ভারতের ম্যাচে বাংলাদেশি আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত ঘিরে তুমুল বিতর্ক
একটি ছোট্ট শব্দ। মুহূর্তের একটি স্পাইক। আর সেই স্পাইকই বদলে দিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের গতিপথ। ম্যাচ শেষ, ফলও লেখা হয়ে গেছে স্কোরবোর্ডে। কিন্তু প্রযুক্তির চোখে ধরা পড়া সেই মুহূর্তটি নিয়ে প্রশ্ন এখনো শেষ হয়নি।
ঘটনাটির কেন্দ্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞ আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ সৈকত। ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের তৃতীয় ওয়ানডেতে টেলিভিশন আম্পায়ারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ম্যাচের একটি আউটের সিদ্ধান্তই এখন জন্ম দিয়েছে নতুন বিতর্ক। আল্ট্রাএজে ধরা পড়া শব্দটি সত্যিই বল ও ব্যাটের সংস্পর্শের, নাকি ব্যাট ও প্যাডের সংস্পর্শের?
নিউ চণ্ডীগড়ের পিসিএ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শনিবার (৩ অক্টোবর) সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে মুখোমুখি হয় ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। প্রথম দুই ম্যাচ জিতে আগেই সিরিজ নিশ্চিত করেছিল ভারত। তৃতীয় ম্যাচটি তাই ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য ছিল হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর লড়াই। আর সেই ম্যাচের ৩০তম ওভারেই ঘটে আলোচিত ঘটনাটি।
ভারতের দেওয়া ৩৫২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে তখন ভালো অবস্থানে ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আমির জ্যাঙ্গু ও শাই হোপের জুটির পর রাদারফোর্ডও হোপের সঙ্গে ইনিংস এগিয়ে নিচ্ছিলেন। এমন সময় ভারতের পেসার নামান ধীরের করা ৩০তম ওভারের শেষ বলটি অফ স্টাম্পের বাইরে থেকে সামান্য ভেতরে আসে। রাদারফোর্ড কাট শট খেলতে গিয়ে বলটি উইকেটকিপার লোকেশ রাহুলের হাতে তুলে দেন।
ভারতীয় খেলোয়াড়দের আবেদনের পর মাঠের আম্পায়ার তাকে ক্যাচ আউট দেন। রাদারফোর্ড অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই রিভিউ নেন। তার দাবি ছিল, বল তার ব্যাটে লাগেনি।
রিভিউতে আল্ট্রাএজে বলটি ব্যাটের কাছ দিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে একটি স্পাইক দেখা যায়। এখানেই তৈরি হয় মূল বিতর্ক। কারণ একই সময়ে রাদারফোর্ডের ব্যাট তার পেছনের প্যাডেও স্পর্শ করছিল বলে রিপ্লেতে দেখা যায়।
অর্থাৎ আল্ট্রাএজের শব্দটি ঠিক কোথা থেকে এসেছে, বল ও ব্যাটের সংস্পর্শ থেকে, নাকি ব্যাট ও প্যাডের সংস্পর্শ থেকে, সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ধীরগতির রিপ্লেতে ব্যাট ও বলের মধ্যে সামান্য দূরত্ব দেখা যায় বলে একাধিক ক্রিকেট সম্প্রচারমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে আসে। তবে তৃতীয় আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ সৈকতের ব্যাখ্যা ছিল, তিনি বল ও ব্যাটের মধ্যে নিশ্চিত কোনো দূরত্ব দেখতে পাননি। ফলে আল্ট্রাএজের স্পাইককে ব্যাটে বল লাগার প্রমাণ হিসেবে ধরে মাঠের আম্পায়ারের আউটের সিদ্ধান্তই বহাল রাখেন তিনি।
সিদ্ধান্তে দৃশ্যতই অসন্তুষ্ট ছিলেন শেরফেন রাদারফোর্ড। মাঠ ছাড়ার আগে তিনি আম্পায়ারদের সঙ্গে কথা বলেন এবং নিজের আপত্তির কথা জানান।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ধারাভাষ্যকার ও সাবেক তারকা ক্রিকেটার ইয়ান বিশপও সম্প্রচারে বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘রাদারফোর্ড মোটেও খুশি ছিলেন না। তার মনে হয়েছিল, ব্যাট বলের বদলে প্যাডে লেগেছিল। তৃতীয় আম্পায়ারের ব্যাখ্যাও তুলে ধরেন বিশপ। তিনি বলেন, ‘তৃতীয় আম্পায়ার বলেছেন, ব্যাট ও বলের মধ্যে কোনো দূরত্ব তিনি দেখতে পাননি। এটা ইন্টারেস্টিং।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সিদ্ধান্তটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার আকাশ চোপড়া এটিকে ‘নট আউট’ বলার পাশাপাশি মন্তব্য করেন, আল্ট্রাএজের স্পাইকটি ব্যাট ও প্যাডের সংস্পর্শ থেকেও হয়ে থাকতে পারে।
একই সাথে সাংবাদিক বিক্রান্ত গুপ্তও প্রশ্ন তোলেন, একই রিপ্লেতে যেখানে ব্যাট ও বলের মধ্যে সামান্য দূরত্ব দেখা যাচ্ছিল, সেখানে টিভি আম্পায়ার কীভাবে সেই দূরত্ব দেখতে পেলেন না।
তিনি লেখেন, ‘রাদারফোর্ড আউট ছিলেন না। টিভি আম্পায়ার কীভাবে বল আর ব্যাটের এজের মধ্যে কোনো দূরত্ব দেখেননি, তা আমি বুঝতে পারছি না-যেখানে একই টিভিতে আমরা সবাই স্পষ্ট দেখেছি, সেখানে দূরত্ব ছিল। স্নিকোতে যে শব্দটি ধরা পড়েছিল, সেটি ছিল ব্যাট প্যাডে লাগার। বাজে সিদ্ধান্ত।’
তবে বিতর্কিত সেই সিদ্ধান্তের পরও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারায়নি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। রাদারফোর্ড ২৫ বলে ২৪ রান করে আউট হন। তার বিদায়ের সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোর ছিল ২০৬ রান, হাতে ছিল ৭ উইকেট। জয়ের জন্য তখন প্রয়োজন ছিল আরও ১৪৬ রান।
এরপর দায়িত্ব নেন অধিনায়ক শাই হোপ। চোটের সমস্যা নিয়েও অসাধারণ ব্যাটিং করে দলকে জয়ের পথে রাখেন তিনি। আমির জ্যাঙ্গুর সঙ্গে তার ১০৯ রানের জুটি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
শেষ পর্যন্ত হোপের অপরাজিত সেঞ্চুরিতে ৪৮.২ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ৩৫২ রান তুলে ম্যাচ জিতে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ওয়ানডে ইতিহাসে এটি তাদের অন্যতম বড় সফল রান তাড়ার ঘটনাও।
এর আগে ভারত ৭ উইকেট হারিয়ে ৩৫১ রান সংগ্রহ করেছিল। কেএল রাহুল করেন অপরাজিত ১২৯ রান, যা তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ স্কোর। রোহিত শর্মার ৯২ রানও ভারতের বড় সংগ্রহ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ভারতের সেই বড় সংগ্রহও হোপের নেতৃত্বাধীন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে থামাতে পারেনি। তৃতীয় ওয়ানডেতে ৫ উইকেটের জয় নিয়ে হোয়াইটওয়াশ এড়ায় ক্যারিবীয়রা। প্রথম দুই ম্যাচ জিতে যাওয়ায় অবশ্য তিন ম্যাচের সিরিজ ২-১ ব্যবধানে ভারতের দখলেই থাকে।
ম্যাচের ফলাফল ভারতের সিরিজ জয় নিশ্চিত করলেও আলোচনার বড় অংশজুড়ে এখন রাদারফোর্ডের আউট। বিশেষ করে আল্ট্রাএজে একই সময়ে ব্যাট ও প্যাড এবং ব্যাট ও বলের সম্ভাব্য সংস্পর্শ ধরা পড়লে কোন প্রমাণকে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হবে, সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে। আর সেই প্রশ্নের কেন্দ্রেই রয়েছেন বাংলাদেশের আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ সৈকত।

স্পোর্টস ডেস্ক