস ডেস্ক