বিনা খরচে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ, তরুণদের স্বপ্নপূরণে ‘জিপি একাডেমি’
বিশ্বজুড়ে চাকরির বাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং নতুন নতুন দক্ষতার চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অথচ উচ্চমূল্যের প্রশিক্ষণ কোর্স, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনার অভাব কিংবা আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য সেই দক্ষতা অর্জনের পথ সহজ হয় না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকলেও কাঙ্ক্ষিত কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হিমশিম খেতে হয় অনেককেই।
এই বাস্তবতায় দেশের তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে গ্রামীণফোন একাডেমি (জিপি একাডেমি)। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পরিচালিত এই ডিজিটাল আপস্কিলিং প্ল্যাটফর্ম শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতাই নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, কর্মদক্ষতা এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গড়ে তুলতেও কাজ করছে। একাডেমিয়া ও শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, সেটি কমিয়ে তরুণদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করাই এর মূল লক্ষ্য।
গ্রামীণফোনের প্রধান কার্যালয়ে প্ল্যাটফর্মটি থেকে সুফল পাওয়া কয়েকজন তরুণ-তরুণীর সঙ্গে কথা হয় এনটিভি অনলাইনের। তাঁদের গল্পে উঠে আসে সংগ্রাম, শেখার আগ্রহ এবং সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে কীভাবে বদলে যেতে পারে একটি ক্যারিয়ারের গল্প।
সাভারে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ফাহিম আবু আশরাফ। অনলাইনে কাজ শেখার স্বপ্ন নিয়ে ল্যাপটপ কিনতে গিয়ে এবং সাইবার স্ক্যামের চক্রান্তে পড়ে এক সময় বড় অঙ্কের ঋণের বোঝার মুখে পড়েন তিনি। হতাশার সেই সময়ে তিনি সন্ধান পান জিপি একাডেমির ‘ফ্রিল্যান্সিং ওয়ার্ডপ্রেস’ কোর্সের। বিনামূল্যে ছয় মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাসাইনমেন্ট ও মেন্টরদের সহায়তায় নিজেকে নতুন করে প্রস্তুত করেন ফাহিম।
প্রশিক্ষণ শেষে তিনি কেবল ঋণের সিংহভাগই পরিশোধ করেননি, বরং বর্তমানে দেশীয় কাজের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মার্কেটপ্লেস থেকে তার গড় মাসিক আয় দাঁড়াচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। ফাহিমের ভাষায়, ‘জিপি একাডেমির সঠিক গাইডলাইন না পেলে হয়তো আমি কখনো এই ঋণের বোঝা থেকে বের হতে পারতাম না।’
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করা আলী হাসনাইন মওলা চৌধুরীর গল্পটাও বেশ অনুপ্রেরণাদায়ক। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই জিপি একাডেমির বুটক্যাম্পে যুক্ত হন তিনি। নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখে সুযোগ পান গ্রামীণফোনের ‘মাইজিপি’ অ্যাপের সফটওয়্যার প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে ৫ মাসের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্টে।
সেখানে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারিক প্রয়োগ শিখে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার আগেই ফুল স্ট্যাক ও প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট ভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেন আলী হাসনাইন। জিপি একাডেমির মেন্টরশিপ ও লাইভ সেশনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে স্নাতক শেষ করতেই তার মাসিক আয় ছাঁড়িয়েছে লাখ টাকার ওপর। বর্তমানে তিনি একটি কানাডিয়ান কোম্পানিতে ‘এআই প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট অ্যান্ড রিসার্চার’ হিসেবে রিমোটলি কাজ করছেন। জিপি একাডেমিকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিনামূল্যে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ এবং ইন্ডাস্ট্রি এক্সপার্টদের সঙ্গে সরাসরি কাজের সুযোগই আমাকে এই আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।’
ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার ব্যবধান মেটালেন মারিয়া
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশর (এআইইউবি) মতো জায়গা থেকে সিএসসিতে চমৎকার ফলাফল নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পরও কর্পোরেট দুনিয়ার প্রেজেন্টেশন ও রিয়েল-ওয়ার্ল্ড প্রজেক্ট কমিউনিকেশনে ঘাটতি অনুভব করছিলেন মারিয়া নাওয়ার। অ্যাকাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে শিল্পক্ষেত্রের এই দূরত্বের কারণে ক্যারিয়ারে সঠিক গতি পাচ্ছিলেন না তিনি। জিপি একাডেমি থেকে ‘প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং’ ও সফট স্কিল প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর বদলে যায় তার আত্মবিশ্বাস। এআই-এর সঠিক প্রয়োগ ও প্রফেশনাল প্রেজেন্টেশন স্কিল অর্জন করে তিনি নিজের দক্ষতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। বর্তমানে তিনি একটি জার্মান কোম্পানিতে ‘ডেটা অ্যানালিস্ট’ হিসেবে সফলতার সঙ্গে কর্মরত আছেন।
মারিয়া বলেন, ‘আমি পড়াশোনায় ভালো ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে আমার ভালো যোগাযোগ ছিল এবং তাঁদের কাছ থেকে সব সময় সহযোগিতা পেয়েছি। কিন্তু একাডেমিক শিক্ষা ও শিল্পখাতের মধ্যে একটি ব্যবধান ছিল, এটিই আমার ক্যারিয়ারে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে কোনো প্রজেক্টের কাজ উপস্থাপন করতাম, পেশাগত জীবনে ঠিক একইভাবে তা তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছিল না। বিশেষ করে যোগাযোগ দক্ষতা ও প্রেজেন্টেশন স্কিলে নিজের ঘাটতি অনুভব করতাম। গ্রামীণফোন একাডেমির প্রশিক্ষণ সেই দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে আমাকে অনেক সাহায্য করেছে।’
কোভিডকালীন ১০ জন থেকে আজকের বিশাল প্ল্যাটফর্ম
গ্রামীণফোন একাডেমির এই শুরুর যাত্রা প্রসঙ্গে গ্রামীণফোন একাডেমির হেড ফারহানা হোসেন শাম্মু এনটিভি অনলাইনকে জানান, ২০২০ সালে কোভিড মহামারী চলাকালীন তরুণদের অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা দেখে ১০ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে ‘গ্রামীণফোন এক্সপ্লোরার’ নামে একটি পাইলট প্রজেক্ট শুরু হয়। পরবর্তীতে এর চাহিদা দেখে ২০২২ সালে পূর্ণাঙ্গ লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম www.grameenphone.academy চালুর মাধ্যমে এটিকে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
টেলকো অপারেটর হয়েও কেন তরুণদের আপস্কিলিং নিয়ে কাজ করছে গ্রামীণফোন এমন প্রশ্নের জবাবে ফারহানা হোসেন শাম্মু বলেন, ‘দেশের অন্যতম বড় সমস্যা বেকারত্ব। ১৬ বছর পড়াশোনা করেও তরুণরা যখন চাকরির বাজারে বারবার প্রত্যাখ্যান হয়, সেই সহানুভূতি ও দায়বদ্ধতা থেকেই আমাদের এই উদ্যোগ।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে মনে করেন এআই মানুষের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে, কিন্তু আমরা যদি এই সময়ের উপযোগী স্কিল অর্জন করি, তবে এআই চাকরি কাড়বে না বরং নতুন সুযোগ তৈরি করবে। আমাদের লক্ষ্য তরুণদের কেবল দেশেই নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করা।’
কমিউনিকেশন, প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, জিরো-কোড ডেভেলপমেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল মার্কেটিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার সিকিউরিটি, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, ডিজাইন থিংকিং, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং ক্যারিয়ার স্কিল-এমন সময়োপযোগী ও কর্মমুখী বিভিন্ন কোর্স নিয়ে গ্রামীণফোন একাডেমি দেশের তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল শিক্ষামঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও জানানো হয়। গ্রামীণফোন একাডেমির প্ল্যাটফর্মে দেশের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী, উদ্যোক্তা কিংবা পেশাজীবী বিনামূল্যে নিবন্ধন করে নিজেদের আগ্রহ ও প্রয়োজন অনুযায়ী কোর্স সম্পন্ন করতে পারেন।

শাহজালাল রোহান